জাটিঙ্গা: যেখানে পাখিরা আত্মহত্যা করে

আমজাদ হোসাইন

প্রকাশিত: ১:৫৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

 

মানুষ যখন ডিপ্রেশন বা অতি বিষন্নতায় ভুগে তখন ধীরে ধীরে তার মানসিক কর্মক্ষমতা কমতে থাকে এবং এক পর্যায়ে এতোটাই কমে যায় যে পরবর্তী ভালোমন্দের কথা চিন্তা করতে পারে না৷ আর তখনই আত্মহত্যার মতো জঘন্য কাজের দিকে ধাবিত হয়৷ রাগ, অভিমান, ব্যর্থতা বা অন্য যেকোনো কারণে এটা হতে পারে৷ আচ্ছা পাখিদের মধ্যে কি এই রাগ, অভিমান বা ব্যর্থতার মতো ব্যাপারগুলো কাজ করে? অথবা পাখিরাও কি মানুষের মতো ডিপ্রেশন বা বিষন্নতায় ভুগে? না হলে তারা এমন দলে দলে আত্মহত্যা করে কেন? জাটিঙ্গায় আত্মহত্যা করা পাখিদের নিয়ে এসব পুরোন প্রশ্ন৷ এবং এসব প্রশ্নের উত্তর আজও মানুষের অজানা৷ শত বছরেও এই রহস্যের কোনো সমাধান খুুঁজে পায় নি বিশেষজ্ঞরা৷

 

বলছিলাম আসামের হাফলং থেকে ২০ কিমি দূরে জাটিঙ্গা নামক এক রহস্যময় গ্রামের কথা৷ বরাইল পর্বতশ্রেণীর মধ্যে জাটিঙ্গা গ্রামের শান্ত সৌম্য পরিবেশটা প্রতি রাতেই নষ্ট হয়ে যায়৷ গ্রামটিতে মানুষে মানুষে হানাহানি, মারামারি, খুনখারাবি বা এধরনের সহিংসতার কারণে যে এমনটা হয় তা কিন্তু নয়, বরং এটা হয় পাখিদের আত্মহত্যার কারণে৷ এখানে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে গণআত্মহত্যায় শামিল হয়৷ প্রতি বছর অাগস্ট থেকে অক্টোবর মাসে ঘটে এই রহস্যময় আর অবিশ্বাস্য ঘটনা, বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলে না৷

 

নিশ্ছিদ্র অন্ধকার রাতে শতশত পাখি উড়ে আসে জাটিঙ্গা গ্রামের দিকে৷ পাখিগুলি উড়তে উড়তে গ্রামের উপর এসে এক পর্যায়ে হতচকিত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়৷ অনেক পাখি এলোমেলোভাবে গ্রামের উপর পাক খায়৷ কোনোটা আবার এলোপাতাড়ি উড়তে উড়তে গাছ, বাড়ির দেয়াল বা কোন কঠিন বস্তুর সাথে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে৷ মাটিতে পড়ে যাওয়া পাখিগুলোকে গ্রামবাসীরা সহজেই ধরে ফেলে। সারা বিশ্ব ‘Bird Mystery of Jatinga’ নামেই চেনে এই মর্মান্তিক ঘটনাটিকে।

 

 

ঘটনার শুরু ১৯০৫ সালে৷ তৎকালিন জাটিঙ্গা গ্রামটিতে বাস করতো একদল নাগা। সে বছর বর্ষার শেষে এক অমাবস্যার রাতে হারিয়ে যাওয়া একটা মোষ খুঁজতে বেরিয়েছিলো নাগারা। মশাল জ্বালিয়ে বরাইল পর্বতশ্রেণীর জাটিঙ্গা গিরিশিরার একটি অংশে নাগারা পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থেকে নাগাদের ওপর শুরু হয়েছিলো পাখি বৃষ্টি৷ ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি ঝাঁপিয়ে পড়ছিলো তাদের উপর৷ কুসংস্কারছন্ন নাগারা ভেবেছিলো এটা কোনো অশুভ আত্মার কারসাজি৷ মোষের মায়া ত্যাগ করে তারা ছুটেছিলো গ্রামের দিকে৷ এটাকে অশুভ লক্ষণ মনে করে কয়েক মাসের মধ্যে গ্রাম ছেড়ে নাগারা পালিয়েছিলো নতুন ঠিকানার খোঁজে৷ যে পথ ধরে নাগারা এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো, সেই একই পথে বসতির জন্য উপযুক্ত জায়গার খোঁজে আসছিলো মেঘালয়ের একদল ‘নার’ আদিবাসী৷ মাঝপথে মেঘালয়ের আদিবাসীদের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো নাগাদের৷ নাগারাই জাটিঙ্গা গিরিশিরায় তাদের ফেলে আসা গ্রামের খবর দেয় নার আদিবাসীদের। জানায় তাদের সাথে ঘটে যাওয়া অশুভ ঘটনাটিও৷ নার আদিবাসীরা কিছুটা কুসংস্কারমুক্ত ছিলো। তাই তারা নাগাদের কাছ থেকে কাহিনী শুনেও বিশ্বাস করেনি বরং নাগাদের ফেলে আসা গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলো৷

