দোয়ার কিছু শর্ত ও আদব

প্রকাশিত: ৪:৩৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২১
দোয়া ও মোনাজাতের প্রতীকী ছবি।

দুনিয়া হলো আখেরাতের কর্মক্ষেত্র। তাই মোমিনরা সর্বদা আখেরাতের কর্ম সম্পাদনে লিপ্ত থাকার চেষ্টা করে এবং আল্লাহর রহমতের আশা করে। আর নিজের যে কোনো প্রয়োজনে সেই অসীম সত্তার কাছে দোয়া করতে থাকে। কেননা ইসলামি শরিয়তে দোয়া ও মোনাজাতের অনেক গুরুত্ব রয়েছে।

হাদিসের মধ্যে দোয়া করাকে স্বতন্ত্র একটি ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, দোয়া সব ইবাদতের মগজ। এছাড়াও দোয়ার আরেকটি বিষয় হলো, প্রত্যেকটি দোয়ার জন্য আলাদা সওয়াব অর্জনের বিশেষ পন্থা রয়েছে। আর দোয়া কবুল হওয়ার জন্য রয়েছে কিছু শর্ত এবং কিছু আদব। যে বিষয়গুলো মেনে দোয়া করলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন আমাদের দোয়া ও মোনাজাত কবুল করবেন।

 

দোয়া কবুল হওয়ার জন্য কিছু শর্ত

১. দোয়াকারীর পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছেদ, বাসস্থান হালাল হওয়া। কেননা রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ সফর করে এলোমেলো চুল ও ধূসর দেহ নিয়ে আসমানের দিকে দুই হাত উত্তোলন করে বলতে থাকে, হে আমার রব। অথচ তার পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছেদ সবই হারাম। তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (মুসলিম : ১০১৫)।

 

২. বাহ্যিকভাবে দোয়া কবুল হতে বিলম্ব হওয়ায় অধৈর্য না হওয়া এবং একথা না বলা যে, আমি দোয়া করেছিলাম কিন্তু কবুল হয়নি। কেননা রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, তোমাদের দোয়া কবুল হবে যদি তোমরা তাড়াহুড়া না করো এবং একথা না বলো যে, আমি দোয়া করলাম কিন্তু কবুল হলো না। (মুসলিম : ২৭৩৫)।

 

৩. প্রার্থিত বিষয় নাজায়েজ কিছু না হওয়া। রাসুলে আকরাম (সা.) এরশাদ করেন, কোনো মুসলমান যখন দোয়া করে আল্লাহ তায়ালা তার কাঙ্ক্ষিত সেই বস্তু দান করেন অথবা তার থেকে অনুরূপ অনিষ্টতা দূর করেন। যদি সে গোনাহের এবং আত্মীয়তা ছিন্ন করার দোয়া না করে। (তিরমিজি : ৩৪৬৮)।

 

৪. দোয়া কবুল হওয়ার জন্য এটাও শর্ত যে, মুসলিম উম্মাহের মাঝে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ থাকা। তাছাড়া দোয়া কবুলের প্রতিশ্রুতি বলবৎ থাকে না। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, হে লোক সকল, আল্লাহপাক তোমাদের বলেছেন, তোমরা সৎ কাজের আদেশ করো এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো। এমন সময় আসার আগে যখন তোমরা আমাকে ডাকবে কিন্তু আমি সাড়া দেব না। তোমরা আমার কাছে চাইবে কিন্তু আমি পূর্ণ করব না। তোমরা শত্রুর বিরুদ্ধে আমার কাছে সাহায্য চাইবে; কিন্তু আমি সাহায্য করব না। (ইবনে হিব্বান : ২৯০)।

 

 

দোয়ার কিছু বিশেষ আদব

দোয়া-মোনাজাতের জন্য কুরআনে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট ৪টি আদব ও নিয়ম রয়েছে। প্রথমটি হলো নিজের অপরাগতা ও অক্ষমতা এবং বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করে দোয়া করা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে- চুপিচুপি ও সংগোপনে দোয়া করা।

