জ্বিন সৃষ্টি ও শয়তানের কাহিনী (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ৪:৪৮ অপরাহ্ণ, জুন ৭, ২০২০

কাজী আবুল ইয়ালা হাম্বলী (রহঃ) বলেন, জ্বিনেরা তাদের নিজস্ব আকৃতি ও স্বরূপ পরিবর্তন করতে পারেনা। আল্লাহ তাদের  কিছু শব্দাবলি শিখিয়ে দিয়েছেন, যেগুলো বলে তারা ইচ্ছে মতো কিছু রূপ ধারণ করতে পারে। তারা যখন কোন প্রাণী বা বস্তুর রূপ ধারণ করে , তখন তাদের মধ্যে সেই প্রাণী বা বস্তুর গুণাগুণ ও স্বভাব চলে আসে। বাঘ হলে হিংস্রতা, সাপ হলে সোবল দেয়া, ঘোড়া হলে তীব্র গতিতে দৌড়ের ক্ষমতা চলে আসে।

জ্বিনেরা পরস্পর বিবাহ-শাদিতে আবদ্ধ হয়। জ্বিনেরা স্বামী-স্ত্রীর মতো তাদের বৈবাহিক জীবন যাপন করে। তাদের সন্তান-সন্ততি জন্মায় । হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে যে, শয়তান বাজারে ডিম-বাচ্চা প্রসব করে। ডিম থেকে শয়তানের বংশ বৃদ্ধি ঘটে।

 

আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ এই জান্নাতী লোকদের ইতোপূর্বে কোন মানুষ বা জ্বিন স্পর্শ করে নি।

সূরা রহমানঃ ৫৬

এই আয়াতের ব্যাখ্যা হলো নেককার মানুষের সাথে নেককার জ্বিনেরাও বেহেশতে যাবে। সেখানে পুরুষদের জন্য ডাগর ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট রমণীগণ যেমন থাকেবে, তেমনি জিনদের জন্যেও বরাদ্দ থাকবে। এই সমস্ত রমণীগণকে ইতোপূর্বে কোন মানুষ বা জ্বিন স্পর্শ করে নি। উপরোক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, জিনেরা তাদের স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহ তায়ালা মানুষ ও জ্বিনকে দশ ভাগে বিভক্ত করেছেন। এর মধ্যে নয় ভাগ হলো জ্বীন আর এক ভাগ হলো হলো মানুষ। মানুষের একটি সন্তান জন্ম নেয় আর জ্বিনের সেখানে ৯ টি বচ্চা জন্ম হয়।

জ্বিনের সাথে মানুষের বিয়ে শাদি হতে পারে। তাদের ঔরস থেকে সন্তানও হতে পারে। তবে কোন কোন আলেম তা মাকরুহ বলেছেন ।

 

আল্লাহ তা’য়ালা বলেনঃ শয়তান, তুই তাদের সন্তান-সন্ততিতে শরিক হয়ে যা।

এর ব্যাখ্যা হলো মানুষ যখন অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন করে ও হারাম কাজে তা ব্যয় করে ,তখন শয়তান সেখানে শরিক হয়ে যায়। আবার নারী পুরুষ যখন যিনা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, শয়তান সেখানেও উপস্থিত হয় এবং পুরুষের সাথে সেও সহবাসে লিপ্ত হয়। ফলে জারজ সন্তান জম্ম লাভ করে। একেই বলা হয়েছে সে তোমাদের সন্তান সন্ততিতে শরিক হয়।

কথিত আছে, রাণী বিলকিসের পিতামারার একজন ছিলো জ্বিন। ইবনুল কাবলী বলেন, তাঁর পিতা জ্বিন মেয়ে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর নাম ছিলো “রায়হানা বিনতে সুকান”। তাঁর ঔরসে রাণী বিলকিসের জন্ম হয়। হযরত সুলাইমান (আঃ) যাকে বিবাহ করেছিলেন।

হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেনঃ হিজরতের পূর্বে মক্কার অনতিদূরে আল্লাহর রাসূল (সঃ) একবার আমাকে নিয়ে গমন করেন। হুজু্র আমার চারিপাশে একটি রেখা টানলেন আর বললেন, আমি ফিরে আসা পর্যন্ত তুমি এই রেখার বাহিরে বের হবে না  এবং কারো সাথে কোন কথা বলবে না। কাউকে দেখে ভয় পাবে না।  এরপর হুজুর (সঃ) সামনে আগ্রসর হলেন। আমি সামনে বেশ কিছু কালো লোক জড়ো হতে দেখলাম। আকৃতিতে তাকেরকে যিত্ব গোত্রের লোকদের মতো মনে হচ্ছিলো। আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ ফরমান, তখন অনেক জ্বিন তাঁর কাছে ভীড় জমালো।      সূরা জ্বিনঃ  ১৯

তারপর তারা চলে গেলো। যাবার সময় তাদেরকে বলতে শুনলাম- ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাদের বাসস্থান এখান থেকে অনেক দূরে। এখন আমাদের চলে যেতে হবে। তাই দয়া করে আমাদের জন্য কিছু আহার্যের ব্যবস্থা করুন। রাসূল (সঃ) বললেনঃ তোমাদের খাদ্য-গোবর আর যেকোন হাড়গোড়-তোমরা সেগুলোকে অতিক্রম করলে তা গোস্তবিশিষ্ট হাড় হিসাবে পাবে আর গোবরকে তোমরা খেজুর হিসাবে পাবে। জ্বিনেরা চলে গেলে আমি জিজ্ঞাসা করলামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, এরা কারা?  রাসূল (সঃ) বললেনঃ এরা নছীবাইন এলাকার জ্বিন।

 

জ্বিনেরা সাধারণত নাপাক স্থানে থাকতে পছন্দ করে। টয়লেট, আস্তাবল, গোয়ালঘড়, উট বাধার স্থান ও আবর্জনাময় স্থানে তাদের আনাগোনা বেশি। তাই নবী কারীম (সঃ) বলেছেনঃ দুর্গন্ধময় স্থান জ্বিন ও শয়তানের আবাস্থল। তোমারা যখন টয়লেটে যাবে তখন বলবেঃ

“আল্লাহুম্মা ইন্নি আয়ুজু বিকা মিনাল খুবছি ওয়াল খাবায়িস”

এই দোয়া পাঠ করলে তাদের সামনে পর্দা পড়ে যায়। তারা আর তোমাদের বিবস্ত্র অবস্থায় দেখতে পায় না। রাসূল (সঃ) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে গমন করলে প্রথমে বিসমিল্লাহ বলে উপরোক্ত দোয়া পাঠ করতেন।

হযরত বিলাল হারিস (রাঃ) বলেনঃ একদা আমি হুজুর (সঃ)-এর সাথে কোন এক স্থানে ভ্রমনে গেলাম। রাসূল (সঃ) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে অন্যত্র গমন করলে আমি পানির পাত্র নিয়ে সামনে যেতেই-সেখানে কিছু লোকের শোরগোল শুনতে পেলাম। যা ইতোপূর্বে কখনো শুনি নি। রাসূল (সঃ) ফিরে এলে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লহ, আপনার পাশে ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পেলাম। এ ধরনের ঝগড়া আর কখনো শুনি নি । রাসূল বললেনঃ “আমার নিকট মুসলমান ও মুশরিক জ্বিন ঝগড়া করছিলো। তারা আমার নিকট থাকার জায়গার জন্য আবেদন করে। আমি মুসলমান জ্বিনদের লোকালয়ে ও পাহাড়ে আর মুশরিক জিনদের গর্ত, খাড়ী, সমুদ্রোপকূল ও ঝোপঝাড়ে বসাবসারে জন্য বলি।