ঢাকা, বুধবার ১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩১শে ভাদ্র, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৭ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

দেওবন্দ: একটি সামগ্রিক বিপ্লবের সূতিকাগার (দ্বিতীয় পর্ব)


প্রকাশিত: ১১:০০ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২০

গত পর্বের সূত্রধরে

আলিম-সিপাহী-জনতা বিপ্লবের পর একদিকে চলছিল মিশনারিদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ অপরদিকে আলেম উলামাদের হত্যা। ফলে উপমহাদেশের অবস্থাও স্পেন, বুখারা আর সমরকন্দের মত হতে চলছিল৷

ইয়ামামার যুদ্ধে ৭০ জন হাফেজে কোরআন শহীদ হয়েছিলেন। সাহাবীগণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন কোরআন সংরক্ষণের ব্যাপারে। যার ফলে তড়িৎ কোরআন সংকলন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিলো। তেমনি উপমহাদেশের আলেমদের হত্যাও চিন্তিত করে তুলেছিল এ অঞ্চলের বাকি আলেমদের। মক্তব- মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছিল। এশলি ইডেন লিখেন,

‘শুধু বাঙলাতেই ৮০ হাজার মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো।’

গণহত্যার ফলে উদ্ভূত আলেমশূণ্য পরিস্থিতি আর সেই সাথে মাদ্রাসাসমূহ বন্ধ হয়ে যাওয়া। তার ওপর ইংরেজ-দের প্রবর্তিত ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা উপমহাদেশকে ধর্মীয় অজ্ঞতার দিকে ধাবিত করছিল। উইলিয়াম হান্টারের বক্তব্য অনুযায়ী,

‘মুসলমান তরুণদের ধর্মশিক্ষার কোনও প্রকার সুযোগ রাখা হয় নি। পরন্তু মুসলমানদের ওয়াকফ সম্পদের অপব্যবহার শুরু করে ইংরেজ সরকার।’

যে শিক্ষার সুযোগ মুসলমানরা পেয়েছিল, তাও স্রেফ উপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখার স্বার্থে প্রণীত ছিল। লর্ড মেকেলের ভাষ্য– (১৯৩৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ‘দেশ’ পত্রিকা)

‘এমন এক শ্রেণির লোক প্রস্তুত করিয়া যাইতে হইবে, যাহাদের কৃষ্ণচর্মের নিম্নে ভারতীয় শোণিত (রক্ত) প্রবাহিত হইবে সত্য, কিন্তু রুচি, মতামত ও চিন্তা ও চিন্তার ধারায় তাহারা হইবে সম্পূর্ণ ইংরেজভাবাপন্ন।’

এসব কারণেই মুসলমানদের স্বতন্ত্র শিক্ষার জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় দেওবন্দ মাদ্রাসা। প্রবর্তিত করা হয় দেওবন্দী ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা। কাসেম নানুতুবী রহ. হাজী ইমদাদুল্লাহ রহ. ও মুফতি রশিদ আহমদ গঙ্গুহী এর পরামর্শক্রমে ১৮৬৬ সালের ৩০ মে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসার যাত্রা শুরু হয়। কাসেম নানুতুবী রহ. এর জীবদ্দশাতেই সাহারানপুর, থানাভবন, দারভাঙ্গা, মুরাদাবাদ, গুলাঠি, মৌ প্রভৃতি অঞ্চলে আরও সাতটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে কেবল উপমহাদেশেই এই ধারার মাদ্রাসার সংখ্যা লক্ষাধিক।

দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাস পরতে পরতে ইংরেজ বিরোধী সংগ্রামে মোড়া। মুসলমানদের ঈমানী চেতনার বিস্তারে এর অবদান অনস্বীকার্য। দারুল উলুম দেওবন্দের বহু শিক্ষক ইংরেজ আমলে নির্বাসিত, কারানির্যাতন এবং কারামৃত্যুর শিকার হয়েছেন। মুখোমুখী হয়েছিলেন উগ্র হিন্দুত্ববাদেরও। বিশেষত আর্য সমাজ আন্দোলন দারুল উলুম দেওবন্দকে মোকাবিলা করতে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এই আর্য সমাজ রবীন্দ্রনাথের মত লোকের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। আর্য সমাজের প্রতিনিধি ‘স্বামী শ্রদ্ধানন্দ’কে লিখিত রবীন্দ্রনাথের পত্র তাঁরই জীবদ্দশায় পুস্তকাবদ্ধ হয়।

আল্লামা ইকবাল একবার পত্র লিখলেন উর্দুর প্রখ্যাত কবি হাকিম আহমাদ শুজাকে। খান বাহাদুর শুজা ছিলেন মর্ডানিস্ট ধারার। মাদ্রাসাগুলোর সংস্কার এবং মাদ্রাসা থাকার কী প্রয়োজন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন শুজা।

সেই পত্রে আল্লামা ইকবাল রহ. লিখেছেন,

‘মাদ্রাসাগুলো যেভাবে চলছে সেভাবেই চলতে দিন। গরিব মুসলমানের সন্তানগুলো এখানে পড়ছে পড়ুক। আপনি জানেন যদি এই মোল্লারা হারিয়ে যায় তাহলে এর পরিণতি কী হবে?

মাদ্রাসাগুলো তার প্রভাব হারালে এর পরিণতি হবে স্পেনের মতো। আমি নিজ চোখে দেখেছি সেখানে আটশত বছরের মুসলিম শাসনের চিহ্নমাত্র নাই- কেবল কর্ডোভা ও গ্রানাডার আল-হামারা এবং বাব আল আখওয়াইন প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ ছাড়া।

এই মাদ্রাসাগুলো না থাকলে এখানে ইসলামের আর চিহ্নমাত্রও অবশিষ্ট থাকবে না। কোনও কিছুর অস্তিত্বই থাকবে না, কেবলমাত্র আগ্রার তাজমহল আর দিল্লির লাল কেল্লা ছাড়া।’

ইকবাল যথার্থই বলেছিলেন। এই মাদ্রাসাগুলো আছে বলেই আজ আমরা ইসলামকে জানি। এই মাদ্রাসাগুলোর জন্যই আমাদের পূর্বপুরুষেরা কোরআন পড়তে জানতেন। নামাজ পড়তে শিখেছিলেন। আমরাও তাই।

পুরো উপমহাদেশীয় অঞ্চলে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারে, সমাজ সংস্কারে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেওবন্দ মাদ্রাসার যে অবদান তা নিয়ে কখনো নূন্যতম মূল্যায়ন করা হয় নি। মূল্যায়ন তো পরের কথা আমরা দেওবন্দের পরিচয়টা পর্যন্ত জানি না৷ পাঠ্যবইয়ে রামমোহনের সমাজ সংস্কার, ব্রাহ্ম সমাজ, আর্য সমাজের কথা পড়লেও কখনো দেওবন্দের নামটুকুনও কোথায় নেওয়া হয় না। অথচ দেওবন্দ আমাদের দেশীয় ইতিহাস, স্বাধীনতার চেতনার সাথে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

এই যে দূর করে রাখা, অনুচ্চারিত করে রাখা- এর মধ্য দিয়েই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক হর্তাকর্তাদের দৈন্যকে বুঝতে হবে। তারা কেন তা করেন, কী জন্য তাদের এই শত্রুতা?

গত ৩০শে মে ছিল দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সেই বিপ্লবের ব্যর্থ সন্তান হলেও আমরা সবটুকুন দিয়ে কৃতজ্ঞ এই প্রতিষ্ঠান, এই বিপ্লবের প্রতি।

লেখকঃ আরজু আহমেদ, তরুন গবেষক আলেম৷