দোয়া: মুমিনের অব্যর্থ অস্ত্র (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ৬:৩৪ অপরাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০

লিখেছেন রিদওয়ানুল হাসান

[ দোয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আমরা যেমন অনবগত তেমনি দোয়া নিয়ে আমাদের মাঝে বেশকিছু ভুলেরও প্রচলন রয়েছে৷ দুই পর্বে এসব বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে আলাপ করা হবে৷ এই পর্বে থাকছে দোয়ার গুরুত্ব, ফজিলত ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদির উপর আলোচনা৷ দ্বিতীয় পর্বে থাকবে দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ সময়, কবুল না হওয়ার কারণ ও দোয়া নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুলের উপর আলোচনা৷ ]

 

• দোয়ার গুরুত্ব ও ফজিলতঃ

নোমান বিন বাশির রা. থেকে বর্ণিত৷ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ‘দোয়া বিশেষ এক ইবাদাত৷’ অতঃপর তিনি কোরআনের এই আয়াত পাঠ করেন৷ {সূরা গাফির- ৬০} ‘আর তোমাদের প্রতিপালক বলেন- তোমরা আমাকে ডাকো৷ আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো৷ নিশ্চয়ই যারা আমার ইবাদাত থেকে অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে রাখে তারা অচিরেই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে৷’(¹)

হাদীসে দোয়াকে বিশেষভাবে ইবাদাত বলা হচ্ছে কেন? এর সুন্দরতম একটি ব্যাখ্যা হলো, ইবাদাতের মধ্যে তাওহীদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ তাওহীদ হলো আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদকে পরিপূর্ণরূপে আদায় করা৷ একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ইবাদাত করা৷ আর দোয়ার মধ্যে এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়৷ যত গুনাহগারই হোক, কোনো মুসলমান যখন বিপদে-আপদে, নিজের প্রয়োজনে দোয়ার জন্য দুটি হাত তুলে তখন তার মনের মধ্যে কেবল আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও মহত্বের বিষয়টিই প্রতিভাত থাকে৷ অসহায় মন শক্তিশালীভাবে স্বাক্ষ দেয়, এ দরবার থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হলে তোর কোনো উপায় নেই….৷ এ কারণেই দোয়া এমন এক আমল, শর্ত এবং আদব রক্ষা করে সম্পাদন করা হলে আল্লাহ তায়ালা কবুল করবেনই এবং বিনিময়ে কোনো না কোনো পুরস্কার দিবেন।

হাদীসটির ব্যাখ্যায় ওলামায়ে কেরাম আরও বলেন, দোয়া যেহেতু এক প্রকার ইবাদাত সুতরাং কোনো ব্যক্তি যতক্ষণ দোয়াতে মশগুল থাকে ততক্ষণ অন্য যে কোন সাধারণ আমলের সমপরিমাণ সওয়াব পেতে থাকে৷ সুবহানাল্লাহ! কত চমৎকার ব্যাপার! আমি আমার নিজের প্রয়োজনের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলব আর প্রয়োজনের কথা পেশ করবো; ওই সময়টুকুতেও ইবাদাতের সওয়াব পেতে থাকবো।

 

• দোয়ার সবচে’ বড় ফজিলতঃ

মুসনাদে আহমাদের এক হাদীসের মর্ম- কোনো মুসলমান যখন অন্যায় কাজ কিংবা আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করার উদ্দেশ্য ব্যতিরেকে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে দোয়া করে, আল্লাহ তা’আলা এর বিনিময়ে তাকে তিনটি পুরস্কারের একটি পুরস্কার প্রদান করেন৷ ১. নিকটবর্তী সময়ে তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন৷ ২. কিংবা এ দোয়ার বিনিময়ে আখেরাতের জন্য তার আমলনামায় নেকী জমা করে দেন৷ ৩. অথবা এর বিনিময়ে তার কোনো একটি বিপদ দূর করে দেন। সাহাবায়ে কেরাম এই বিরাট ফজিলত শুনে বলে উঠলেন, তাহলে তো আমরা অনেক দোয়া করব, করতেই থাকবো৷ আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন তোমরা যতটা করবে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি দেয়ার ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালা রাখেন।(²)

 

• অপর মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া করা এবং অপরের কাছ থেকে দোয়া চাওয়াঃ

অপর মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্দেশিত আমল এবং এর অনেক ফজিলত রয়েছে। হাদীসের ভাষ্য- ‘অনুপস্থিত মুসলিম ভাইয়ের জন্য কোনো ব্যক্তির দোয়া আল্লাহ তাআলার দরবারে সরাসরি কবুল৷ এই দোয়ায় আমীন বলার জন্য একজন ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন৷ যখনই দোয়াকারী ব্যক্তি অপর মুসলিম ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দোয়া করে তখনই ঐ দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা বলে উঠেন, আল্লাহ তোমার দোয়া কবুল করে নেন এবং তোমাকে অনুরূপ কল্যাণ দান করেন।(³)

নেককার বুজুর্গদের কাছে দোয়া চাওয়াও সুন্নাহভিত্তিক একটি আমল৷ রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এ আমল শিখিয়েছেন এবং সাহাবায়ে কেরামও এর উপর আমল করেছেন৷ উমর রা. একবার উমরায় যাওয়ার অনুমতি চাইলে আল্লাহর রাসূল ﷺ অনুমতি দিয়ে বলেন, প্রিয় ভাই, আমাদেরকে তোমার দোয়ায় শরীক রাখতে ভুলো না৷(⁴)

তবে সাহাবায়ে কেরাম এক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি অপছন্দ করতেন৷ অর্থাৎ তাদের যুগে নওমুসলিমদের কেউ কেউ নিজের আমলে অবহেলা প্রদর্শন করে অন্যদের কাছে দোয়া চেয়ে বেড়াতে শুরু করে৷ সাহাবায়ে কেরাম তখন এ বিষয়ে সতর্ক করেন৷ উমর রা. এর যমানায় এক লোক তাঁর কাছে দোয়া চাইলে তিনি বলেন, আমি তো নবী নই [যে দোয়া করলেই তোমার জন্য কবুল হয়ে যাবে], বরং তুমি যখন নামাজ শেষ করবে তখন নিজের গুনাহর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করবে৷(⁵)

উমর রা. এর উদ্দেশ্য ছিলো লোকটিকে ব্যক্তিগত আমলের উদাসীনতার প্রতি সতর্ক করা৷ আমাদের সমাজেও অনেকের এই উদাসীনতা রয়েছে৷ মসজিদের ইমাম, মাদরাসার হুজুর, মুরুব্বী আত্মীয় থেকে দোয়া চাওয়াটাকেই যথেষ্ট মনে করেন নিজের জন্য৷ ব্যক্তিগত আমল পরিবর্তনের গুরুত্ব অনুধাবন করতে চান না৷ এই ব্যাপারে আমরা নিজেরা সতর্ক হই, অপরকেও সতর্ক করি৷ আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দ্বীনের সামগ্রিক ইলম অর্জনের তাওফীক দিন৷ আমীন৷

 

#ফুটনোট

  • 1- সুনানে তিরমিজী হা. নং 3372
  • 2- মুসনাদে আহমাদ হা. নং 11133
  • 3- সহীহ মুসলিম হা. নং 2733
  • 4- সুনানে আবু দাঊদ হা. নং 1498
  • 5- আল ইতিসাম, শাতিবী 1/501