ঢাকা, শনিবার ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১০ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

জিন সৃষ্টি ও শয়তানের কাহিনী (প্রথম পর্ব)


প্রকাশিত: ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ৬, ২০২০

আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির মতো শুকনা মাটি থেকে আর জিনকে সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াবিহীন অগ্নিশীখা থেকে। সূরা রহমানঃ (১৪-১৬)

তিনি আরো বলেনঃ  ছাঁচে-ঢালা শুকনো ঠনঠনে মাটি থেকে আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং পূর্বে লু-হাওয়ার আগুন থেকে জিন সৃষ্টি করেছি। সূরা হিজরঃ(২৬-২৭)

রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ ফেরেশতাকুলকে নূর থেকে আর জিন জাতিকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে । আর আদম (আ-)কে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই উপাদান দ্বারা, যার বিবরণ তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে। (মুসলিম)

হযরত আদম (আঃ)-কে সৃষ্টির দুই হাজার বছর পূর্বে জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। বেশ কিছু তাফসীর বিশেষজ্ঞ এ ব্যপারে বলেন যে, জিন জাতিকে আদম (আঃ) এর পূর্বেই সৃষ্টি করা হয়ে ছিলো । তাদের পূর্বে পৃথিবীতে হিন ও বিনদের বসবাস ছিলো। এরা জিনদের একটি বিশেষ সম্প্রদায় । আল্লাহ তা’য়ালা জিনদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করলে তারা তাদের অনেককে হত্যা করে আর বাকীদের অন্যত্র নির্বাসনে দেয়। তারপর নিজেরাই সেখানে বসবাস করতে শুরু করে।

সুদ্দী (রঃ) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে ইবনে আব্বাস (রা) ও ইবনে মাসউদ (রা) সাহাবা থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তায়ালা যা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন তা সৃষ্টি করা শেষ হলে আরশে সমাসীন হন। তারপর ইবলীসকে দুনিয়ার ফেরেশতাদের প্রধান নিযুক্ত করেন । ইবলীস যেসকল ফেরেশতাদের সাথে ছিল তাদেরকেও জিন বলা হতো। তাদের জিন নামে ডাকার কারণ হলো-তারা ছিল জাহান্নামের রক্ষী বাহিনী। ইবলীস তার সঙ্গী সাথীদের সাথে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করতো।

হঠাত তার মনে হলো -ফেরেশতাদের উপর আমার শ্রেষ্ঠত্ব আছে বলেই তো আল্লাহ আমাকে এই মর্যাদা দিয়েছেন।

জিনরা যখন পৃথবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে ও রক্তপাত ঘটায় তখন আল্লাহ তায়ালা ইবলীসকে তাদের নিকট প্রেরণ করেন। তার সাথে  ফেরেশতাদের একটি বাহিনী পাঠান। তারা অনেককে হত্যা করে আর বাকীদেরকে  তাড়িয়ে দিয়ে বিভিন্ন দ্বীপে নির্বাসন দেয়।

আল্লাহ তায়ালার অবাধ্যতার আগে ইবলীসের নাম ছিলো আযাযীল । চার ডানাবিশিষ্ট ফেরেশতাদের মধ্যে সে ছিলো মর্যদাসম্পন্ন। তখন সে আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতো। অধ্যবসায় আর জ্ঞানের দিক থেকে সে অনেক ফেরেশতাদের চেয়েও ছিলো মর্যদাসম্পন্ন ও সম্মানিত।

আল্লাহ তা’য়ালা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন। যাতে তিনি ও তাঁর বংশধর পৃথিবীতে বসবাস করতে পারেন। আল্লাহ মাটি দিয়ে হযরত আদম (আঃ)-এর দেহাবয়ব তৈরি করলেন। তখন জিনদের প্রধান ও তাদের শ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী আযাযীল বা ইবলীস তাঁর চারদিক ঘুরতে শুরু করে। সে দেখতে পেলো – এটি একটি শূণ্য গর্ভ বা মূর্তি।  সে আঁচ করতে পারলো – এটা এমন একটা দেহাবয়ব যার মধ্যে আত্নসংযম থাকবে না। তারপর সে বললো-

যদি তোমার উপর আমাকে ক্ষমতা দেয়া হয়; তাহলে অবশ্যই আমি তোমাকে ধ্বংস করবো আর যদি তোমাকে আমার উপর কর্তৃত্ব দেয়া হয়, তাহলে আমি অবশ্যই তোমার অবাধ্যতা করবো”

