প্রাচ্যবাদ ও হাদীসের প্রামান্যতা (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:৪০ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০

লিখেছেনঃ হুজায়ফা আওয়াদ

(১ম পর্বের পর থেকে)

হাদীস সংকলন বিষয়ে ওরিয়েন্টালিস্টদের একটি দাবী হলো হাদীস সংকলিত হয়েছে দু’শ হিজরীর পর থেকে৷ তাদের এই অসার ও ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডনের জন্য নিচের মোটা দাগের কথাগুলোই যথেষ্ট৷

১। হাদীস সংকলন নবীজির যুগেই শুরু হয়েছে। ইমাম বুখারীদের আগে বহু কিতাব লেখা হয়েছে।

২। বুখারিতে দেখবেন, তিনি হুমাইদি (আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর-মৃত্যু -২১৯ হিঃ) থেকে অনেক হাদিস এনেছেন৷ হুমাইদি ইমাম বুখারির উস্তাদ। তার কিতাব আছে মুসনাদুল হুমাইদি। এটি আগে পাণ্ডুলিপি আকারে ছিলো ৷ এখন বৈরুত থেকে ছেপে এসেছে। দেখুন এটি বুখারির আগের কিতাব। মুসনাদুল হুমাইদি আসার কারণে এটা বলারও সুযোগ নেই ইমাম বুখারি হুমাইদির নামে হাদীস বানিয়ে চালিয়ে দিয়েছেন। বুখারিতে হাদীস যে শব্দে আছে সে হাদিস মুসনাদে হুমাইদিতেও একই শব্দে আছে।

৩। মুসলিমে দেখবেন, ইমাম মুসলিম ১৫০০ এর বেশি রেওয়ায়েত এনেছেন আবু বকর ইবনু আবি শাইবা (মৃত্যু -২৩৪ হিঃ) থেকে। এখন তার ‘মুসান্নাফ’ কিতাব শায়খ আওয়ামার তাহকীকে ২৬ খণ্ডে ছেপে এসেছে৷ এটাও আগে প্রকাশিত রূপে ছিলো না। ইমাম মুসলিম ইবনে আবি শাইবা থেকে যা হাদীস এনেছেন, বেশিরভাগ তার কিতাবে আছে।

৪। তিরমিযি খুলুন, সেখানে হান্নাদ ইবনু সারি থেকে বহু হাদীস আছে। হান্নাদ ইমাম তিরমিযির উস্তাদ (মৃত্যু -২৪৩ হিঃ)। এখন তিন খণ্ডে ছেপে এসেছে তার কিতাবুয যুহদ।

৫। আবু দাউদে আছে সাইদ ইবনু মানসুরের নাম। তার সুনানে সাইদ ইবনে মানসুর ছেপে এসেছে দুই খণ্ডে। যে কিতাব সম্পর্কে হাফেয যাহাবী বলেছেন-
‘من نظر في (سنن سعيد) عرف حِفْظَ الرجل وجلالته’

৬। ইমাম বুখারির দাদা উস্তাদ আবদুর রাজ্জাক। ২১১ হিজরিতে তার ইন্তেকাল। তিনি ইমাম আবু হানিফার ছাত্র। এখন ছেপে এসেছে তার কিতাব মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক। দেখুন ইমাম বুখারির দাদা উস্তাদই বিশাল কলেবরে হাদীস সংকলন করে গেছেন। এখন কেউ যদি বলে বুখারি প্রথম এই কাজ করেছেন সেটা হবে স্পষ্ট ভুল।

৭। আব্দুর রাজ্জাক আবার হাদীস এনেছেন তার উস্তাদ মামার ইবনু রাশেদ থেকে। মা’মারের কিতাব ‘জামে মামার’ও এখন ছেপে এসেছে। মামার ইবনু রাশেদ ১৫১ হিজরিতে মারা যান। তার মানে দেড়শো হিজরির মধ্যে হাদীস সংকলিত হয়েছে সেটারও প্রমাণ পেলাম। ইমাম বুখারি আরো অনেক পরে যেসব হাদীস লিখেছেন তার অনেকগুলো মামারের এই কিতাবে হুবহুই আছে।

