প্রাচীনকালের আধুনিক নগরী হরপ্পা (শেষ অংশ)

আমজাদ হোসাইন

প্রকাশিত: ৪:৪০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২০, ২০২০

অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য পরিচালনা

কৃষি তাদের জীবিকার প্রধান উৎস হলেও হরপ্পাবাসীরা শুধু কৃষির উপর নির্ভরশীল না হয়ে নানা ব্যবসা-বাণিজ্যেও নিয়োজিত ছিলো। বাণিজ্যের জন্য তারা ব্যবহার করতো স্থল, নৌ ও সমুদ্রপথ। হরপ্পায় যেসকল মাটির তৈরি খেলনা পাওয়া গেছে, যাতে বিভিন্ন পশুর দ্বারা চাকায় টানা গাড়ির অস্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। তা থেকে অনুমান করা হয়, তারা স্থলপথে চাকাওয়ালা পশুটানা গাড়ির সাহায্যে একস্থান থেকে অন্যস্থানে মালামাল পরিবহন করা হতো। আর নৌ ও সমুদ্রপথে নৌকার সাহায্যে একস্থান থেকে অন্যস্থানে মালামাল পরিবহন করা হতো। সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ব্যাপারে কোনো প্রত্যক্ষ তথ্য-প্রমাণ পাওয়া না গেলেও পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে তার আশেপাশের নগরগুলোতে। সেসব নগরে নৌ-বন্দর এবং নৌকা তৈরির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ থেকে অনুমান করা হয় তাদের মাঝে সাধারণ নৌকা ও পালতোলা নৌকা ব্যবহারের প্রচলন ছিলো।

বৈদেশিক বাণিজ্যের বিস্তার

হরপ্পাবাসীরা শুধু অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ওপরই নির্ভরশীল ছিলো না, বৈদেশিক বাণিজ্যেও তারা যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলো। ভারতবর্ষ এবং ভারতবর্ষের বাইরে, বিশেষ করে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে হরপ্পা নগরীর ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিলো। মুদ্রা প্রচলনের কোনো নিদর্শন হরপ্পায় পাওয়া না যাওয়ায় অনেক ঐতিহাসিকের অভিমত, সে সময় সম্ভবত বিনিময় প্রথার মাধ্যমে মালামাল কেনাবেচা হতো। হরপ্পাবাসীরা যেসব পণ্য রপ্তানী করতো তার মধ্যে ছিলো চিরুনী, বস্ত্র, নানা কুটিরশিল্পজাত পণ্য ইত্যাদি। রূপা এবং বিভিন্ন ধাতুর তৈরি জিনিসপত্র বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমদানী করা হতো। হরপ্পা খননকালে কিছু মিশরীয় জিনিসের সন্ধান পাওয়া গেছে যা থেকে ধারণা করা হয়, হরপ্পার সাথে মিশরের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিলো। আর এভাবে হরপ্পার অধিবাসীরা ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিলো।

হরপ্পা নগরীর জীবনযাত্রার মান

হরপ্পা নগরীর অধিবাসীদের জীবনযাত্রার মান ছিলো যথেষ্ট উন্নত। নগরীর লোকসংখ্যা কতো ছিলো তার কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও, অনুমান করা হয় এই সংখ্যা প্রায় ১৫,০০০। আবার কারো মতে তা লক্ষাধিক। সিন্ধুলিপির যে নিদর্শন পাওয়া গেছে তা থেকে ধারণা করা হয়, হরপ্পাবাসীদের একটা অংশ জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলো। নগর পরিকল্পনার উচ্চমান দেখে অনুমিত হয় নগরোন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে এই অঞ্চলের মানুষের যথেষ্ট জ্ঞান ছিলো এবং এখানে একটি দক্ষ পৌর সরকারেরও অস্তিত্ব ছিলো। এই সরকারব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসচেতনতা যেমন গুরুত্ব পেতো, তেমনি নাগরিকদের ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের সুবিধা-অসুবিধার দিকেও নজর রাখা হতো। হরাপ্পাবাসীরা কৃষিকাজ ছাড়াও নানা ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে নিয়েজিত ছিলো। তারা কুঠার, বর্শা, ছোরা, তীর-ধনুকের ব্যবহার জানতো। হরপ্পাবাসীর অবসর বিনোদন ছিল পাশা খেলা, শিকার এবং ষাঁড়ের খেলা। এছাড়া হরপ্পা অধিবাসীদের অন্যতম পেশা ছিলো শিকার।