আল্লাহ যখন আদমের মধ্যে রুহের সঞ্চার করলেন এবং সকল ফেরেশতাদেরকে আদমকে সিজদা করার আদেশ দিলেন, তখন ইবলীস হিংসাবশত তাঁকে সিজদা দিতে অস্বীকার করে আর বলেঃ

“আমি তার চাইতে উত্তম । আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদা মাটি থেকে”

এভাবে ইবলীস আল্লাহ তা’য়ালার আদেশ অমান্য করে  মহান প্রতিপালকের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলে। সে ভুল যুক্তি প্রদর্শন করে তার প্রতিপালকের রহমত থেকে দূরে সরে যায়। ইবাদত করে যে মর্যাদা সে হাসিল করেছিলো তা থেকে বঞ্চিত হয়। ইবলীস ফেরেশতাদের সাথে থাকলেও সে তাদের জাতিভুক্ত ছিলো না । কারণ সে হলো আগুনের তৈরি আর ফেরেশতারা হলো নূরের তৈরি।

তারপর ইবলীসকে আসমান থেকে বিতাড়িত করা হয়।  সেখানে বসবাস করা তার জন্য হারাম করে দেয়া হয়। সে অপদস্থ,লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত হয়ে দুনিয়াতে নেমে আসে। আল্লাহ তায়ালা গোটা মানবজাতি ও জিনদের জাহান্নামের সতর্কবাণী জানিয়ে দিয়েছেন যেন তারা ইবলীস ও তার অনুসারী থেকে সাবধান থাকে। সে তার ওয়াদানুযায়ী মানবজাতির প্রতিটা ক্ষেত্রে ধোঁকা দিয়ে বিভ্রান্ত করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়“।

সে বললো- তাকে আপনি আমার উপর মার্যদা দিয়েছেন। কিয়ামত পর্যন্ত যদি আপনি আমাকে অবকাশ দেন, তাহলে আমি তাঁর অধিকাংশ বংশধরের উপর আমার কর্তৃত্ব স্থাপন করবো। আল্লাহ বললেনঃ যাও, যারা তোমার অনুসরণ করবে জাহান্নাম ই হবে তাদের যাথাপোযুক্ত শাস্তি”

(সূরা বনী ইসরাঈল)

 

জিনদের মধ্যে অনেক জিন ইবলীসের সহযোগী । আবার অনেক জিন আল্লাহর হুকুম মেনে চলে। “তাফসীরে ফাতহুল আজীজ” গ্রন্থে এভাবে জিনদের প্রকারভেদ উল্লেখ আছে ।

১. মুসলম, এ জাতীয় জিন নামাজ, রোজা , হজ্জ , কুরআন তেলাওয়াত ও দ্বীনি ইলম শিক্ষা করে থাকে।

২. কাফের , এ জাতীয় জিনেরা মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে সদা তৎপর থাকে। এরাই হলো শয়তানের সহযোগী। তারা মানুষ ও কাফেরদের অন্যায় কাজে সাহায্য ও সহযোগীতা করে থাকে।

৩. মুনাফিক জিন, এরা প্রকৃত মুসলমানদের কাছে নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করে। তাদের অন্তরে নিফাকী রয়েছে। তারা কাফের জিনদের সাথে আঁতাত করে ও মানুষের সর্বনাশ করে।

৪. ফাসিজ, তারা কাফের মুশরিকদের মতো মানুষের ক্ষতি করে ও নানাভাবে মানুষকে কষ্ট দেয়।

৫. ইতর, এদের কাজ হলো মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে অন্যায় কাজে উৎসাহীত করে তোলা।

৬. কোন কোন কুকুরও জিনদের মধ্যে গণ্য । তবে এরা খুবই দুর্বল শ্রেণির । ইবনে আব্বাস রাঃ বলেনঃ খানা খাওয়ার সময় কোন কুকুর সামনে আসলে, তাকে কিছু দিয়ে তাড়িয়ে দাও। কালো কুকুর ব্যপারে রাসূল (সঃ) বলেনঃ কালো কুকুর সামনে দিয়ে গেলে নামাজ নষ্ট হয়ে যায়। মুসলিম শরীফে কালো কুকুরকে শয়তান বলা হয়েছে।

জিনের আকৃতি খুবই রহস্যময়। তাদের বিয়ে-শাদি , পানাহার ও কিভাবে তারা বংশবিস্তার করে – সে ব্যপারে  দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।