ত্রিপুরাদের ইতিহাস এবং বিচিত্র জীবনাচার (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ১১:০৭ অপরাহ্ণ, জুন ৩, ২০২০

 নাম ও পরিচয়ঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ত্রিপুরা উপজাতি। এখানে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এই তিনটি পার্বত্য জেলায় ত্রিপুরাদের বসবাস রয়েছে। তবে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলাতেই অধিকাংশ ত্রিপুরাদের বসবাস। এছাড়াও বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল সিলেট, কুমিল্লা ও ফেনী জেলায় কিছুসংখ্যক ত্রিপুরা বসবাস করে। নাম ও নৃ-তাত্ত্বিক পরিচিতি ত্রিপুরাদের নাম সম্বন্ধে সুরেন্দ্র লাল লিখেছেন যে, “তিপারাগণ অন্যান্য জনগােষ্ঠীর নিকট ত্রিপুরা হিসেবে পরিচিত হলেও তারা নিজেদেরকে তিপারা আবার কেউ বা তিপ্রা বলে থাকেন।” পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমারা ত্রিপুরাদেরকে ‘তিবিরা’, ‘মারমারা তাদেরকে ‘ম্রুং’, লুসেইরা তাদেরকে ‘তুইকুক’ এবং পাংখুয়ারা তাদেরকে ‘ভাই’ বলে। এ থেকে ত্রিপুরারা যে এখানকার অন্যান্য উপজাতিদের কাছে সুদূর অতীত থেকে পরিচিত ছিলো তা সহজেই বোঝা যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে ত্রিপুরাদের সবচেয়ে বেশি বসবাস ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ৷ ত্রিপুরাদের দল ও গোষ্ঠী ত্রিপুরারা তাদের সমাজে দলকে ‘দফা’ বলে। ত্রিপুরা সমাজে ৩৬টি দফা আছে বলে জানা যায়। তবে সব দল পার্বত্য চট্টগ্রামে নেই। এই ৩৬টি দলের মধ্যে ১৬টি দল বাংলাদেশে বসবাস করছে। অবশিষ্ট দলগুলো ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাস করে৷

সুরেন্দ্র বরেন ত্রিপুরা -এর মতে এখানে ১৭টি দফা রয়েছে এবং এগুলাের নাম হলো যথাক্রমে:- (১) নাইতং, (২) গাবিং, (৩) দেইদাক, (৪) মইচিং, (৫) কেওয়া, (৬) কেমা, (৭) আনক, (৮) টংবাই, (৯) ফাতুং, (১০) মংবাই, (১১) গর্জৎ, (১২) গাইগ্রা, (১৩) আসালং, (১৪) মরাচিং, (১৫) খালি, (১৬) রিয়াং এবং (১৭) উসুই। উল্লেখ্য যে, কয়েকটি গােষ্ঠী মিলে এক একটি ‘দফা’ গঠিত হয়। যেমন নাইতং দফার মধ্যে ৮টি উপদফা বা গােষ্ঠীর নাম পাওয়া যায়। এগুলাে হলাে (১) মাইপালা, (২) লিগা, (৩) কোয়াইতিয়া, (৪) সেংক্রো, (৫) কাপিং, (৬) নাইতং, (৭) মাহিং এবং (৮) দৈচিং। এগুলাের মধ্যে মাইপালা উপদলটি আবার ৫টি উপগােষ্ঠীতে বিভক্ত। যেমন:- (১) মুরুংচুকুং, (২) মাইমিলাক, (৩) দবদবি, (৪) কেলাবাড়িয়া ও (৫) সিকাম। এভাবে অন্যান্য দফাগুলােতেও বিভিন্ন উপদফা বা গােষ্ঠী রয়েছে।

 

