ধর্ম ও বিজ্ঞান: ধর্মের বিজ্ঞান -(দ্বিতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:৫৬ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০

(১ম পর্বের পর)

ধর্মের উৎপত্তি কিভাবে হলো? এই প্রশ্নের উত্তর ধর্ম দিচ্ছে একভাবে। বিজ্ঞান দিচ্ছে অন্যভাবে। আমাদের ইসলাম ধর্মমতে আদম (আঃ) প্রথম মানুষ। তিনি নবী ছিলেন। পৃথিবীতে আসার আগে তিনি জান্নাতে ছিলেন। তার মানে তিনি সৃষ্টির শুরু থেকেই ধার্মিক এবং এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন। ইহুদি এবং খ্রিস্টান ধর্মও তাই বলে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। ধর্মের উৎপত্তি নিয়ে যেসব বিজ্ঞানীরা কাজ করেছেন তাঁদের মধ্যে টেইলর,ডুর্খেইম, ম্যারেট, ফ্রেজার উল্লেখযোগ্য। এঁদের একেকজনের মতামত একেক রকম। একেজন একেক রকম তত্ত্ব দিয়েছেন। এনিমিজম, এনিম্যালিজম, ফেটিসিজম,টোটেম, ম্যাজিক, ট্যাবু আরো হাবিজাবি নানা তত্ত্ব। তবে মোট কথা হলো মানুষ শুরুতেই ধার্মিক ছিলো না। এক ঈশ্বরবাদী তো নয়ই। ভয় থেকে ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে। আইনস্টাইনও এটাই বলেছেন। ক্ষুধার ভয়, নিজেকে রক্ষা করার ভয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং হিংস্র প্রাণির ভয়। সর্ব ঈশ্বরবাদ থেকে ধর্ম ধীরে ধীরে এক ঈশ্বরবাদের দিকে বিবর্তিত হয়েছে।

বিজ্ঞানের উৎপত্তি নিয়েও ধর্ম এবং বিজ্ঞানের মত আলাদা। ধর্ম বলছে – মানুষ সৃষ্টির পর আল্লাহ তাঁকে জ্ঞান দিয়ে দিয়েছেন। আর বিজ্ঞান বলছে- বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের প্রয়োজনে জ্ঞান অর্জন করে নিয়েছে। এখানে ঈশ্বর,আল্লাহ বা অতি প্রাকৃতিক কোন স্বত্তার হাত নেই। এখন কথা হলো, যে জিনিস দুটি একটি আরেকটির জন্ম নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করছে সে জিনিস দুটিকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর কোন কারণ কি আছে? আমার তো মনে হয় না। বিজ্ঞান কি ধর্মের ব্যাখ্যা মেনে নিবে? বা ধর্ম কি বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা মেনে নিবে? যদি না ই হয় তাহলে কেনো এই হীন চেষ্টা? এই হীনতা আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীকেও ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে বাধ্য করেছে। এটার অবশ্য অন্য একটা দিকও আছে। ধর্ম এতোই পাওয়ারফুল একটা ফেনোমেনন যে যুগ যুগ ধরে কেউই এটাকে উপেক্ষা করতে পারে নি।

ঈশ্বর বলে একজন আছেন বা নেই, মৃত্যুর পরে আরেকটা জগৎ আছে বা নেই, মানুষ কেন মারা যাচ্ছে, আত্মা কী, মৃত্যুর পরে আত্মা কোথায় যায়, আমরা কোত্থেকে এসেছি, কেনোই বা এখানে এসে দুঃখ,কষ্ট ভোগ করছি, এই দুঃখ,কষ্ট থেকে মুক্তির উপায় কী এগুলো কোনটাই কি বিজ্ঞান প্রমাণ করতে পেরেছে? অথচ এগুলোই ধর্মের মৌলিক আলোচনা। এই মহা বিশ্বের ছোট্ট একটা গ্রহের অল্প কিছু রহস্যের সমাধান বিজ্ঞান করতে পেরেছে। এটা আপনিও মানেন। আর এই মহাবিশ্বের সব আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন এটা আমি মানি। বিজ্ঞানের এই অল্প একটু জ্ঞান কি এই পুরো মহাবিশ্বের সামনে খুব অসহায় নয়? আর আমার বিশ্বাস করা মহাবিশ্বের সেই সৃষ্টিকর্তার সামনে?
ভলতেয়ারের একটা কথা দিয়ে এই অংশ শেষ করি- If God did not exist, It would be necessary to invent Him. যদি ঈশ্বর বলে কেউ নাও থাকে তবুও অবশ্যই একজন ঈশ্বরকে আবিষ্কার করে নিতে হবে।

