ত্রিপুরাদের ইতিহাস এবং বিচিত্র জীবনাচার (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

আমজাদ হোসাইন

প্রকাশিত: ৮:৫৯ অপরাহ্ণ, জুন ৪, ২০২০

জন্ম ও নামকরণ

শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাকে উষ্ণজলে স্নান করানাের পর মুখে মধু দেওয়া হয়। ডলু বাঁশের ধারাল একটি টুকরা দিয়ে শিশুর নাভীটি কেটে সুতা দিয়ে বাধা হয়। আর সেটি যাতে তাড়াতাড়ি শুকায় সেজন্য সেটির মুখে মেটো সিদুর বা কাপড় পোড়া ছাই লাগিয়ে দেওয়া হয়। ‘দিব’ নামক একটি বাঁশের টুকরা শিশুটির জন্মস্থানে পুঁতে ‘পথিলিমা’ নামক একজন দেবতার উদ্দেশ্যে পূজা দেওয়া হয়। শিশুটির নাভী শুকিয়ে গেলে একদিন ওঝা ডেকে বাড়ির লােকেরা ঘিলা-কজই ও সােনারূপার পানি দিয়ে শিরে ও দেহে ছিটিয়ে পবিত্র হয়। পবিত্র হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রসূতীকে অশুচী মনে করা হয়। ঐ সময় পর্যন্ত তাকে রান্নাবান্না করার উপকরণাদি স্পর্শ করতে দেওয়া হয় না। অতঃপর একদিন সুবিধামতো শিশুটির মাতা-পিতা গ্রামের যে কোন রাস্তার দুমাথায় গিয়ে একটি ডিম দিয়ে ‘লাম্প্রা-মাতাই’ দেবতার উদ্দেশ্যে পূজা দিয়ে আসে।

তারা নদীতে গিয়ে জলদেবী গংগাকেও একটি মােরগ বলি দেয় এবং শিশুটির জন্মলগ্নে সাহায্যকারী ব্যক্তিদেরকে একটি ভােজে আপ্যায়িত করে। খানাপিনার পর শিশুটির নাম রাখা হয় এবং একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুটির মা শিশুটিকে ধাইয়ের কোলে তুলে দেয়। তারপর রীতি অনুযায়ী শিশুটির মা, ধাইয়ের হাতে এক বােতল মদ, নতুন একখানা কাপড় ও নগদ পাঁচ টাকা দিয়ে পুনরায শিশুটিকে কিনে নেয় এবং ধাইকে বলে, “আপনার পারিশ্রমিক বুঝে পেয়েছেন কি?” ধাই ঐ সময়, “হ্যাঁ পেয়েছি” বলে শিশুটিকে মায়ের কোলে তুলে দেয়।

 

বিবাহ অনুষ্ঠান

সাধারণত ছেলের অভিভাবকেরাই কনে পছন্দ করেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে ছেলেমেয়েরাই পরস্পরকে জীবনসংগী হিসেবে বেছে নেয়, বিয়ের দিনতারিখ নির্দিষ্ট হয়ে গেলে শুভদিনে বরযাত্রীরা বরের বাড়িতে ‘কাথারক মাতাই’ দেবতার উদ্দেশ্যে আয়ােজিত পূজার প্রণাম নিবেদনের পর একসঙ্গে রওনা হয়। বরযাত্রীদলে একজন সধবা মহিলা সহ দু’জন বালক ও দু’জন বালিকা থাকে। কনের বাড়িতে পৌঁছলে তাদেরকে সাদরে আপ্যায়ন করা হয়। এদিন কনের বাড়ির সদর দরজার দু’পাশে বপ খণ্ড পুঁতে ঐগুলাের মুখে খাঁচার মত বুনা হয় এবং তাতে লাউয়ের খােলে পানি রাখা হয়। আর লাউয়ের গলায় মাড়হীন সুতা পেঁচানাে থাকে। বরযাত্রীরা কনের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার পরে কনেকে সাজিয়ে বাড়ি রওনা হয়।