পারিবারিক কাঠামাে ও বংশ গণনা রীতি

পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরারা পিতৃপ্রধান পরিবারের লােক। পরিবারে পিতার স্থান হলাে সর্বোচ্চে। তৎপরে মাতা ও জ্যেষ্ঠ পুত্রের স্থান হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে একমাত্র ত্রিপুরা সমাজেই বেশ কয়েকটি গােত্রে দ্বিধারায় বংশগণনা করার রীতি প্রচলিত আছে। এই পদ্ধতিতে একজন পুত্র তার পিতার দফা ও গােষ্ঠীর অধিকারী হলেও একজন কন্যা তার মায়ের দফা ও গােষ্ঠীর অধিকারী হয়ে থাকে। এ বিষয়ে মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা লিখেছেন যে, “গােত্রে ছেলেরা পিতার বংশ এবং মেয়েরা মাতার বংশ অনুসরণ করে, ছেলেরা পায় পিতার সম্পত্তি আর মেয়েরা পায় মাতার সম্পত্তি।”

 

সামাজিক কাঠামাে

অতীতে ‘নারাণ’ পদবীধারী ত্রিপুরা সেনাপতিরা ত্রিপুরাদেরকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে রিয়াংদের মধ্যে ‘রায়-কাচাক নেতৃত্বাধীন বিশেষ একটি সমাজব্যবস্থা ছিল। রিয়াং সমাজে প্রধান ছিলেন রায়। তিনি তাঁর মন্ত্রী ‘কাচাক’-এর সহযােগিতায় কাজ করতেন। প্রকৃতপক্ষে কাচাকই বিভিন্ন কার্যাদিতে নেতৃত্ব দিতেন। রায়, চাপিয়াখা এবং চাপিয়া এই তিনজনে মিলে একটি পরিষদ গঠিত হতাে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯০০ খ্রিসটাব্দের পরে মৌজার প্রধান হেডম্যানরা হওয়ায় তাঁরাই চীফের অধঃস্তন পদে থেকে মৌজার বাসিন্দাদেরকে গ্রাম্য প্রধানদের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বর্তমানে ত্রিপুরাদের গ্রামে তাদের গ্রাম্য প্রধান হিসেবে তারা যে ব্যক্তিকে মনােনীত করে তাঁকে ‘রােয়াজা’ বলে। গ্রামবাসীদের কর্তৃক নির্বাচিত ধাবেং ও মুরচুই’ নামক দুইজন ব্যক্তি রােয়াজাকে তাঁর কাজকর্মে সাহায্য করেন। রােয়াজাই গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে গ্রামবাসীদেরকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।

 

ধর্ম, দেবদেবী ও পূজাপার্বণ

পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরারা সনাতন ধর্মের অনুসারী। এ কারণে বৃহত্তর অর্থে অনেকে তাদেরকে হিন্দুধর্মাবলম্বী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। ত্রিপুরারা দুর্গাপূজা উৎসবে যােগদান করে থাকে। তবে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় বসবাসকারী ত্রিপুরারা কিছুকাল পূর্বে থেকে খ্রিস্টান ধর্মের অনুসরণ করছে ৷ ত্রিপুরারা সনাতন ধর্মের অনুসারী হলেও তাদের মধ্যে বেশ কিছু নিজস্ব দেবদেবীও রয়েছে। ত্রিপুরাদের কয়েকজন দেবতার নাম হলাে (১) মাতাই কতর, (২) লাম, (৩) প্রা, (৪) সংগরংমা, (৫) তুইমা, (৬) মাইলুংমা, (৭) খুঁইজংমা, (৮) বুড়ামা, (৯) বানিরাও, (১০) সাতবােন বুডিরক, (১১) কারায়া, (১২) গরায়া ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে সুকুন্দ্রায়-বুকুন্দ্রায়, বরমালী-বিখিত্রায়, যমদুগা, দুদুগা ইত্যাদি। শেষোক্ত দেবতাদের বিভিন্ন রােগব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভের জন্য পূজা দেয়া হয়। যে সব ওঝা পূজা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন তাঁদেরকে ‘অচাই’ বলা হয়।