 

১৯১০ সাল নাগাদ এই আদিবাসীরা আবিষ্কার করে পাখিদের রহস্যময় ঘটনাটি৷ প্রতিবছরে কেবলমাত্র আগস্ট থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে দেখা যায় তাদের এই আজব কাণ্ড৷ তাও আবার সব অবস্থায় না বরং নির্দিষ্ট কিছু আবহাওয়ায়৷ দেখা যেতো ঐ নির্দিষ্ট রাতগুলোতে পাখিদের চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে গ্রামবাসীদের জ্বালানো আগুন। তারপর থেকে প্রত্যেক বছর এই তিনমাস চাঁদহীন রাতে গ্রামবাসীরা লণ্ঠন জ্বালিয়ে খুঁটিতে ঝুলিয়ে রাখতো পাখি ধরার জন্যে৷ গ্রামে যেন উৎসব লেগে যেতো এই মাসগুলোতে৷ পাখি ধরা ও পাখিদের মাংস খাওয়া চলতো জমিয়ে।

 

নাররা পৃথিবীবাসীর কাছ থেকে ঘটনাটি লুকিয়েছিলো ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত৷ ব্রিটিশ পাখি বিশারদ E.P.Gee ঘটনাটি জানতে পেরে এসেছিলেন জাটিঙ্গাতে। সেখানে তিনি বেশকিছু মাস থাকেন, পাখিদের আত্মহত্যা নিজের চোখে দেখেন এবং নোটবুকে লিখে রাখেন বিভিন্ন তথ্য। ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত তার লেখা “The Wildlife of India” বই থেকে পুরো পৃথিবী জানতে পারে জাটিঙ্গা রহস্যের কথা।

 

 

E.P.Gee লিখেছিলেন, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট কিছু ধরণের আবহাওয়া ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য একসাথে দেখা গেলে তবেই গ্রামের আকাশে উড়ে আসে পাখিরা। যেমন, সেই রাত হতে হবে চাঁদহীন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন৷ পরিবেশ হবে কুয়াশাচ্ছন্ন বা আকাশ মেঘলা হতে হবে। সেই রাতে বাতাসের অভিমুখ হতে হবে দক্ষিণ থেকে উত্তরে। পাখি ধরার জন্য জ্বালানো আলোগুলো উজ্বল ও গোলাকার হতে হবে। পাখিদের আসার জায়গাটি খোলামেলা হতে হবে। পাখিদের আসার আদর্শ সময় সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত দশটা৷ এমন আদর্শ পরিস্থিতিতে পাখিদের গ্রামবাসীদের বাড়িতেও ঢুকে পড়তে দেখা যায়। তিনি আরোও জানিয়েছিলেন, পাখিরা আত্মহত্যার জন্য উড়ে আসে আগস্টের ১৫ তারিখ থেকে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে৷ এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাস ঘটনাটি ঘটার পক্ষে সবচেয়ে আদর্শ।

 

• জাটিঙ্গা রহস্য নিয়ে গবেষণা:

১৯৭৭ সালে জুলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পাখি বিশেষজ্ঞ ড. সুধীন সেনগুপ্ত জাটিঙ্গাতে আসেন৷ জাটিঙ্গা গ্রামে তিনি আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ছিলেন৷ তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণ শেষে লিখেছিলেন “শয়ে শয়ে পাখি আকাশ থেকে ঝরে পড়ছিলো। পাখিগুলিকে দেখে উদভ্রান্ত, হতবুদ্ধি, হতচকিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় লাগছিলো৷ ধরা পড়ার পর খুব কম পাখিই পালাবার চেষ্টা করেছিলো। এমনকি সেগুলিকে ছেড়ে দেওয়ার পরেও তারা পালাচ্ছিলো না এবং দেওয়া খাবারও তারা খাবার খাচ্ছিলো না৷”

 

তিনি আরোও বলেন, জাটিঙ্গা রহস্যের পিছনে লুকিয়ে আছে আবহাওয়া ও বায়ুচাপের আকস্মিক পরিবর্তন, ভূ-চুম্বক, মাধ্যাকর্ষণ টান ও উপত্যকার বায়ুমণ্ডলের বৈদ্যুতিক গোলযোগ৷

 

 

জাটিঙ্গা গিরিশিরার পাথরে থাকা উচ্চ চুম্বকশক্তিযুক্ত খনিজ পদার্থ, উপত্যকার নিচে থাকা Halflong-Disang fault নামের ভৌগলিক ফাটল এবং বর্ষার পর মাটিতে বেড়ে যাওয়া জলের স্তর, এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একত্রিত হয়ে এলাকাটির মাধ্যাকর্ষণ ও চুম্বকশক্তির অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় গিরিশিরার অত্যন্ত খামখেয়ালি আবহাওয়া৷

 

