দাড়ি: একমাত্র দৃশ্যমান সুন্নত, যা নিয়ে কবরে উপস্থিত হবেন… (১ম পর্ব)

প্রকাশিত: ২:৩১ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

লিখেছেন রুহুল কবীর (অযাচিত লেখক)

এক আপু গল্প করছিলেন— আমার ছোট মেয়েটা এখন ছেলে আর মেয়ে আলাদা করতে শিখে গেছে। একদিন শুনি ও বলছে, “আব্বু ছেলে, আম্মু মেয়ে, দাদু ছেলে, দাদী মেয়ে, চাচ্চু ছেলে, ভাইয়া মেয়ে”। এটা শুনে আমি তো অবাক! ওকে জিজ্ঞাসা করি, “ভাইয়া মেয়ে হলো কীভাবে? ভাইয়াও তো ছেলে!” কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে ও বলে, “কিন্তু আম্মু! ভাইয়ার তো দাড়ি নেই!”

ব্যাপারটা হাস্যকর হলেও, মেয়েটা দাড়ির রেস্পেক্টেই বোঝার চেষ্টা করেছিল, কে ছেলে আর কে মেয়ে। যাইহোক… গল্পটা এমনি বললাম!

আমি দাড়ি রেখেছি দেখে আমার ফ্যামিলি পার্সনদের আপত্তির শেষ নেই। কেউ বলে, “তুই তো অল্প বয়সেই বুড়ো হয়ে গেলি রে!” কেউ বলে, “দাড়ি রাখা তো সুন্নত, এত অল্প বয়সে না রাখলেই বা কী হত? বয়সকালে না হয় রাখতি!” আমার আম্মু তো বলেই দিয়েছে, “দেখিস তোর কপালে কোনো সুন্দরী বউ জুটবে না”৷ আমি শুধু শুনি, আর হাসি!

দাড়ি রাখাটাকে অনেকে প্রগতির অন্তরায় মনে করেন। অনেকের কাছে এটা আনস্মার্টনেস। অনেকে আবার দাড়ি রাখেন ঠিকই, তবে ফ্রেঞ্চ কাট কিংবা চারিপাশ ছিলে শুধু থুতনির গোড়ায় এট্টুখানি৷ কেউ আবার আলাদীনের জ্বীনের মত কাটিং দেন! সেটাকে অবশ্য কেউ প্রগতির অন্তরায় মনে করেন না। কেবল হুজুর-বেশী দাড়ি রাখলেই যত সমস্যা।

হুট করে দ্বীনের ব্যাপারে বুঝপ্রাপ্ত হয়ে দাড়ি-টুপি, সুন্নতি লেবাস ধরলে অনেকেই তা বক্রদৃষ্টিতে দেখেন। কেউ কেউ সন্দেহের দৃষ্টিতেও দেখেন। দাড়ি-টুপির প্রতি ফোবিয়া সৃষ্টির ব্যাপারটা একদিনে হয়নি, দীর্ঘদিন ধরে এর প্রক্রিয়াকরণ চলেছে। যাইহোক, এ নিয়ে আরেকদিন কথা বলা যাবে।

যারা মনে করেন— দাড়ি রাখা কেবলই সুন্নত, যুবক বয়সে না রাখলেও চলবে, সামান্য একটা সুন্নত ছেড়ে দিলে এমন কোনো গুণাহ হবে না; বয়সকালে রেখে দিব ইন-শা-আল্লাহ।

তাদেরকে বলি— দাড়ি রাখা কেবলই সুন্নত নয়। দাড়ি রাখা সুন্নত এবং ওয়াজিব। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়ি রেখেছেন, তাই দাড়ি রাখা সুন্নত; আর দাড়ি রাখতে তাগিদ দিয়েছেন, তাই দাড়ি রাখা ওয়াজিব। দাড়ি কেটে ফেলা কবীরা গুণাহ, এবং তা অগ্নিপূজক বা মুশরিকদের অনুসরণ সমতূল্য!

হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে পারস্য সম্রাটের দুজন দূত দেখা করতে এল। তাদের গোফ ছিল বড়, দাড়ি কামানো। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরক্তির সাথে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের এরকম করতে কে বলেছে?”। জবাব এলো, আমাদের রব্ব বলেছেন, মানে পারস্য সম্রাট কিসরা। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আর আমার রব্ব বলেছেন, আমি যেন গোফ ছোট রাখি এবং দাড়ি লম্বা করি”। [১]

আল্লাহ এখানে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সরাসরি আদেশ দিয়েছেন। আর, আল্লাহ এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সরাসরি আদেশ দ্বারা যে হুকুম সাব্যস্ত হয়, তা ওয়াজিব হিসেবে পরিগণিত হয়। [২]

একজন মুসলিম হিসেবে মিনিমাম এক-মুষ্ঠি পরিমাণ দাড়ি রাখা আপনার অবশ্য কর্তব্য। দাড়ি এর চেয়ে ছোট করা হারাম, এতে কবীরা গুণাহ হয়। [৩]

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা মুশরিকদের বিরোধীতা করো, গোঁফ কাটো এবং দাড়ি লম্বা করো। [৪]

এই হাদীসের আলোকে বলা যায়, গোঁফ বড় করা এবং দাঁড়ি কামিয়ে ফেলা মুশরিকদের বৈশিষ্ট্য; এবং মুসলিমদেরকে এর বিরোধিতা করে উল্টো কাজটা করতে বলা হয়েছে।

সুতরাং, যারা মনে করেন— দাড়ি রাখা কেবলই সুন্নত, না রাখলেও চলে, শুধু একটা সুন্নতই তো মানলাম না, এতে আর এমন কী গুণাহ হবে; আপনাদের এই মনে করাটা যথার্থ নয়।

শুধু এতটুকুই না, আরও আছে! ধরেন আপনি দিন ও রাতের কিছু সময় নামাজ-রোজা কিংবা নফল ‘ইবাদাত’ করেন। বাকি সময়টা অন্যান্য কাজে কিংবা ঘুমে কাটান। এইযে, যে সময়টা ইবাদাতের মধ্যে থাকছেন না, দাড়ি রাখলে এই সময়টাতেও সাওয়াব লিখিত হতে থাকে আপনার আমলনামায়। মানে আপনি যখন খান, ঘুমান কিংবা অবসর কাটান, তখনও আপনি কন্টিনিউয়াসলি সাওয়াব পেতে থাকেন।

আবার, আপনি যদি কোনো অশ্লীল ছবি দেখেন, তাহলে ততক্ষণই আপনার গুণাহ হবে যতক্ষণ আপনি তা দেখবেন। যখনই তা দেখা বন্ধ করবেন, তখনই গুণাহ লেখা বন্ধ হয়ে যাবে। আবার, আপনি যদি কাউকে গালি দেন, তাহলে যতক্ষণ গালি দিতে থাকবেন ততক্ষণই গুণাহ লিখিত হতে থাকবে। গালি দেওয়া বন্ধ করা মাত্রই গুণাহ লেখা বন্ধ হয়ে যাবে।

কিন্তু আপনি যদি দাড়ি কেটে ফেলেন, তাহলে শুধু দাড়ি কাটার জন্যই না, বরং যতদিন না আপনার দাড়ি একমুষ্টি পরিমান বড় হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত আপনার কন্টিনিউয়াসলি গুণাহ হতেই থাকে। আপনি খান, ঘুমান, কাজ করেন, অবসর কাটান, যাই করেন না কেন, কেটে ফেলা দাড়ি একমুষ্টি পরিমাণ না হওয়া পর্যন্ত গুণাহ হতেই থাকে, হতেই থাকে। মানে সোজা কথা— আপনি কোনো গুণাহের কাজে লিপ্ত নেই, তবুও আপনার গুণাহ হয়েই চলেছে, অনবরত! হ্যাঁ, এটাও গুণাহে জারিয়া। [৫]……….(২য় পর্বে সমাপ্য)

  •  রেফারেন্সঃ
  • ১) আল গাযালির ফিক্বহুস সিরাহ, পৃষ্টা-৩৯৫ এবং আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/৪৫৯-৪৬০৷ আল আলবানি (রহ.) একে হাসান বলেছেন।
  • ২) নূরানী চেহারাঃ দাড়ির তাত্বিক বিশ্লেষণ; মুফতি ইমরান বিন ইলিয়াস, পৃষ্ঠা-৫৬। এবং হস্তক্ষেপমুক্ত পূর্ণ দাড়ি রাখা ওয়াজিব, শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.), তাহক্বীকঃ শায়খ আল্লামা আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায রহ., পৃষ্ঠা ২১
  • ৩) ২ নং রেফারেন্সের ৩য় অধ্যায়, পৃষ্ঠা ৫৬-৫৮
  • ৪) বুখারী শরীফ, ২/৮৭৫; (অনুরূপ হাদীস, মুসলীম শরীফ, ১/১২৯)
  • ৫) ২ নং রেফারেন্সের পৃষ্ঠা ১৫
  • * বিশেষ কৃতজ্ঞতা— ডাঃ শামসুল আরেফীন; “ডাবল স্ট্যান্ডার্ড”