নগরীর অধিবাসীদের খাদ্য ব্যবস্থা

হরপ্পা নগরে খাদ্যের অভাব ছিলো না। অধিকাংশ ফসলই নিজেরা উৎপাদন করতো। উৎপাদিত ফসল নগরীর অধিবাসীদের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকতো, যা রপ্তানি করা হতো। হরপ্পাবাসীর প্রধান খাদ্য ছিলো যব এবং গমের তৈরি খাদ্য। এছাড়া দুধ, খেজুর ও মাংস প্রভৃতি হরপ্পাবাসীর খাদ্য তালিকায় প্রাধান্য পেতো। উত্তরপূর্ব আফগানিস্তানে শোরতুঘাই এর সিন্ধু জনবসতিতে লাঙল-কর্ষিত ভূক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। ধর্মীয় দিক থেকে হরপ্পার অধিবাসীরা বহু ঈশ্বরবাদী ছিলো বলে নানা প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন হতে জানা যায়। দেব-দেবীর আরাধনা ছাড়াও গাছপালা ও নানা পশুর  উপাসনার প্রচলন ছিলো বলে ধারণা পাওয়া যায়। হরপ্পার জনগণের গড় আয়ু ছিল মাত্র ত্রিশ। খননকালে আবিস্কৃত হওয়া কবর থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়। সম্ভবত হরপ্পাবাসীরা চিকিৎসা ব্যবস্থা ততটা আধুনিক ছিলো না, তাই অসুখ হলে বিনা চিকিৎসায় মারা যেতো।। কোনো কোনো মৃত মানুষের সরাসরি কবর হতো, আবার কারো কারো মৃতদেহ প্রথমে পুড়িয়ে, পরে তার ছাই কবর দেয়া হতো।

অধিবাসীদের পোশাক পরিচ্ছদ

হরপ্পাবাসীরা কী ধরনের পোশাক পরিধান করতো তার কোনো নির্দিষ্ট নমুনা পাওয়া যায়নি। তবে খননকালে যেসব মূর্তি ও অলংকার পাওয়া গেছে তা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সুতিবস্ত্র ছিলো হরপ্পা অধিবাসীদের প্রধান পোশাক। নারীপুরুষের পোশাকে বিশেষ কোনো পার্থক্য ছিলো না বলে ঐতিহাসিকদের অনুমান। ধারণা করা হয় শরীরের উপরের অংশে পরিধানের জন্য ব্যবহৃত হতো শালের মতো বস্ত্র আর নিচের অংশে ধুতি জাতীয় বস্ত্র। বস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হতো তুলা আর পশম। নারী-পুরুষ উভয়েরই ছিল অলঙ্কার প্রীতি। অলঙ্কার নির্মাণে ব্যবহৃত হতো সোনা এবং রূপাসহ নানা মূল্যবান ধাতু। অন্যান্য আঞ্চলিক সভ্যতার সঙ্গে এই সভ্যতার বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো, তারা লাপিস লাজুলি ও অন্যান্য রত্ন প্রস্তুতকারক উপাদান দূর থেকে আমদানি করা হতো।

শাসন সমাজ ব্যবস্থা

হরপ্পা খননকালে একটি রাজমূর্তির ভগ্নাশেষ পাওয়া যায়। তা থেকে অনেক ঐতিহাসিকের অভিমত, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিলো হরপ্পায় এবং পুরোহিত ও রাজা উভয়েই সে সময় সমাজকে শাসন করতো। হরপ্পা নগরে সামাজিক বৈষ্যম্যের একটি প্রকৃত চিত্রের দেখা মেলে। একদিকে এই বৈষম্যের ধারণা পাওয়া যায় নগরকে দুটি অংশে বিভক্ত করা থেকে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে মৃতদেহকে বিভিন্নভাবে কবর দেয়ার পদ্ধতি থেকেও সমাজের দুটি ভিন্ন শ্রেণীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। কিছু অধিবাসী মৃতদেহ সরাসরি কবর দিতো। আবার কোনো কোনো অধিবাসীর মৃতদেহ দাহ করে তার ছাই নিয়ে কবর দেওয়ার প্রচলন ছিলো। খননকালে কিছু কবরের মধ্যে মৃতদেহের ব্যবহার্য জিনিসও পাওয়া গেছে। কবরগুলির এই পার্থক্য হরপ্পা সভ্যতার শ্রেণী বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ বলেই ধারণা করা হয়।

কারিগরি শিল্পের উত্থান

হরপ্পার অধিবাসীরা মাটি ও তামার ব্যবহার জানতো। আর এসব উপকরণে তৈরি জিনিসপত্র দিয়ে গড়ে উঠেছিলো কুটিরশিল্প। হরপ্পার মৃৎশিল্পীরা তৈরি করতো নানা রকমের মাটির পাত্র, চমৎকার সব মাটির পুতুল, বিভিন্ন রকমের বাসনপত্র, যেমন- থালা, জালা, কলসি, বাটি ইত্যাদি। প্রায়শই এসব মাটির পাত্রে আঁকা হতো নানারকম নকশা। অনেক কারিগর চিনামাটি দিয়ে নানা জিনিসপত্রও তৈরি করতে পারতো বলে ধারণা করা হয়। সোনা ও রূপা দিয়ে তৈরি হতো নানা অলঙ্কার। তামা দিয়ে তৈরি হতো কুঠার, বর্শা, ছোরা, তীর- ধনুক, গুলতি, ঢাল ইত্যাদি নানারকমের অস্ত্রশস্ত্র। হরপ্পা নগরী খননকালে এসব নিদর্শন প্রচুর পাওয়া গেছে। এ থেকে অনুমান করা হয়, নগরীর অনেক অধিবাসীই ছিলো জাত শিল্পী। শহরের অনেক বাসিন্দাই ছিলেন বণিক ও শিল্পী। তারা নির্দিষ্ট পেশার ভিত্তিতে শহরের মধ্যে পল্লি নির্মাণ করে বাস করতেন। সিলমোহর, পুতি ও অন্যান্য দ্রব্য নির্মাণে অন্যান্য অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত ধাতু ও উপাদান ব্যবহৃত হতো।

হরপ্পা নগরীর পতন ঘটলো যেভাবে

কীভাবে এই সমৃদ্ধ নগরীর পতন ঘটলো তা আজও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ইতিহাস। ঐতিহাসিকগণ আজও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি এই ব্যাপারে। তবে ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ থেকে ১৭০০ এর মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে এই নগরী ধ্বংস হয়। অনেক ঐতিহাসবেত্তার মতে, কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণে এই নগর ধ্বংস হয়নি। ধ্বংসের পিছনে রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনেক কারণ। তাদের এক অংশের অনুমান, অতিবৃষ্টি, ভূমিকম্প- এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে এই নগরী ধ্বংস হয়। আবার অনেকে মনে করেন, অনাবৃষ্টিই দায়ী এই নগর ধ্বংসের পিছনে। বৃষ্টিপাতের তারতম্য ও জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে জমির উর্বরতাশক্তি হ্রাস পায়, ফলে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক বিপর্যয় ঘটে। তাই ঠিকমতো ফসল না হওয়ার কারণে কৃষিনির্ভর হরপ্পার পতন ছিলো অবশ্যম্ভাবী। কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্লেগ জাতীয় কোনো মহামারীর কারণে ধ্বংস হয়েছে এই সমৃদ্ধ নগরী।

আবার কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, যুদ্ধে পারদর্শী আর্যদের উপর্যুপরি আক্রমণের কারণে পতন ঘটে হরপ্পা নগরীর। প্রত্নতাত্ত্বিক এক অনুসন্ধানে হরপ্পায় একটি কবর থেকে একসাথে অনেকগুলো মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা থেকে অনুমান করা হচ্ছে বড়ধরনের এক গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিলো হরপ্পায়, যার কারণে পতন ঘটে নগরটির। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এরকম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার সপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কারণ আর্যরা ভারতবর্ষে এসেছিল হরপ্পা নগরী ধ্বংস হওয়ার পাঁচশ বছর পর। কাজেই কোনো সুনিদিষ্ট কারণ জানা না গেলেও কিছু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণ অবশ্যই ছিলো এই সমৃদ্ধ নগরী ধ্বংসের পিছনে। আর এভাবেই সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে যায় নগর সভ্যতার অপরূপ নিদর্শন ‘হরপ্পা নগরী’।