ঢাকা, সোমবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১২ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

প্রাচীন বাংলায় চায়নীজ পর্যটক এবং তাঁদের বর্ণনায় বাংলা


প্রকাশিত: ৯:৫৮ অপরাহ্ণ, জুন ২, ২০২০

 

প্রাচীনকালে বাংলার সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি কেমন ছিলো সে সম্পর্কে জানার অন্যতম একটি উপায় হলো বিদেশী পর্যটকদের বর্ণনা। পর্যটকরা ধর্ম প্রচার, বাণিজ্য, যুদ্ধ ইত্যাদি কারণে সে সময় বাংলায়  ভ্রমণ করেছিলেন।

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে গ্রীক, রোমান ও ল্যাটিন কিছু লেখাতে প্রাচীন বাংলার বর্ণনা পাওয়া যায়। এক গ্রীক নাবিকের বর্ণনায় গঙ্গারিডই নামক নগরী বা বন্দরের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি বাংলার মসলিনের প্রশংসা করেছেন। প্রাচীন বাংলায় প্রচলিত ‘কালটিশ’ নামের একটি স্বর্ণমুদ্রার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে টলেমির লেখাতেও গঙ্গারিডই এর কথা উল্লেখ রয়েছে। গ্রীক সম্রাট আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান সম্পর্কিত রচনাবলী থেকেও বাংলার কথা জানা যায়।

পঞ্চম থেকে সপ্তম শতাব্দির মধ্যে বেশ কয়েকজন চায়নীজ পর্যটক বাংলায় এসেছিলেন। চায়নীজ পর্যটকদের অধিকাংশই এসেছিলেন ধর্ম প্রচারের কাজে। তাই তাঁদের বর্ণনায় ধর্মভিত্তিক তথ্যই বেশি পাওয়া যায়। তবে তাঁদের বর্ণনায় বাংলার সমাজ, অর্থনীতি সম্পর্কেও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এই  লেখায় এমন কয়েকজন চায়নীজ পর্যটকের ব্যাপারে আলোচনা করবো।

ফা হিয়েন

ফা হিয়েনঃ

ফা হিয়েন পঞ্চম শতকের শুরুতে ভারতে আগমন করেন। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আসেন। তখন বাংলায় দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের শাসনকাল ছিলো।

ফা হিয়েন চৌদ্দ বছর ধরে ভারত ও বাংলায় ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিলো- ভারতের বৌদ্ধ ধর্মের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। তাঁর এই ধর্মীয় বিবরণের একটি অংশেই  বাংলার সংস্কৃতির বিবরণ পাওয়া গেছে। ফা হিয়েনের বর্ণনা থেকে জানা যায়- তিনি তাম্রলিপ্তি নামের এক বন্দর এলাকায় দুই বছর ছিলেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষণা করেন। তাম্রলিপ্তিতে অবস্থানের সময় তিনি বাংলায় ২৪টি বৌদ্ধ মঠ দেখেছেন।

পঞ্চম শতাব্দীতে সমগ্র বাংলা বৌদ্ধ সংস্কৃতিতে স্নাত হয়েছিলো তা তাঁর বর্ণনা থেকেই জানা যায়।

তাঁর বিবরণীতে কিছু সমুদ্র পথের কথা উল্লেখ আছে। যেমন চম্পা থেকে তাম্রলিপ্তি। বাংলা থেকে সিংহল। সিংহল মানে বর্তমান শ্রীলংকা। তিনি বাংলা থেকে বের হয়ে শ্রীলংকায় গিয়েছেন। ধারণা করা হয় তিনি সমুদ্র পথ ব্যবহার করেই শ্রীলংকা গিয়েছিলেন।

তাঁর বিবরণীতে বাংলার রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। কারণ তিনি অন্যান্য পর্যটকদের মতো তৎকালীন রাজার পৃষ্ঠপোষকতা নেন নি।

হিউয়েন সাং

হিউয়েন সাংঃ

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে হিউয়েন সাং একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন- হিউয়েন সাং এর বর্ণনা না থাকলে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠন করা সম্ভব হতো না। সাং তাঁর লেখায় বাংলার নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর দেয়া তথ্য অনুসরণ করেই কানিংহাম পাকিস্তানের তক্ষশীলা থেকে বাংলার ময়নামতি পর্যন্ত খনন কাজ পরিচালনা করেছিলেন।

সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে ভারতীয় সম্রাট হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে হিউয়েন সাং ভারতে আসেন। হর্ষবর্ধনের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তিনি দীর্ঘ এক যুগ ভারতে অবস্থান করেন। সে সময় বাংলার সম্রাট ছিলেন শশাঙ্ক। হর্ষবর্ধন ও শশাঙ্কের মাঝে তখন যুদ্ধ চলছিলো। তাই শশাঙ্কের জীবদ্দশায় হিউয়েন সাং বাংলায় প্রবেশ করার সাহস করেন নি।

তিনি তাঁর লেখায় পুন-ন-ফ-ন-ত-ন নামক এক স্থানের বর্ণনা দিয়েছেন। পরবর্তীতে এই পুন-ন-ফ-ন-ত-ন ই পুন্ড্রবর্ধন নামে পরিচিত হয়েছে। পুন্ড্রবর্ধনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন- এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে প্রচুর কাঁঠাল উৎপন্ন হয় এবং তা এই এলাকার মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ফল।  এই এলাকার মানুষ বিদ্যা বুদ্ধিতে ছিলো প্রাজ্ঞ।

