ধর্ম ও বিজ্ঞান: ধর্মের বিজ্ঞান এবং এক ঘুষখোরের গল্প (শেষ পর্ব)

প্রকাশিত: ১০:০৩ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০

(প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের পর )

আল্লাহ বা ঈশ্বর বলে কেউ আছেন কিনা- এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই আস্তিক ও নাস্তিক এবং ধর্ম ও বিজ্ঞানের মাঝে বিরোধের শুরু। আস্তিকরা ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে নানা যুক্তি দিয়েছেন। এমন কয়েকটি যুক্তি হলো- কসমোলজিক্যাল আরগুমেন্ট, অনটোলজিক্যাল আরগুমেন্ট, টেলিওলজিক্যাল আরগুমেন্ট, মোরাল আরগুমেন্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। সেন্ট অ্যানসেলম,একুইনাস, ফ্লিন্ট,লাইবনিজ, দেকার্ত, মার্টিনিউ- এইসব জগত বিখ্যাত দার্শনিকেরা এই যুক্তিগুলো তুলে ধরে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। আবার কিছু নাস্তিক দার্শনিক এই যুক্তিগুলো খণ্ডনের চেষ্টা করেছেন। এই তালিকায় আছেন- ইমানুয়েল কান্ট, ডেভিড হিউম, ফ্রেডরিক নীটশে, বারট্রান্ড রাসেল এবং আরো অনেকেই। এঁরা শুধু খণ্ডনের চেষ্টা করেছে কিন্তু পাল্টা শক্তিশালী কোন যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে নি।লেখা খটমটে হয়ে যাচ্ছে। তাই এই আরগুমেন্টগুলোর বিস্তারিত আমি লিখলাম না। আর এগুলোর বিস্তারিত লিখা আমার এই লেখার উদ্দেশ্যও না। তবুও যদি কারোর জানতে ইচ্ছা করে তাহলে গুগল আছে। আর গুগল করতে ইচ্ছা না করলে আমি তো আছিই। নক করবেন।

এখন কথা হলো- এই যুক্তি,পাল্টা যুক্তি তো অনন্তকাল ধরে চলে আসছে। এটা তো থামানো উচিত। আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না। আপনার এই অবিশ্বাসকে আমি সম্মান করি। আবার, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাসকেও তো আপনার সম্মান করা উচিত।আপনি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে পারেন নি যে ঈশ্বর নেই, আবার আমিও নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে পারি নি যে ঈশ্বর আছে। আপনার যুক্তি, আমার যুক্তি সবই হাইপোথিটিক্যাল। নিশ্চিত কিছু না। তাই এই অনিশ্চিত ব্যাপার নিয়ে তর্কাতর্কি, রক্তারক্তির কোন মানে নেই। আল্লাহ যদি জাতির উদ্দেশ্যে সরাসরি একটা ভাষণ দিতেন তাহলে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো। এখন উনি যেহেতু ভাষণ দিচ্ছেন না,বা দিবেন না তাই আমাকে আমার বিশ্বাস নিয়ে থাকতে দিন। আপনি আপনার বিশ্বাস নিয়ে থাকেন। (এখন হয়তো আমার ধার্মিক ভাইয়েরা কুরআন,হাদিস নিয়ে আসবেন আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে। কুরআন,হাদিসের প্রমাণ নাস্তিকদের কাছে মূল্যহীন। মূল্যহীন না হলে তো এই সমস্যার সমাধান অনেক আগেই হয়ে যেতো।)

তবে একটা কথা কি জানেন ! আমি আপনি কেউই ভূতে বিশ্বাস করি না। তবে সেটা দিনের বেলায়। গভীর রাতে কবরস্থান,শশ্মান বা কোন পরিত্যাক্ত বাড়িতে যদি আমাদেরকে রেখে আসা হয় তাহলে বাপ,বাপ করে ভূতে বিশ্বাস হয়। খুব জোরেশোরেই হয়।মৃত্যুটাকে শুধু আসতে দেন। আল্লাহ আছে কি নাই তখন সেটা বাপ বাপ করেই টের পাবেন।

কয়েকদিন আগে এক সেমি নাস্তিকের সাথে কথা হচ্ছিলো। সে কথায় কথায় বললো- বিজ্ঞান যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে অল্প দিনের মধ্যেই অমরত্বের সন্ধান পেয়ে যাবে। তাকে হাসতে হাসতে বললাম- বিজ্ঞান যদি সত্যি সত্যিই অমরত্ব আবিষ্কার করে ফেলে তাহলে সবার আগে আমি নাস্তিক হয়ে যাবো। কারণ তখন আর আল্লাহ, ধর্ম, বিশ্বাস, কুরআন, হাদিস- এসবের কোন মানে থাকবে না। (আল্লাহ মাফ করুক)। এখন তাকে সামনে পেলে বলতাম- অমরত্ব! না? আমি,আপনি,আমরা মনুষ্যজাতি,আমাদের বিজ্ঞান এক ক্ষুদ্র ভাইরাসের সামনেই কতো অসহায়! অসহায় হয়ে খোদাকে ডাকছি অন্তহীন।