এতোক্ষণ বিজ্ঞান ও ধর্ম নিয়ে বললাম। এখন ধর্মের বিজ্ঞান নিয়ে বলি। ধর্মের বিজ্ঞান বলতে ইসলামের বিজ্ঞান। কারণ আমি ইসলাম সম্পর্কেই শুধু কিছুটা জানি।কিছুটা মানে খুবই কম। ইসলামের বিজ্ঞান মানে কুরআনে বিজ্ঞানের কী কী আছে এগুলো নয়। অন্য কিছু।

আমরা ধার্মিকরা অধিকাংশই হীনমন্যতায় ভুগি। এই হীনমন্যতা থেকেই আমরা ধর্মের মধ্যে বিজ্ঞান খুঁজে বেড়াই। যদি বিজ্ঞানের সাথে একটু মিলে যায় তাহলে ধন্য হয়ে গেলাম এমন একটা ভাব! উদাহরণ দিচ্ছি- গত বছর রোজায় দেখলাম ফেইসবুক ভেসে যাচ্ছে অটোফেজি নিয়ে। কিছু কিছু হুজুর ওয়াজ করে গরম করে ফেলেছেন। আমাদের রোজার ক্ষুদ্র একটা অংশের সাথে অটোফেজির মিল আছে। একেবারে ধন্য হয়ে গেলাম। আহ!
এখন আপনার রোজা রাখার জন্য অটোফেজির এভিডেন্স লাগে। অটোফেজি তো ২০১৬ এর আবিষ্কার। ১৪০০ বছর আগে যারা রোজা রাখতো তাঁরা কী দেখে রোজা রাখতো? আল্লাহ বলেছেন রোজা রাখতে হবে,আমি রোজা রাখবো। নামাজ পড়তে হবে,আমি নামাজ পড়বো। এটা বিজ্ঞানের সাথে মিলুক বা না মিলুক। এটাই বিশ্বাস। এটাই ধর্ম। এখন যদি নামাজ,রোজার মধ্যে বিজ্ঞান খুঁজতে যাই,ধর্মকে যদি বিজ্ঞানময় হতে হয় তাহলে আমার বিশ্বাস কোথায়? বিজ্ঞানের সাথে ধর্ম মিলে গেলে আপনার ঈমান বেড়ে যায়। যদি বিজ্ঞানের সাথে না মিলে? ঈমান কমে যাবে? বিশ্বাসের পালে আগের মতো হাওয়া পাবেন না? বিজ্ঞান যদি হয় আপনার ঈমান কমা অথবা বাড়ার মানদণ্ড তাহলে এই ঈমান তো ধার্মিকের ঈমান না।

আমরা মুসলিমরা আমাদের প্রায়োরিটি ভুলে গেছি। টুপি, দাঁড়ি,পাঞ্জাবী হয়ে গেছে আমাদের টপমোস্ট প্রায়োরিটি। সততা,নিষ্ঠা,ভদ্রতা,বিনয়ের কথা ভুলে গেছি।ভুলে গেছি আরো অনেক কিছুর কথা। টুপি, দাঁড়ি, পাঞ্জাবী এগুলো একজন মানুষের বাহিরটা সুন্দর করে। কিন্তু সততা,বিনয়,ভদ্রতা ভিতরটা সুন্দর করে। প্রায়োরিটি হওয়া উচিত ছিলো এগুলো। এগুলোকে প্রায়োরিটি না করার ফলাফল কী হয়েছে জানেন? ত্রাণের চাল চোর এবার যেগুলো ধরা পড়েছে এগুলোর অনেকের মুখেই লাল দাঁড়ি ছিলো। কিন্তু ভিতরে সততা ছিলো না। নিষ্ঠা ছিলো না। আমি টুপি দাঁড়িকে ছোট করছি না বা বাদ দিয়ে দিচ্ছি না। প্রায়োরিটির কথা বলছি। মানুষকে যেমন মানুষ হয়ে উঠতে হয়, মুসলিমকেও মুসলিম হয়ে উঠতে হয়।