তৃতীয় ও চতুর্থ হলো যথাক্রমে ভয় ও আশান্বিত হয়ে আল্লাহ তায়ালাকে ডাকা। কুরআনুল কারীমের ভাষায়, উদয়ূ-হু খাউফান ওয়া তোমায়ান : তোমরা আল্লাহকে ভয় ও আশা সহকারে ডাকো।’ (৭ : ৫৬)।

 

এছাড়াও, ১. অজুর সঙ্গে দোয়া করা (মুসলিম : ২৪৯৮)। ২. কেবলামুখী হয়ে দোয়া করা। (বোখারি : ৩৯৬০)। ৩. দোয়ার সময় সিনা বরাবর হাত তোলা এবং দোয়ার শেষে চেহারায় হাত মোছা (আবু দাউদ : ১৪৮৫)। ৪. দোয়ার আগে কোনো নেক আমল করা (মুসলিম : ২৭৪৩)। ৫. আল্লাহর বড়ত্ব ও মহত্ত্বের পূর্ণ অনুভূতি নিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে কাকুতি-মিনতি করে এভাবে দোয়া করা যে, হে আল্লাহ আপনি আমাকে দিয়েই দেন। আপনি ছাড়া আমার কোনো রব নেই। আপনি দোয়া কবুল না করলে আমার কোনো উপায় থাকবে না (ইবনে হিব্বান : ৮৭১)। ৬. দোয়ার শুরুতে এবং শেষে আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করা। এবং আমিন বলে দোয়া শেষ করা (তিরমিজি ৩৪৭৬)। ৭. এই ইয়াকিন ও বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করা যে, আমি যা চাইলাম আমার আল্লাহ আমাকে অবশ্যই তা দান করবেন (বোখারি : ৬৩৩৯)। ৮. প্রথমে নিজের জন্য দোয়া করা অতঃপর আত্মীয়-স্বজন ও সব মোমিন ভাইবোনের জন্য দোয়া করা, দোয়ায় কান্নাকাটি করা এবং নাজায়েজ ও গোনাহের বিষয়ে দোয়া না করা।

 

এক হাদীসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, বান্দা যতক্ষণ কোন গুনাহ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কছেদের দোয়া না করে এবং তড়িঘড়ি না করে, ততক্ষণ তার দোয়া কবুল হতে থাকে। সাহাবাগণ আরজ করলেন, তড়িঘড়ি দোয়া করার অর্থ কি? তখন বলা হলো : এর অর্থ হলো এরূপ ধারণা করে বসা যে, আমি এত দীর্ঘদিন থেকে দোয়া করছি অথচ এখনও পর্যন্ত কবুল হলো না, অতঃপর নিরাশ হয়ে দোয়া ত্যাগ করা। (মুসলিম, তিরমিজি)।

 

তিরমিজি শরীফে আবী উমামা (রাদি) হতে বর্ণিত, একবার রাসুলকে (সা.) প্রশ্ন করা হলো : কোন দোয়া বেশি কবুল হয়? জবাব দিলেন, ‘শেষ রাতের মধ্যকালের ও ফরজ নামাজের পরের দোয়া।’

 

হযরত আবু হোরাইরা (রা.) রাসুল (সা.) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন : বান্দা যখন সিজদায় থাকে তখন তার রবের সব চাইতে নিকটবর্তী হয়। কাজেই (সিজদায় গিয়ে) খুব বেশি করে দোয়া করো’। (মুসলিম)

 

রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, আল্লাহর শপথ! আমি দৈনিক সত্তরবারের অধিক আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাওবা করি। (বুখারী)

 

বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত রয়েছে- তিনি বলেন, প্রিয় নবী (সা.) অধিকাংশ সময় এই বলে দোয়া করতেন, আল্লাহুম্মা আ-তিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আ-খিরাতে হাসানাতাও ওয়া কি-না আযা-বান না-র অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ ও আখিরাতে কল্যাণ দান করো এবং জাহান্নামের আযাব থেকে আমাকে রেহাই দাও।

 

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন আমাদের দোয়ার সব শর্ত এবং সব আদব মেনে দোয়া করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।