পূজায় তাদের বিভিন্ন জনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রাণী বলি দেয়া হয়। যেমন-১, বরমালীর জন্য একটি ছাগল, ২, বিখিত্রায়ের জন্য একটি মুরগী, ৩. মােআনীর জন্য একটি শূকর, ৪. রােখাজয়ের জন্য একটি ককুর বলি দেয়া হয়। এ বিষয়ে মিঃ সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা তাঁর লিখিত ‘ত্রিপুরা পূজা পার্বণ’ গ্রন্থের ১৬ ও ১৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “তিপারাদের অনেকগুলাে অপদেবতার মধ্যে কুকুরভােজী অপদেবতা আছে। এই বিশেষ দেবতার উদ্দেশ্যে কুকুর বলি দেয়া হয় ৷ এই কুকুর উৎসর্গ করার সময় দা দিয়ে কাটা হয় না বা জবাই করা হয় না বরং একটি মুণ্ডর দিয়ে কুকুরটির মাথায় আঘাত করে কুকুরটিকে হত্যা করা হয়।”

 

কের পূজা

গ্রামের সকল লােকের সার্বিক মঙ্গলের জন্য কের পূজা করা হয়। এতে বহু সংখ্যক দেবদেবীর উদ্দেশ্যে একত্রে পূজা করা হয়। এই পূজায় পশুপাখি উৎসর্গের ওঝাকে পূজার বেদীর সম্মুখে নাচতে হয় এবং পূজায় যে সব পশুপাখি বলি দেওয়া হয় সেগুলাের মাংস পূজাস্থানে রান্না করে খাওয়া হয়। এটি গ্রামবাসীদের জন্য একটি সার্বজনীন মঙ্গলকামী পূজা হিসেবে বিবেচনা করা হয় ৷

 

গৃহ ও বাসস্থান

ত্রিপুরারা সাধারণত চাকমা ও মারমাদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত উচু পাহাড়ের উপর তাদের গ্রামগুলাে নির্মাণ করে। তারা মাটির উপর গাছের খুঁটি পুঁতে প্রথমে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। তারপর তারা তার উপর শােবার ঘর তৈরি করে। ঐ প্ল্যাটফর্মে উঠার জন্য সিড়ি থাকে। পাহাড়ের উপর ত্রিপুরাদের গ্রামগুলাে নির্মিত হওয়ায় এগুলাে নদী থেকে দূরে থাকে, তাই তারা পানি এনে ঘরে জমা করে রাখে ৷ সাধারণত ত্রিপুরারা বেশ দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের ঘর তৈরি করে, তাই গ্রামে তাদের বাড়িগুলােকে নানা দিকে ছড়ানাে অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়।

 

পােশাক-পরিচ্ছদ ও অলংকার

ত্রিপুরাদের বিভিন্ন “দফা’ বা দলের মহিলাদের মধ্যে নানা রঙ ও ডিজাইনের পােশাক দেখতে পাওয়া যায়। তারা মহিলাদের নিম্নাঙ্গে পরণের কাপড়কে ‘রিনাই’ ও বক্ষবন্ধনীকে ‘রিসা’ বলে। পুরুষেরা গ্রামদেশে ধুতি গামছা ইত্যাদি পরে। কেউ কেউ বাড়িতে লুঙ্গি এবং জামাও পরে থাকে। ত্রিপুরা মহিলারা সাধারণত রৌপ্য নির্মিত নানা ধরণের অলংকার এবং ‘নাতং’ নামে একপ্রকার কর্ণদুল পরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাংশের ত্রিপুরারা গলায় প্রচুর পরিমাণে পুঁতির মালা পরে। কিশােরী ও যুবতীরা অনেকে রৌপ্য টাকা দিয়ে প্রস্তুতকৃত একধরনের মালা পরে। তবে অফিসে যাওয়ার সময় পুরুষেরা শার্ট-প্যান্ট এবং মহিলারা শাড়ী-ব্লাউজ পরে।