একজন মুসলমান মিথ্যা কথা বলবে না,চুরি করবে না, দুর্নীতি করবে না, অন্যকে ঠকাবে না, কারোর ক্ষতি করবে না, অন্যের প্রতি দয়াশীল হবে, কোন মুসলমানের কাছে হাত পাতলে কাউকে ফিরে যেতে হবে না, অহংকার,হিংসা,লোভ,বিদ্বেষ মুক্ত থাকবে। এগুলোই তো আমাদের ধর্মের বিজ্ঞান। ধর্মের সৌন্দর্য। একজন মুসলমানের চরিত্রে যদি এই গুণগুলো থাকে তাহলে কি এই সময়ে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে হবে? আপনার চারপাশ এমনিতেই আলোকিত হয়ে যাবে। এই বিজ্ঞান ভুলে আজকে আমরা অন্য বিজ্ঞান নিয়ে মেতে আছি। প্রায়োরিটি ভুলে গেছি। মনে রাখবেন- “রোলস রয়েসের বিজ্ঞাপন দেয়া লাগে না। বিজ্ঞাপন লাগে ফেয়ার এন্ড লাভলীর।”

এক ভিখারী মসজিদ,মন্দিরে গিয়ে খাবার পায় নি। কাজী নজরুল সাতদিনের না খাওয়া এই ভিখারীকে নিয়ে লিখেছিলেন-
ভিখারী ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে,
আশিটা বছর কেটে গেল,
আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা ব’লে বন্ধ করনি প্রভু।
তব মস্‌জিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী।
মোল্লা-পুর”ত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!

আমাদের মসজিদগুলোকে আমরা নিষ্প্রাণ করে দিয়েছি। পাঁচ তলা মসজিদের উপরের চার তলা খোলা হয় সপ্তাহে এক দিন। নিচতলা খোলা হয় শুধু নামাজের সময় । মসজিদের ভিতরে বড় করে লেখা থাকে- দুনিয়াবী কথা বলা নিষেধ। তাহলে মসজিদে কিসের কথা হবে? আসমানের উপরের আর মাটির নিচের কথা? তাহলে যে দুনিয়াকে, দুনিয়ার মানুষকে কেন্দ্র করে সবকিছু তাঁদের কথা হবে কোথায়? মদীনার সেই খেজুর পাতার মসজিদে কিসের কথা হতো ? মসজিদ হওয়ার কথা ছিলো জনকল্যাণমূলক কাজের কেন্দ্র। আল্লাহ কি আমাদের এই শ্বেত পাথর,স্বর্ণখচিত মসজিদের মুখাপেক্ষী? প্রায়োরিটি ভুলে গেছি। ধর্মের বিজ্ঞানকে ভুলে গেছি। ধর্মের বিজ্ঞানকে ভুলে ধর্মকে বিজ্ঞানময় করার চেষ্টায় মেতে উঠেছি। মেতে উঠেছি ছোট ছোট আরো অনেক কিছু নিয়ে। কাজী নজরুলের দুই লাইন দিয়ে শেষ করছিঃ
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়,কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে,চালা হাতুড়ি,শাবল চালা।

লেখা বিশাল হয়ে গেলো। আরো অনেক কিছুই লেখার ছিলো।এই বিশাল লেখা পড়ার জন্য ধন্যবাদ। পরিবর্তন নয়, এই লেখার মাধ্যমে কারোর চিন্তায় যদি সামান্যতম কম্পনও অনুভূত হয় তাহলেই আমি সার্থক। রোজা রেখে এই বিশাল লেখার কষ্ট সার্থক।

আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুক,সুস্থ ও সুন্দর রাখুক।

বিঃদ্রঃ সজল রোশন নামক একজন ইউটিউবারের ভিডিও থেকে আমার এই লেখার কিছু রিসোর্স নিয়েছি। ভিডিও নির্মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা।