দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে টেস্টের পরিমান সবচেয়ে কম

প্রকাশিত: ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৬, ২০২০

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম করোনা আক্রান্তের পরীক্ষা হচ্ছে। দেশে পরীক্ষার হার মাত্র ০.২৯ শতাংশ। যা সারা বিশ্বে ১৪৯ তম। গতকাল সোমবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। ভার্চুয়াল এই সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৬০টি ল্যাবে প্রায় ৮৫টির মতো পিসিআর
মেশিন দিয়ে প্রায় ২৪ হাজার নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। কিন ্তুসর্বশেষ ১৪ দিনে গড়ে ১৩.৬ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জনবল সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে নমুনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং ভুল প্রতিবেদন আসছে।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৭১ শতাংশ হাসপাতালে নিম্নমানের নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যবহারের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যহত হচ্ছে।
এছাড়া দেশের ৮৬ শতাংশ নার্সের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক কোন প্রশিক্ষণ নেই বলে জানিয়েছে টিআইবি।
গবেষণাটির তথ্য সংগ্রহ করা হয় ৪৩টি জেলা থেকে। প্রতিবেদনে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে নানা ঘাটতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন প্রোগ্রাম ম্যানেজার মনজুর ই খোদা। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশ থেকে প্রবেশের পথগুলো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হওয়ায় ২১শে জানুয়ারি থেকে ১৭ই মার্চ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৬ লাখ ২৫ হাজার ৭৪৩ জন যাত্রীর আগমন ঘটে। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা হলেও সকল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও স্থলবন্দরে হ্যান্ড হেল্ড স্ক্যানার দিয়ে যাত্রীদের স্ক্রিনিং করা হয়। যার মাধ্যমে শুধু শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা যায়। ফলে করোনা ভাইরাস আক্রান্তকে কার্যকরভাবে পৃথক করা সম্ভব হয় নি।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে সতর্ক করা হলেও সংক্রমণ শুরু হওয়ার দেড়মাস পরে ১৮ই এপ্রিল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে নিয়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। সকল ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক গণজমায়েত নিষিদ্ধ করা হলেও খালেদা জিয়ার জামিন উপলক্ষে দলীয় নেতা-কর্মীদের জমায়েত এবং মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আতশবাজি পোড়ানো ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সংকটকালেই ঢাকা ১০ আসনের নির্বাচনসহ তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৫শে মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে মাত্র একটি পরীক্ষাগারের মাধ্যমে পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছিল। এই সময়ে নির্ধারিত হটলাইনে প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ পরীক্ষার জন্য যোগাযোগ করে। পরীক্ষা করা হয় মাত্র ৭৯৪টি। ঢাকার বাইরে পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয় ২৫শে মার্চের পর। ততদিনে সীমিত আকারে কমিউনিটি পর্যায়ে সংক্রমণ বিস্তার শুরু হয়ে যায়। প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সকল প্রস্তুতির দাবি করা হলেও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত হাসপাতালগুলোর প্রায় ৪৪ শতাংশ সংক্রমণের তৃতীয় পর্যায়ে গিয়ে প্রস্তুতি শুরু করে। মাত্র ২২ শতাংশ হাসপাতালে সকল স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। বিবিজিএনএস ও এসএনএসআর নামক নার্সদের দুটি সংগঠনের একটি জরিপ অনুসারে, দেশের ৮৬ শতাংশ নার্সেরই সংক্রমণ রোধ ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক (আইপিসি) প্রশিক্ষণ নেই।
সরকার ঘোষিত প্রণোদনার ১৯টি প্যাকেজে মোট ১ লাখ তিন হাজার ১১৭ কোটি টাকার ঘোষণা (জিডিপির ৩.৩%) করলেও এটি ব্যবসায়ী-বান্ধব, যেখানে সুদ কমিয়ে ঋণ সহায়তা বাড়িয়ে মুদ্রা সম্প্রসারণ নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মহীন পাঁচ কোটি দিনমজুর ও শ্রমিক, অস্থায়ী কর্মীর জন্য এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এছাড়া মাত্র ১০ শতাংশ বোরো ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়েছে। গবেষণাভুক্ত এলাকার তথ্যমতে ৮২ শতাংশ চাহিদার অনুপাতে অর্ধেক বা তারও কম পরিমাণে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির সভা নিয়মিত হলেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে (শপিং মল/ গার্মেন্টস খোলা, লকডাউন প্রত্যাহার করা) কমিটির পরামর্শ উপেক্ষিত থাকা। অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমলাদের ওপর নির্ভরতা লক্ষ করা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আইইডিসিআর’র হটলাইনে ১৪ই জুন পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ১০ লাখ ফোন কল আসলেও পরীক্ষা হয় মাত্র পাঁচ লাখ। নানা ভোগান্তির ফলে ৫৭ শতাংশ হাসপাতাল প্রয়োজনের চেয়ে অর্ধেক সংখ্যক পরীক্ষা করাতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া করোনা পরীক্ষার ফল পেতে ৮ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত বিলম্ব হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে ৭৪.৫ শতাংশ দক্ষ জনবলের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ঘাটতি ৫১.১, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ৫৯.৬ ও নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী ৫১.১ শাতংশ ঘাটতি ফুটে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে সরকারি হাসপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে ৩৫০০ আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর থাকার কথা। কিন্তু ২৫শে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ছিল মাত্র ৪৩২টি। ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ৪৭টি জেলায় কোনো আইসিইউ সুবিধা ছিল না। করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য ২৫শে মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে মোট আইসিইউ ছিল মাত্র ২৯টি, ১লা জুন পর্যন্ত ছিল মাত্র ৩৯৯টি।
২৬শে মার্চ পর্যন্ত শুধু রাজধানীর নির্ধারিত ৫টি হাসপাতালে ছিল ২৯টি ভেন্টিলেটর। যদিও সরকারের দাবি অনুযায়ী এর সংখ্যা ৫০০টি। বর্তমানে সারা দেশে মোট ভেন্টিলেটরের সংখ্যা ১,২৬৭টি। এর মধ্যে মাত্র ১৯০টি করোনার চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। যার মধ্যে ঢাকায় ৭৯টি এবং অন্যান্য জেলা শহরে ১১১টি। বাংলাদেশে মাত্র ২১টি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা আছে। কোভিড নির্ধারিত হাসপাতালসমূহে ভেন্টিলেটর মেশিন, পেশেন্ট মনিটর, পালস অক্সিমিটার, এবিজি মেশিন উইথ গ্লুকোজ অ্যান্ড ল্যাকটেট, ডিফেব্রিলেটর, ইসিজি মেশিন, পোর্টেবল ভেন্টিলেটর, এসি, ডিহিউমিডিফায়ার, অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিতে অক্সিজেন সিলিন্ডার ইত্যাদির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
করোনার প্রভাবে ৫৩ শতাংশ সাধারণ চিকিৎসা সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে। যার মধ্যে ৭১ শতাংশ হাসপাতাল জানিয়েছে নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহের কারণে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী সেবা দেয়া থেকে বিরত থাকছে বা আক্রান্ত হচ্ছে।
১১ই জুন কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) সারাদেশে প্রায় ২৩ লাখ পিপিই বিতরণ করেছে বলে দাবি করেছে। এই দাবি অনুযায়ী প্রত্যেক স্বাস্থ্যকর্মীর (প্রায় ৭৫ হাজার) কমপক্ষে ৩০ সেট সুরক্ষা সামগ্রী পাওয়ার কথা। তবে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী এখনো একটিও পায়নি। অধিকাংশ হাসপাতালের ৬৪.৪ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মীর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত মান অনুযায়ী সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ না করার অভিযোগও এসেছে।
সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার বিষয়ে বলা হয়, একদিকে আইসোলেশন মানতে বলা হয়েছে আবার অন্যদিকে গণপরিবহণ, কল-কারখানা, শপিং মল খুলে দেওয়া হয়েছে। ছুটি ঘোষণার পর পোষাক শ্রমিকদের ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাওয়া, গার্মেন্টস খুলে তাদের ঢাকায় ফেরানো, আবার গার্মেন্টস বন্ধ ঘোষণা এবং তাদের ফেরত পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ২৬শে এপ্রিল পুনরায় গার্মেন্টস ও উপাসনালয়, ১০ই মে হতে দোকান-পাট, শপিং মল সীমিত পরিসরে খুলে দেওয়া, ঈদের আগে ব্যক্তিগত পরিবহণে আন্তঃ জেলা চলাচল উন্মুক্ত করার মাধ্যমে সার্বিকভাবে লকডাউন পরিস্থিতি অকার্যকর হয়ে পড়ে। ত্রাণ বিতরণে বেশিরভাগ জেলায় (৯৮%) সামাজিক দূরত্ব মানা হয় নি।
করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, যোগাযোগ, বাণিজ্য, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রত্যাশিত হলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি লক্ষ করা যায়। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন করোনা চিকিৎসায় তাদের প্রস্তুতির দাবি করলেও এই বিপর্যয়ের সময়ে অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর আওতায় মোট ৬৭টি মামলা দায়ের করা হয়। এই সময়কালে ৩৭ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে কার্টুনিস্ট, সাংবাদিকসহ ৭৯টি ঘটনায় মোট ৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা না হলে, বা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা মৃত ব্যক্তিদের তথ্য কর্তৃপক্ষকে না জানালে তা সরকারি হিসাবে যোগ হচ্ছে না। বেসরকারি পরীক্ষাগার করোনা পরীক্ষায় সরকার-নির্ধারিত ফি অপেক্ষা অতিরিক্ত ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা আদায় করছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তিরা ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকায় এই সিরিয়াল কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
এই সময়ে করোনার কারণে সৃষ্ট দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে পাঁচ থেকে ১০ গুণ বাড়তি মূল্যে মানহীন সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় করে একটি চক্র লাভবান হচ্ছে। একটি হাসপাতালে ব্যবহৃত পিসিআর মেশিন থাকা সত্ত্বেও নতুন পিসিআর মেশিনের ক্রয়ের চাহিদা প্রেরণ করা হয়।
১০ই জুন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ত্রাণ বিতরণে ২১৮টি দুর্নীতির ঘটনায় মোট ৪,৫৯,৮৭০ কেজি ত্রাণের চাল উদ্ধার করা হয়েছে। এসব দুর্নীতির ঘটনায় ৮৯ জন প্রতিনিধিকে (ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, জেলা পরিষদ সদস্য, পৌর কাউন্সিলর ইত্যাদি) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
চীন দেশে করোনার প্রাদুর্ভাবের পর তিনমাস সময় হাতে পেয়েও করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ না করায় এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে দেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে।
প্রতিবেদন উপস্থাপন শেষে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতীয় সংকট এ ধরণের গুরুত্বপূর্ন পরিস্থিতিতে অনিয়ম, দুর্নীতি রাজনৈতিক প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও তিনি সুশাসনের ঘাটতি ও অপ্রতুলতা বাজেট বরাদ্দের কারণে স্বাস্ত্য খাতের দুর্বলতা করোনাকালীন এই সঙ্কটে উন্মোচিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।