ধর্ম ও বিজ্ঞান: কিছু ক্যাচাল,কিছু প্যাঁচাল- (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:৫২ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০

লিখেছেনঃ মাহমুদ হাসান।

যদি বেঁচে যাও এবারের মত
যদি কেটে যায় মৃত্যুর ভয়,
এই এক কবিতাতে ফেইসবুক ভেসে যাচ্ছে। এই দুই লাইনের পরে আরো দুটি লাইন আছে। সে দুটি লাইন যে যার মতো এডিট করে নিয়েছে। ধার্মিক ধার্মিকের মতো করে, নাস্তিক নাস্তিকের মতো করে। নাস্তিকরা এই কবিতার মাধ্যমে ধর্ম ও বিজ্ঞানকে মুখোমুখি করার একটা জিগির তুলে দিয়েছে। এই জিগির নিয়েই আজ একটু কথা বলবো-

ধর্ম ও বিজ্ঞানকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর এই হীন চেষ্টা শত শত বছর আগে থেকেই চলে আসছে। এবারই যে প্রথম তা নয়। ধর্ম ও বিজ্ঞান- সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ব্যাপার। কেনো ভিন্ন, সে আলোচনা পরে করছি। আগে দেখি- ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে তুলনা করা যায় কিনা ! সাহিত্যে অলংকার শাস্ত্র বলে একটা ব্যাপার আছে। আরবীতে বলা হয় বালাগাত। ইংলিশে বলা হয় রেটোরিক। রেটোরিক ভাষার সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করে। রেটোরিক্যালি দুটি জিনিসের মধ্যে যদি আপনি তুলনা করতে যান তাহলে অবশ্যই সেই দুটি জিনিসকে একই টাইপের হতে হবে। যেমন- আপেলের সাথে আপেলের তুলনা করতে হবে। আপেলের সাথে কমলার তুলনা করা যাবে না। যদি করেন তাহলে সেটা ভুল হবে। এটা রেটোরিকের খুব বেসিক একটা জিনিস। এখানে ধর্ম হচ্ছে আপেল আর বিজ্ঞান হচ্ছে কমলা। এই বেসিক জিনিসটা ভুলে গেলেন কিভাবে? আর বিজ্ঞান নাস্তিকদের বাপ,দাদার সম্পত্তি, পুরোটাই আপনাদের মনোপলি – এই আজগুবি ধারণা আপনাদের কেনো হলো?

ধর্মের মূল কথা হচ্ছে বিশ্বাস আর বিজ্ঞানের মূল কথা অবিশ্বাস। যৌক্তিকভাবে কোনকিছু প্রমাণ না করা পর্যন্ত বিজ্ঞান সেটা বিশ্বাস করবে না। বিজ্ঞান তার সে অবিশ্বাস অন্য কারোর উপর চাপিয়েও দিবে না। এটা বিজ্ঞানের মূলনীতি। এখন বিজ্ঞান প্রমাণ করতে পারছে না মানে সে জিনিসের অস্তিত্ব নেই ব্যাপার কিন্তু তা না। যেমন- কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের পূর্বেও আমেরিকার অস্তিত্ব ছিলো। শুধু মানুষের কাছে অপরিচিত ছিলো। Absence of evidence is not evidence of absence- এটা তো ভাইয়া মাথায় রাখতে হবে। মৌলিকভাবে ভিন্ন দুটি জিনিসকে মুখোমুখি দাঁড় করানোটা মূর্খতা। শত শত বছর ধরে এই মূর্খতা কেনো চলে আসছে আমার বুঝে আসে না। ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে হাজারটা ভিন্নতা আছে। গুগল করে দেখে নেন। নারীকে পুরুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সমানাধিকারের দাবিটাও একই রকমের মূর্খতা। একটু ত্যানা প্যাঁচালাম আর কি!