ধর্মের বিজ্ঞানঃ

ভার্সিটি ভর্তি কোচিং করছি। জাহাঙ্গীর নগরে ভর্তির জন্য এপ্লাই করবো। এপ্লাই করার জন্য এসএসসি (দাখিল), এইচএসসির (আলিম) সার্টিফিকেট লাগে। এইচএসসি যেখান থেকে দিয়েছি সেখানে ফোন করে জানলাম- আমাদের সার্টিফিকেট শিক্ষাবোর্ডে জমা দেয়া। তুলে নিতে হবে। দপ্তরিকে সাথে নিয়ে গেলাম বকশিবাজার। শিক্ষাবোর্ডে। সাথে আরো দুই ফ্রেন্ড। সার্টিফিকেট যার কাছে জমা তার কাছে গেলাম। মাথায় টুপি,মুখে লম্বা লাল দাঁড়ি। নিপাট ভদ্র লোক। সে কোনভাবেই আজকে সার্টিফিকেট দিবে না। তার কাছে এপ্লিকেশন লিখে আবেদন করে আসতে হবে। আবেদনের ১৫ দিন পর যোগাযোগ করতে বললো। রিকোয়েস্ট করলাম। অনুনয় করে বললাম- স্যার,আজকে বৃহস্পতিবার। আগামী রবিবারে জাহাঙ্গীর নগরে এপ্লাই এর লাস্ট ডেইট। পরে আর এপ্লাই করার সুযোগ থাকবে না। আমাদের অসহায় অবস্থা দেখে তার এক কলিগ রিকোয়েস্ট করলো। বললো – ‘আমার মেয়েটাও এইবার পরীক্ষা দিবে। ছেলেগুলোর সার্টিফিকেটগুলো দিয়ে দেন না! না হলে ওদের একটা বছর সময় নষ্ট হয়ে যাবে।’ কাজ হলো না। ২টায় গিয়েছি। তখন ৫টা বাজে। অসহায় হয়ে বের হয়ে যাচ্ছি। পিছন থেকে এক পিয়ন বললো- ভাই, কিছু টাকাটুকা বের করে দেন। তাইলেই হবে।
বললাম- কিভাবে দিবো? কতো দিবো?
– হাজার খানিক দেন। আর আসেন আমার সাথে।
– হাজার খানিক তো নাই।
-কতো আছে?
এক ফ্রেন্ড বললো – আমার কাছে ৫০০ আছে । আর আমাদের বাকি দুই জনের কাছে আছে ১০০। সপ্তাহে যেখানে আমাদের হাত খরচ ২০০ টাকা, সেখানে ৫০০ টাকা আমাদের কাছে তখন অনেক টাকা।
পিয়ন বললো- ঠিক আছে,৫০০ নিয়েই আসেন।

পিয়নের সাথে আবার ঐ লোকের ডেস্কে গেলাম। পিয়ন বললো-স্যার, ওরা আপনাকে কিছু হাদিয়া দিতে চায়। ওদের কাজটা করে দেন। এটা বলে পিয়ন ড্রয়ারে ৫০০ টাকা রাখলো। আড়চোখে টাকাটার দিকে তাকিয়ে সে উঠে দাঁড়ালো। খুব বিরক্তি নিয়ে বললো- তোমরা কী যে যন্ত্রণা করো না! ডেস্কের পাশের আলমারি থেকে একটা খাম বের করে বললো এটা থেকে খুঁজে নাও। দশ পনেরোটা সার্টিফিকেট থেকে আমাদেরগুলো খুঁজে নিয়ে চলে আসলাম।

ঘুষ দিয়ে উচ্চ শিক্ষা জীবনের যাত্রা শুরু । হা হা হা ।

বোর্ডের মসজিদেই আসর নামাজের জন্য দাঁড়িয়েছি। আমাদের সামনের কাতারে ঘুষ নেয়া, লাল দাঁড়ি, টুপিওয়ালা সেই লোক।
আহ! এই ঘুষখোরের নামাজের কোন মূল্য কি আল্লাহর কাছে আছে? এই ঘুষখোর কি ধর্মের বিজ্ঞানটা ধরতে পেরেছে? প্রায়োরিটির কথা বলেছিলাম আগের লেখায়। প্রায়োরিটি ভুলে গেছে। এই জন্যই আমি মাঝে মাঝে বলি- আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ ধার্মিক না,ধর্মান্ধ। ধার্মিক আর ধর্মান্ধের পার্থক্যটা আশা করি ধরতে পেরেছেন।

নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখে। সূরা আনকাবুতঃ৪৫।

ধর্মের শতভাগ বিজ্ঞান যে মানুষ ধরতে পেরেছে, শতভাগ ধর্মীয় মূল্যবোধে যে মানুষ শক্তিমান,আখিরাতের কথা বাদ দিলাম,দুনিয়াতেই সে মানুষ অবিসংবাদিত,অনুকরণীয় আদর্শ।

আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুক,সুস্থ ও সুন্দর রাখুক।