১ম বিশ্বযুদ্ধঃ মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায় (শেষ পর্ব)

প্রকাশিত: ১১:৩৩ অপরাহ্ণ, জুন ১৮, ২০২০

 

ফ্রান্স, রাশিয়া, বৃটেন,ইতালি, সার্বিয়া ও আমেরিকা ছিলো মিত্রশক্তি অন্যদিকে জার্মানি, বুলগেরিয়া,অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্য ও অটোমান সাম্রাজ্য ছিলো কেন্দ্রীয় শক্তি।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

আগস্টের ২৩ তারিখে মিত্রশক্তিতে যোগ দেয় এশিয়ান পরাশক্তি জাপান। যোগ দিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড মিত্রশক্তিতে যোগ দেয়।

 

বৃটেন উপনিবেশ দেশগুলো থেকে সৈন্যরা মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও এ সময়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

 

অটোমানরা রাশিয়ার বন্দর ওডেসা, সেবাস্তোপোল, নোভোরোসিকে বোমা বর্ষণ করে এবং বেশ কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। নভেম্বরের ৫ তারিখে বৃটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া একযোগে অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বিশ্বযুদ্ধ আরো জটিল হয়ে ওঠে।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

জার্মানি প্রথম কয়েক মাসেই বেলজিয়াম দখল করে নেয়। ফ্রান্সের দিকে অগ্রসর হলেও ফরাসি সেনাবাহিনীর সামনে টিকতে পারে নি জার্মানি। ১৯১৫ সালে রাশিয়া আক্রমণ করে ইউক্রেন ও ক্রিমিয়া দখল করে জার্মানরা। পরবর্তীতে রুশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন সময় জার্মানি আক্রমণের চেষ্টা করলেও সে চেষ্টা সফল হয়ে ওঠে নি। অটোম্যানরা দার্দানেলিস প্রণালী বন্ধ করে দিলে মিত্রশক্তি দার্দানেলিস দখলের চেষ্টা চালায় এবং অটোম্যানদের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।

 

১৯১৭ সালে মিত্রশক্তির ভাগ্য বিপর্যয় ঘটতে থাকে। জার্মান বাহিনী বেলজিয়াম, সার্বিয়া, রুমানিয়া, পোল্যান্ড ও উত্তর ফ্রান্স দখল করে রাশিয়া ও ইতালিকে কোণঠাসা করে ফেলে। এ সময় রাশিয়ার রাজনৈতিক পট পরিবর্তন পূর্ব রণাঙ্গনের যুদ্ধ পরিস্থিতির মোড় সম্পূর্ণরূপে ঘুরিয়ে দেয়। বলশেভিক বিপ্লবের ফলে বিপ্লবী সোভিয়েত সরকার জার্মানির সঙ্গে ব্রেটলিটভস্কের সন্ধি সাক্ষর করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

জার্মন নৌবাহিনীর সাথে বৃটিশ নৌবাহিনীর যুদ্ধে জার্মান নৌবাহিনীর পরাজয় ঘটে, এবং জার্মানির অধিকাংশ যুদ্ধ জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায়।  অনেক যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এ যুদ্ধে জার্মান নৌবহর বিধ্বস্ত হলে জার্মান নৌবাহিনী বেপরোয়া হয়ে সাবমেরিন আক্রমণ শুরু করে। সাবমেরিন আক্রমণের মাধ্যমেই জার্মান বৃটিশদের যুদ্ধ জাহাজ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ যাত্রীবাহী জাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজের ক্ষতি সাধন করে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছিলো। কিন্তু জার্মানি বেপরোয়া হয়ে ব্রিটেনের সাথে সাবমেরিন যুদ্ধ শুরু করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও কয়েকটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। এরপর জার্মান সাবমেরিনের আঘাতে মার্কিন যাত্রীবাহী জাহাজ আক্রান্ত হলে এক হাজার যাত্রীসহ জাহাজ ডুবে যায়।

 

১৯১৭ সালের ৬ এপ্রিল জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে মিত্রশক্তির পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।জার্মানি পূর্ব রণাঙ্গন থেকে পশ্চিম রণাঙ্গনে সৈন্য সরিয়ে নিয়ে আবার ফ্রান্স ও বেলজিয়াম আক্রমণ করে। এমন সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ যুদ্ধের মোড় পরিবর্তন করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলে বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জের বিরুদ্ধে জার্মানের নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে পড়ে।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

১৯১৮ সালে জার্মানি সামরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে সর্বশেষ চরম অভিযানের প্রস্তুতি নেয়। জার্মান বাহিনী পরপর তিনটি প্রচণ্ড আক্রমণ করে মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। জার্মানি তার চূড়ান্ত অভিযানে সর্বশক্তি নিয়োগ করে হতবিহ্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। ১৯১৮ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রিটেন ও অটোম্যানরা যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে। জার্মানির অভ্যন্তরে নৌবাহিনী ও বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এমতাবস্থায় জার্মানির সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম প্রবল গণ অসন্তোষ ও বিদ্রোহের মুখে শেষ পর্যন্ত সিংহাসন ত্যাগ করে হল্যান্ডে পালিয়ে যায়। জার্মানিতে প্রজাতান্ত্রিক সরকার স্থাপিত হয়। ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর প্রজাতান্ত্রিক সরকার মিত্রশক্তির সাথে যুদ্ধ বিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করলে ১ম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে।

 

মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মত এত বড় প্রলয়ঙ্করী বিশ্বযুদ্ধে অবশেষে বিজয়ী হয় মিত্রশক্তি। এবং নিজেদের আড়াল করার নীতি থেকে সরে এসে যুদ্ধের শেষ দিকে যোগ দিয়েই মূল নায়কের আসনে বসে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র! এরপর প্রেসিডেন্ট উইলসনের নেতৃত্ব শুরু হয় দুনিয়ায় নতুন ধারার রাজনীতি।

 

বিশ্লেষণ :

যুবরাজের হত্যার পর, জার্মানির হিসেব ছিলো যে, সার্বিয়ার বিরুদ্ধে একটি সংক্ষিপ্ত, আঞ্চলিক যুদ্ধে বিজয়ের সম্ভাবনা আছে। তাই তারা অস্ট্রিয়াকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে সার্বিয়ায় হামলা করার অনুমতি দিয়ে দেয়। যা হয় বিরাট ভুল! .

 

জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নজিরবিহীন সমর্থন দেয়ায় ভবিষ্যৎ জার্মান শক্তির সম্ভাবনায় আতংকিত ফ্রান্স এবং রাশিয়ার তরফ থেকে অনাকাঙ্খিত শত্রুতা ডেকে আনে! .

 

রাশিয়া এবং ফ্রান্স সাথে সাথে যুদ্ধে যোগ দিলেও জার্মানি তাদের ভালোই মোকাবেলা করছিলো, কিন্তু বৃটেনের চোখে রাশিয়া এবং ফ্রান্সের তুলনায় একটি নতুন ও শক্তিশালী জার্মানি ছিলো বড় হুমকি। তাই তারা পূর্বের চুক্তি অনুযায়ী ও নিজেদের ক্ষমতা সুরক্ষিত করার জন্যই জার্মানির বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করে। বৃটেনের মত পরাশক্তির আগমন জার্মানির জন্য ব্যাপক থ্রেট হয়ে দাঁড়ায়! .

 

আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাঝেই রাশিয়া পরাজিত হয়ে যুদ্ধত্যাগ করে। ব্যাপক সৈন্য ও সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতি ও কম্যুনিস্ট প্রোপাগান্ডাই সম্রাটের পতন ও রশিয়ার পরাজয় নিশ্চিত করে! .

 

ইতোমধ্যেই ৩ বছর ধরে চলা যুদ্ধে এবং শীতকালে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আক্রমণ করে ব্যাপক ক্ষতির শিকার জার্মান সেনাবাহিনী আমেরিকান জাহাজে আক্রমণ করে অদূরদর্শীতার পরিচয় দেয়। জার্মান নৌ-বাহিনীর আক্রমণ ঘুমন্ত দৈত্য যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে ডেকে এনে চূড়ান্তভাবে জার্মান পরাজয় নিশ্চিত করে! ( এমন স্ট্র্যাটেজিক ভুল জার্মানদের দ্বারাই সম্ভব তা আবারো প্রমানিত হয় ২য় বিশ্বযুদ্ধে )