আরেকটা প্রেক্ষাপট দেখেন। ফিজিক্স,ক্যামিস্ট্রি, চিকিৎসা বিজ্ঞান, মোবাইল,কম্পিউটার, ইন্টারনেট, গাড়ি,বিমান,রকেট,ইত্যাদি ইত্যাদিই কি বিজ্ঞান? অবশ্যই না। বিজ্ঞান মানে হলো বিশেষ জ্ঞান। জ্ঞানের প্রাচীনতম ব্রাঞ্চ হলো ফিলোসোফি। ফিলোসোফিও বিজ্ঞান। সমাজ নিয়ে আলোচনা করে সোশিওলোজি। এটাও বিজ্ঞান। অপরাধ নিয়ে আলোচনা করে ক্রিমিনোলোজি। এটাও বিজ্ঞান। নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা করে এথিক্স। এটাও বিজ্ঞান। মানুষের উৎপত্তি নিয়ে কাজ করে এনথ্রোপোলোজি। এটাও বিজ্ঞান। এমনকি বিজ্ঞানের সবচেয়ে বিপরীত ব্যাপার হচ্ছে মিথ।কল্প কাহিনী। কল্প কাহিনী নিয়ে আলোচনা করে যে বিদ্যা, মিথোলোজি, সেটাও বিজ্ঞান। এগুলোর স্পেশালিস্ট যারা তারা বিজ্ঞানী। ধর্ম নিয়ে আলোচনা করে থিওলোজি। উপরের যুক্তি অনুযায়ী এটাও বিজ্ঞান হওয়ার কথা। কিন্তু থিওলোজিকে আপনি বিজ্ঞান হিসেবে মানতে পারেন না। ধর্মের যারা স্পেশালিস্ট,ধর্মতত্ত্ববিদ, তাঁদেরকে আপনি বিজ্ঞানী বলতে পারেন না। ব্যাপারটা অনেকটা পাছা দিয়ে পাহাড় ঠেলার মতো হয়ে গেলো না?

এই পর্যায়ে এসে কি আমার কথা স্ববিরোধী মনে হচ্ছে? ক্লিয়ার করি। মিথ- বিজ্ঞান নয়। কিন্তু মিথের আলোচনা করে যে বিদ্যা সেটা বিজ্ঞান। ধর্মও বিজ্ঞান নয়। কিন্তু ধর্মের আলোচনা করে যে বিদ্যা,ধর্মতত্ত্ব,সেটা বিজ্ঞান। ।

কোটি কোটি মানুষ আজকে রোজা রেখেছে। ক্ষুধা,পিপাসায় কষ্ট করছে। বাসায় একাকী আছে, তবুও কিছু খাচ্ছে না। কারণ ধর্ম বিধি নিষেধ দিয়ে দিয়েছে। ধর্ম কতো শক্তিশালী ব্যাপার খেয়াল করেছেন? ধর্মের জন্য মানুষ জীবন দিতে প্রস্তুত। করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসা এবং মৃতদের দাফন করার মতো কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি, আপনি ঘরের কোণে। হোম কোয়ারেন্টাইন্ড। কিন্তু কিছু ধার্মিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেমে গেছে। মরে গেলে এক পরম স্বত্তা তাঁকে পুরস্কৃত করবেন- এই বিশ্বাস নিয়ে। কতো শক্তিশালী চিন্তা করেছেন! এমন বিশাল শক্তিশালী একটা সোশ্যাল ফেনোমেননকে আপনারা বাদ দিতে চান কেনো? ধর্মের কারণে মারামারি,কাটাকাটি, বিভাজন হচ্ছে তাই? মর্গান ফ্রিম্যান সুন্দর বলেছেন- There is no bad religion. There are only bad people. খারাপ কোন ধর্ম নেই। কিছু খারাপ মানুষ আছে। এই খারাপ মানুষেরাই ধর্মকে মারামারি, কাটাকাটি, বিভাজনের বিষয় বানিয়েছে। আপনি মানেন না সেটা আপনার ব্যাপার। আপনার এই অবিশ্বাসটাই আপনার বিশ্বাস। কিন্তু যে ধর্ম মানে,বিশ্বাস করে তাঁকে সহ্য করতে পারেন না কেনো?

কিছু বেসিক ব্যাপার নিয়ে কথা বলতেই লেখা বড় হয়ে গেলো। এই বিশাল আলোচনা অল্প লেখায় শেষ করা মুশকিল। চলবে ইনশাআল্লাহ। পরের পর্ব আগামীকাল। ধার্মিকরাও কেনো সবকিছুতে বিজ্ঞান খোঁজে -আগামীকালের লেখায় এটা রাখার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুক,সুস্থ ও সুন্দর রাখুক।