বরযাত্রীরা বউ নিয়ে বাড়িতে পৌছালে সেখানে তাদেরকে যথারীতি ভেতরে নেওয়া হয়। এরপর যথাসময়ে বিবাহ অনুষ্ঠান শুরু হয়। বিবাহ অনুষ্ঠানে বর ও কনে পাশাপাশি বসে। বরের পাশে পূর্বোক্ত দু’জন বালক এবং কনের পাশেও দু’জন বালিকা বসে। তাদের জন্য থালায় খাবার আনা হয়, যা তারা অনুষ্ঠানের পর খায়। অনুষ্ঠানে এক জোড়া কলাপাতায় দুমুঠো ভাত, দু’টি মোরগ ও মুরগীর রান এবং দু’টি চোংগায় মদ থাকে। একটি থালায় তুলা এবং চাউল রাখা হয়, যা দিয়ে পরে তাদের আশীর্বাদ করা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে ওঝা একটি পাত্র থেকে তুলা ও চাউলের উপর কয়েক ফোটা পানি ছিটিয়ে ‘সুকুন্দ্রাই-বুকুন্দ্রাই’ দেবতার উদ্দেশ্যে মন্ত্র উচ্চারণ করে। এরপর সে তুলাসহ চাউলগুলাে বর ও কনের মাথার উপর সাতবার ঘুরিয়ে পিছনে ফেলে দেয়। সে তাদের জন্য দীর্ঘজীবন কামনা করে এবং একটি সাদা কাপড় দিয়ে দুজনের কোমর জড়িয়ে জোড় বেঁধে দেয়। এরপর উপস্থিত বুড়ােবুড়িরা তুলা ও চাউল ছিটিয়ে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করে।

 

বৈসু উৎসব

ত্রিপুরারা বাংলা বর্ষের শেষ দুই দিন ও নববর্ষের প্রথম দিনটি নিয়ে মােট তিন দিন তাদের ‘বৈসু উৎসব’ উদযাপন করে। বর্ষ শেষের মূল বৈসু দিনটিকে ‘বিসুমা’, তার পূর্বের দিনটিকে ‘হারি বৈসু’ এবং নববর্ষের প্রথম দিনটিকে ‘বিসিকাতাল’ বলা হয়। হারিবিসু দিনে ভােরে গবাদি পশুগুলােকে গােসল করিয়ে এগুলাের গলায় ফুলের মালা পরানাে হয়। কেউ কেউ মন্দিরে, নদীর পাড়ে, প্রভৃতি পবিত্র স্থানে ফুল দেয় ও প্রদীপ জ্বালায়; ‘বিসুমা’ দিনে ‘কুচাই’ পানি দিয়ে ঘর-বাড়ির পবিত্রতা রক্ষা করে।

এ দিনে প্রত্যেকের বাড়িতে সামর্থ্য অনুযায়ী পিঠা, মিষ্টান্ন, পাঁচন, প্রভৃতি মুখরােচক খাবারের আয়ােজন করা হয়। ঐ দিনে বিশেষ কোন বাধা নিষেধ না থাকায় সবাই মদ্যপানে অংশগ্রহণ করতে পারে ৷ গ্রামবাসীরা গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে ও পাঁচন খেয়ে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে ৷ কিশােরীরা কানে ফুল, গলায় টাকার ছড়া, পুঁতির মালা, বাহুতে রূপাের খালসী, হাতে ‘কুচিবালা’ পরে অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়। বিসিকাতাল বা নববর্ষের প্রথম দিনে যুবক-যুবতী, কিশাের-কিশােরী, নব দম্পতিরা এদিনে কলসীপূর্ণ পানি ও ফুল দিয়ে গুরুজনদের গােসল করায় এবং আশীর্বাদ নেয় ৷ ত্রিপুরা উপজাতির বৈসু উৎসবের অন্যতম প্রধান ও আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান হলাে ‘গরয়া নৃত্য’৷ উল্লেখ্য যে, ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী ‘গরয়া নৃত্য’ একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও উপভােগ্য নৃত্য ৷

 

অন্তেষ্টি ক্রিয়া

ত্রিপুরা সমাজে কোন লােক মারা গেলে তার মরদেহ উঠানে নামিয়ে স্নান করানাের পর তাকে নতুন কাপড় পরানাে হয়। রাতে তার শিয়রে বাড়ির লােকেরা মাটির প্রদীপ জ্বেলে দেয়। তার জন্য একটি মুরগির বাচ্চা কেটে রান্না করে ভাত-তরকারির সাথে কলাপাতার উপর তাকে ঐগুলাে দেওয়া হয়। পরদিন মৃতদেহকে “চথু’ নামে একজাতীয় বাঁশের বাহনে তুলে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। ঐ বাহনের সাথে বাশের একটি ছাতা ও দু’গ্রন্থিযুক্ত একটি বাঁশের চোংগাও থাকে। মৃতের জন্য একটি ঝুড়িতে করে দা, কাস্তে, কলসী, কত্তি (এক জাতীয় জলের পাত্র) ইত্যাদি দেওয়া হয়। মৃত স্ত্রীলােক হলে সেক্ষেত্রে তার জন্য তাঁতের সরঞ্জমাদিও সঙ্গে দেওয়া হয় ৷ মৃতলােকটি পুরুষ হলে শ্মশানে চিতা প্রস্তুতের বেলায় পাঁচন্তর লাকড়ি এবং স্ত্রীলােক হলে সাত স্তর লাকড়ি সাজানাে হয়ে থাকে।