৮৷ আব্দুর রাযযাকের অপর একজন বরেণ্য উস্তায হলেন ইমাম আ’জম আবু হানিফা রহঃ৷ খোদ ইমাম আবু হানিফার সংকলিত হাদীসের কিতাবও আমাদের সামনে রয়েছে -‘কিতাবুল আসার’। এটি শুধু সাধারণ একটি সংকলনই না বরং হাদীসের ইতিহাসে অনুচ্ছেদ ও বিষয় ভিত্তিক সংকলনের তালিকায় সর্ব প্রথম। হাম্মাদ ইবনু আবি হানিফা, কাযী আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ ইবিনুল হাসান শাইবানি, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, যুফার ইবনুল হুজাইল সহ বরেণ্য দশ বারোজন শাগরেদ তার এ কিতাব বর্ণনা করেন। বলা বাহুল্য যে, এ কিতাবও একশ চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মাঝেই সংকলিত হয়েছে।

[ কিতাবুল আসারের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে দেখুন- মুকাদ্দিমাতু কিতাবিল আসার -শায়খ আবব্দুর রশীদ নোমানী। মুসনাদুল ইমামিল আ’জমের ভূমিকা-শায়খ আব্দুল হাফিয মাক্কি। ইমাম ইবনে মাজা আওর ইলমে হাদীস। ]

৯। বিখ্যাত অনেক রাবি যেমন কুতাইবা ইবনু সাইদ, মুহাম্মদ ইবনুল কাসেম এরা সবাই হাদীস এনেছেন ইমাম মালেক (মৃত্যু -১৭৯ হিঃ) থেকে। তার নিজেরও কিতাব আছে ‘মুয়াত্তা মালেক’। এটিও তিনি সংকলন করেছেন দেড়শো হিজরির আগে। হাদিস ও আসার মিলে এগারোশ’র বেশী বর্ণনা আছে তার এ কিতাবে।
এর অর্থ হলো, আমরা যতই পিছনে যাচ্ছি, প্রাচীন থেকে প্রাচীনতর হাদীসের সংকলন পেয়ে যাচ্ছি।

১০। মামার ইবনু রাশিদের আলাপে আসা যাক। তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহ থেকে। তিনি সিনিয়র তাবেইদের অন্যতম৷ সরাসরি হাদিস নিয়েছেন আবু হুরাইরা রাঃ থেকে। তিনি আবু হুরাইরা রাঃ থেকে যা শুনতেন লিখে ফেলতেন। আবু হুরাইরা (রা) থেকে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশী হাদীস বর্নিত আছে বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থে। হাম্মাম ইবনু মুনাব্বিহর একটা সহিফাহ ছিল, যা গত শতাব্দির শেষ দিকে প্রফেসর ড. হামিদুল্লাহ রঃ এর তাহকিকে প্রকাশিত হয়। তাহলে দেখুন আরো অনেক পিছনে পৌঁছে গেলাম আমরা। যিনি সরাসরি সাহাবি থেকে হাদীস শুনেছেন তার সংকলনকৃত কিতাবও আজ আমাদের হাতে। সুতরাং তৃতীয় শতাব্দী থেকে হাদীস সংকলন শুরু এটা যে অসার এবং স্পষ্ট ভুল তা প্রমাণ হলো। এখানে পঞ্চাশ খণ্ডে প্রকাশিত মুসনাদে আহমাদের কথাও মাথায় রাখতে হবে৷ তিনি কিন্তু কুতুবে সিত্তা তথা হাদীসের প্রসিদ্ধ ছয় গ্রন্থের লেখকদের প্রায় সবারই উস্তাদ ও উপরের স্তরের মানুষ।

১১। হুজুর সাঃ এর একজন কনিষ্ঠ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাঃ৷ নবিজির যুগে তার অনুমতিক্রমে হাদিস লিখতেন৷ এমন বর্ননা সরাসরি আবু হুরাইরা থেকেও আছে। তার এ সহিফা ইতিহাসে ‘আস সাদাহিকাহ’ নামে পরিচিত। এই পাণ্ডুলিপিও আমাদের সামনে আছে। অতএব আমরা সরাসরি নবীযুগে হাদীস সংকলনের প্রমাণও পেলাম। এভাবে আমরা শুধু মাত্র বুখারী খুলেই যদি পিছনের দিকে যেতে থাকি, তাহলে দেখবো খোদ বুখারীর সনদ তথা রাসূল সাঃ পর্যন্ত পৌঁছার চেইনের মাঝে অনেক রাবী (বর্ণনাকারী) এমন পাওয়া যাচ্ছে, যাদের প্রত্যেকেরই হাদীসের নিজস্ব সংকলন ছিলো। যাদের কেউ দ্বিতীয় শতকের, কেউ প্রথম শতকের, কেউ আবার সাহাবিযুগের।