প্রাচীন পুন্ড্র রাজ্যের রাজধানী পুন্ড্রবর্ধন হচ্ছে বর্তমান বগুড়া।

বৌদ্ধ গ্রন্থ সংগ্রহ ও বৌদ্ধ ধর্ম নির্দেশনায় ব্যুৎপত্তি অর্জন হিউয়েন-সাং-এর প্রধান উদ্দেশ্য হলেও ভারতে অবস্থানকালে তিনি অন্যান্য কাজও করেছেন। তিনি ভ্রমণকৃত বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্র সযত্নে সংগ্রহ করেছেন। বাংলায় ভ্রমণকৃত বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ছিল প্রধানত কর্ণসুবর্ণের নিকটবর্তী  রক্তমৃত্তিকা,  পুন্ড্রনগর ও এর সংলগ্ন এলাকা,  সমতট ও  তাম্রলিপ্তি। তাঁর বিবরণ বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে ব্যাপক সহায়তা করে। কোথাও কোথাও তাঁর বিবরণ পক্ষপাতদোষে দুষ্ট হলেও সাত শতকের বাংলার ইতিহাস, বিশেষ করে  শশাঙ্কের শাসনাধীন গৌড় রাজ্য সম্বন্ধে তিনি আলোকপাত করেন।

ইৎ সিং

ইৎ সিংঃ

৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে  বাংলায় আসেন আরেক চীনা নাগরিক ইৎ সিং। তিনি হরিকেল ও চন্দ্রদ্বীপ অঞ্চল ঘুরে দেখেছিলেন।

তাঁর বর্ণনামতে তখনকার সময়ে শালি ধানের ভাত বেশ জনপ্রিয় ছিল। মাষকলাই, তিল, মুগ ও যবের চাষ হতো প্রচুর পরিমাণে। নানারকম পিঠা পায়েস ও মিষ্টির চল ছিল। কলাপাতায় গরম ভাত, গাওয়া ঘি, মৌরলা মাছ আর পাট শাক ছিল খুব উপাদেয়। তৎকালীন লোকেরা গবাদিপশু রক্ষায় এবং নানা ধরণের বিপদে-আপদে মন্ত্রের সাহায্য নিতো।

ইৎ সিং গুপ্ত বংশ সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনানুযায়ী- গুপ্ত বংশ ৫০০ বছর আগে বাংলায় সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলো। তাদের বাসস্থান ছিলো মুর্শিদাবাদে।

শ্রী গুপ্ত চায়নীজ ভিক্ষু ও পর্যটকদের জন্য Temple of China নামে একটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বলেও তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায়।

 

শেং চিঃ

সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে শেং চি বাংলায় আসেন । তাঁর বর্ণনা থেকে ধর্মীয় বিবরণই বেশি পাওয়া যায়। তিনি প্রাচীন বাংলার সমতট অঞ্চলে অবস্থান করেন। তখন সমতটের রাজা ছিলো রাজভট্ট। তিনি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তিনি বুদ্ধের সম্মানে প্রায়ই শোভাযাত্রা বের করতেন। শেং চি উল্লেখ করেছেন- তখন সমতটে প্রায় ৪ হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু বাস করতো।

কুমিল্লা,নোয়াখালী, চাঁদপুর ইত্যাদি অঞ্চল ছিলো সমতটের অংশ।

 

মা হুয়ান

মা হুয়ানঃ

১৪৩১ সালে চীনা পর্যটক মা-হুয়ান বাংলা ভ্রমণে আসেন। ধারণা করা হয় তিনি জন্মগতভাবে মুসলিম না হলেও পরবর্তী জীবনে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তার নামের প্রথমাংশে ‘মা’ পদবি থাকায় তার সম্পর্কে এই অনুমানটি করা হয়েছে। তার লেখা বই ‘Yingyai Shenglan’ বিশ্বব্যাপী মিং রাজবংশের সামুদ্রিক আবিষ্কার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতবর্ষের ইতিহাসের প্রাথমিক উৎস বলে বিবেচনা করা হয়।

১৪৩১ সালে তিনি চট্টগ্রাম, সোনারগাঁও এবং কালিকট ভ্রমণ করেন। তার বর্ণনামতে সে সময়কার মেয়েরা প্রসাধন ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলো। চন্দনের গুঁড়া, জাফরান, মৃগনাভি ব্যবহার করতো তারা। ঠোঁটের রং হিসেবে মাখতো লাক্ষা গাছের রস। তখন প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। মাছরাঙ্গা পাখির রঙ-বেরঙের পালক দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন।

ফেরার পথে চীন দেশের রাজার জন্য কিছু পালক সাথে করে নিয়েও গিয়েছিলেন তিনি। সে সময়ে গাছের বাকল থেকে তৈরি হতো হরিণের চামড়ার চেয়েও মসৃণ কাগজ। সোনারগাঁয়ের টাকশালে তৈরি হতো টাকা।

 

তথ্যসূত্রঃ

আশফাক হোসেনঃ বাংলাদেশের ইতিহাসের রূপরেখা

আব্দুল করিমঃ বাংলার ইতিহাস

রমেশ চন্দ্র মজুমদারঃ বাংলাদেশের ইতিহাস

বাংলাপিডিয়া

রোর মিডিয়া