শববহনকারীরা শ্মশানে পৌছে মৃতকে সাতবার শ্মশান প্রদক্ষিণ করানাের পর তাকে প্রণাম জানিয়ে উত্তর দক্ষিণ দিকে লম্বালঘি করে চিতায় তুলে দেয়। রীতি অনুযায়ী মৃতের আত্মীয়েরা পাঁচ টাকা দিয়ে চিতা প্রস্তুতকারকদের কাছে থেকে চিতার লাকড়িগুলাে কিনে নেয়। ওঝা মূতের শিয়রে রাখা পানিপূর্ণ বাঁশের চোংগা নিয়ে মন্ত্ৰ পড়ে মৃতের আত্মীয়দের হাত ধুয়ে দেয় এবং মৃতের আত্মার সদগতি কামনা করে। এরপর মৃতের আত্মীয়েরা বাম হাতে প্রত্যেকে একগুচ্ছ লাকড়ি নিয়ে তাতে অগ্নি সংযােগ করে। অতঃপর সবাই শ্মশান থেকে বাড়ি ফেরার সময় নদীতে কাপড়-চোপড় সহ স্নান করে বাড়িতে ফিরে যায়। এসময় প্রত্যেক বাড়ির বাইরে অপদেবতা তাড়ানাের জন্য এক একটি পাত্রে আগুন দেওয়া থাকে। শবদাহে অংশগ্রহণকারী লােকেরা নদীতে স্নানের পর বাড়ি উঠার আগে ঐ পাত্রের আগুনে হাত সেঁকে নেয় এবং সােনারূপা ও ঘিলাকুঁচের পানি দিয়ে পবিত্র হয়। মৃতলােকটি কলেরা, বসন্ত ইত্যাদি ছোঁয়াচে ও দুরারােগ্য ব্যাধিতে মারা গেলে তাকে প্রথমে মাটি চাপা দেওয়া হয়। পরে তার হাড়গােড়গুলাে মাটি থেকে তুলে আবার চিতায় পুড়ানাে হয়।

অল্পবয়সী কোন শিশু, বিশেষত যাদের দাঁত উঠেনি এমন শিশু মারা গেলে তাদেরকে খাঁচায় অথবা দোলনায় রেখে গভীর জংগলে নিয়ে গিয়ে গাছের আগায় বেঁধে দেওয়া হয়। তারা হিন্দু রীতি অনুযায়ী ১০দিন পরে মৃতের নামে শ্রাদ্ধ করে এবং গ্রামের লােকজনদেরকে খাবার খাওয়ায়। ঐদিন মৃতের আত্মীয়-স্বজন নদীতীরে গিয়ে পূর্বাহ্নে রক্ষিত চালের গুঁড়ার উপর বিবিধ চিহ্ন খোঁজে। যদি সেখানে শিশুর পদচিহ্ন থাকে তবে মৃত ব্যক্তি পুনরায় মনুষ্যকূলে জন্ম নেবে বলে তারা ধরে নেয়। সেখানে বাম হাতে মৃতের জন্য ভাত তরকারি রেখে আসা হয়। অতঃপর কোন প্রাণী অথবা কীট পতঙ্গ যদি তা খায়, তবে শ্রাদ্ধক্রিয়া সন্তোষজনক বলে ধরে নেওয়া হয়।

সবশেষে মৃতের জন্য ১৩ দিন ধরে অশূচী ব্রত পালনকারী ব্যক্তি (বাড়ির কর্তা ব্যক্তি) ‘খুমপালা’ নামক এক জাতীয় জংলী ফুল গাছের একটি পাতা দু’হাতে ছিড়ে নিয়ে মৃতের উদ্দেশ্যে বলে, “আমি আমার সাধ্যানুযায়ী তােমাকে শেষ খানা এবং তােমার জন্য দান-দক্ষিণা করে দিয়েছি। তুমি আর আমার উপর কোন দাবি করার জন্য আসবে না। আজ হতে এই খুমপালা পাতাটি যেমন দু’টুকরা করে পৃথক করে ফেললাম, সেইভাবে আমিও তােমার সঙ্গে পৃথক হলাম।” এই কথাগুলাে বলে সে পাতাগুলাে পিছন দিকে ছিড়ে ফেলে দিয়ে আসে। পরবর্তীকালে অনেকে মৃতের জন্য সদগতি কামনা করে কোন রাস্তা তৈরি করে দেয় অথবা কোন জনহিতকর কাজ করে দেয়। এই পূণ্যফলে মৃতব্যক্তির আত্মা শান্তি পাবে বলে বিশ্বাস করা হয়।