১২। সাহাবিদের অনেকের হাদীসের সহিফাহ ছিল। জাবের ইবনু আবদুল্লাহ, আনাস ইবনু মালেকসহ অনেক সাহাবির নিজস্ব সহিফাহ ছিল। প্রায় ৪৮ জন সাহাবির এমন সহিফাহ ছিল।তাদের ব্যাপারে বিস্তারিত লিখে দেখিয়েছেন প্রফেসর ড. মুস্তফা আ’যমী রাঃ৷ ‘কুত্তাবুন নাবী সাঃ’ এবং তার ঐতিহাসিক ‘দিরাসাত ফিল হাদীসিন নাবাওয়ী ওয়া তারিখু তাদবিনি’ -কিতাবদ্বয়ে।

সুতরাং হাদীস সংকলনের সময়কাল সম্পর্কে ওরিয়েন্টালিস্টদের বক্তব্য ও অবস্থান স্পষ্ট ভুল। এ বিষয়ে আরো জানতে ডক্টর মুস্তফা সিবাঈ, ড. আবু শাহাবা, ড. মুস্তফা আজমীর কিতাব গুলো দেখা যেতে পারে……!

মোটকথা, হাদিসের মত দুর্ভেদ্য শক্তিশালী একটা শেকড়কে যারা দু চারটে ঠুনকো যুক্তি দিয়ে কাবু করে ফেলবেন ভাবেন, তাদের হয়তো জানার স্বল্পতা আছে৷ কিংবা জেনেও হঠকারিতা করে থাকেন। শুধু হাদীস নয়, রিজাল তথা ‘হাদীস বর্ণনাকারীদের জীবন চরিত’ শাস্ত্রের ব্যাপারেই দেখুন৷ আজ থেকে দেড়শ বছর আগে ১৮৫০ সনে কত শক্তিশালী স্বীকারোক্তি দিয়ে গেছেন অস্ট্রিয়ান প্রাচ্যবিদ স্প্রেনজার( Aloys Sprenger)৷ তিনি হাফেয ইবনে হাজার রঃ লিখিত ‘আল ইসাবা’ গ্রন্থটি নিজ তাহকিকে প্রকাশ করেন কলকাতা থেকে। ভূমিকায় লেখেন- (সারকথা) ‘হাদিস সংকলনের ইতিহাস শুধু মুসলিমদের নয় বরং গোটা মানবেতিহাসের এক বিশাল অর্জন৷ কারণ বিশ্ব সভ্যতার সামনে মুসলিমরাই কেবল এমন এক জাতি, যাদের সাড়ে পাঁচ লক্ষ সদস্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছে কেবল এক ব্যক্তি (অর্থাৎ মুহাম্মদ সঃ এর) কথা সংকলন করতে৷ আজ আমরা চাইলেই এসকল মনিষীদের জীবনের আদ্যোপান্ত ইতিহাস বইয়ের পাতায় পাতায় জ্বলজ্বল করতে দেখি….’।

 

গ্রন্থপঞ্জী
—————-
১-হুয্যিয়্যাতে হাদীস-মুফতী তাকী উসমানী
২-আল হাদীস কাবলাত তাদবীন
৩- আস সুন্নাতুন নাবাবিয়্যাহ,হুজ্জিয়্যাতুহা ওয়া তাদবিনুহা- ড. আব্দুল মাজেদ গাওরী
৪-তাদবীনে হাদীস-বাশশার আওয়াদ তাহকিকৃত
মানাযির আহসান গিলানী
৫-ই’লামুল মুওয়াক্কিয়িন-হাফেয ইবনুল কায়্যিম
৬-সুমুমুল ইসতিশরাক-মুহাম্মাদ আনওয়ার আল জিনদী
৭-মুকাদ্দিমাতু কিতাবিল আসার-মাওলানা আব্দুর রশীদ নো’মানী।
৮-মুকাদ্দিমাতুল ইসাবাহ-স্প্রেনজার।

বিঃ দ্রঃ লেখার মৌলিক আলাপ ছিল হাদীস সংরক্ষণের স্বীকৃত চার পদ্ধতির একটিকে নিয়ে৷ আরো তিনটি পদ্ধতি হলো- ক. স্মৃতিশক্তিতে ধারণ৷ খ. পারস্পরিক আলোচনা৷ গ. প্রাত্যহিক জীবনে প্রয়োগ করা৷ আরবিতে হিফজ, মুযাকারা ও তায়ামুল৷ ধারাবাহিকভাবে সেগুলো নিয়েও লেখক আলাপ করবেন ইনশাআল্লাহ৷