এ সবের প্রভাব পড়ে পাখিদের স্নায়ুতন্ত্রের উপর। ওই রাতগুলিতে পাখিদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে৷ ফলে তারা চঞ্চল হয়ে ওঠে, ভয় পেয়ে রাতের আঁধারে উড়তে শুরু করে৷ একেতো রাতে উড়তে তারা অভ্যস্ত নয় তার উপর জাটিঙ্গা গিরিশিরার চৌম্বকত্বের পরিবর্তন পাখিদের ভেতরে থাকা বায়ো-কম্পাসকে বিকল করে দেয়। এলোমেলোভাবে উড়তে উড়তে পাখিরা গ্রামবাসীদের জ্বালানো আলো দেখে আকৃষ্ট হয়ে উড়ে যায় জাটিঙ্গা গ্রামের দিকে। এলোপাথাড়ি ওড়ার কারণে দেয়াল, গাছ বা অন্যকোন কঠিন বস্তুর সাথে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে৷ আর না হয় নিচ দিয়ে ওড়ার কারণে সহজেই ধরা পড়ে গ্রামবাসীর কাছে৷

 

পৃথিবী বিখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ড. সেলিম আলি বলেছেন, “দিনের বেলায় সক্রিয় থাকা স্থানীয় পাখি, যারা সন্ধ্যাবেলাতেই ঘুমিয়ে পড়ে। তারা কীভাবে ঘুম থেকে উঠে একসঙ্গে উড়ে যায়, এটাই সবথেকে বড় রহস্য। এর সমাধান জানতে হলে বিভিন্ন দিক থেকে গভীরতর গবেষণা প্রয়োজন। তবে বাইরে থেকে জাটিঙ্গায় গিয়ে রহস্য উদঘাটন করা অসম্ভব৷ গবেষণা করতে হলে ওখানেই বছরের পর বছর থেকে গবেষণা করতে হবে।”

 

আসামের সুপরিচিত পাখি বিশারদ আনোয়ারউদ্দিন চৌধুরী তাঁর বই “The Birds of Assam” এ লিখেছেন পাখিগুলো মূলত কমবয়সী এবং ওড়ার ব্যপারে অনভিজ্ঞ। গিরিশিরার উপর দিয়ে বয়ে চলা বাতাসে উড়তে না পেরে হতভম্ব হয়ে পড়ে। তখন আলো দেখে গ্রামে উড়ে এসে নানাভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয় অথবা গ্রামবাসীর কাছে ধরা পড়ে।

 

বিখ্যাত ফরেস্ট অফিসার এইচ.পি. ফুকন জাটিঙ্গা গ্রামবাসীর পাখি নিধনের খবর পেয়ে, পাখি রক্ষার ব্যবস্থা করতে যেখানে যান৷ তিনি গ্রামের প্রান্তে দাঁড় করিয়ে দেন একটি উঁচু ইস্পাতের টাওয়ার, যার নিচে লাগানো হয় শক্তিশালী ইলেকট্রিক লাইট। তিনি ভেবেছিলেন পাখিরা আলো দেখে আকর্ষিত হয়ে গ্রামকে এড়িয়ে টাওয়ারের দিকে আসবে। এতে পাখিরা বেঁচে যাবে গ্রামবাসীদের হাত থেকে। সামান্যই সাফল্য পেয়েছিল ফুকন সাহেবের এই পরীক্ষা। কিছু পাখি টাওয়ারের আলোতে আকর্ষিত হলেও বেশির ভাগ পাখিই গ্রামেই নামছিলো। ফুকন সাহেব দেখেছিলেন আরোও একটি মর্মান্তিক ঘটনা। যেসব পাখি টাওয়ারের আশেপাশে ধরা পড়ছিল কোনও রহস্যময় শক্তির প্রভাবে তারাও বাঁচছিলো না৷ খাবার না খেয়ে স্বেচ্ছায় তারা মারা যাচ্ছিলো৷

 

 

ড. সেনগুপ্ত ও এফ. সি. ফুকনের দেওয়া কিছু তথ্য রহস্যের কুয়াশা আরও ঘন করে দিয়েছে৷ তাদের দেয়া তথ্য মতে:-

√ পাখিরা পুরো জাটিঙ্গা গিরিশিরার প্রতি আকৃষ্ট হয় না, বরং মাত্র দেড় কিলোমিটার লম্বা ও ২০০ মিটার চওড়া একটি নির্দিষ্ট এলাকাতেই তারা সম্মোহিতের মতো উড়ে আসে এবং আত্মাহুতি দেয়।

√ জাটিঙ্গা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে থাকা একটি গ্রামের বাসিন্দারা বহু বছর ধরে আলোর ফাঁদ পেতে পাখি ধরার চেষ্টা করে আসছিলো। কিন্তু সেই গ্রামকে উপেক্ষা করে পাখিরা উড়ে জাটিঙ্গায় চলে আসে৷

√ জাটিঙ্গা গিরিশিরার উত্তর ও দক্ষিণের পরিবেশ, জঙ্গল ও গাছে থাকা পাখির সংখ্যা প্রায় একই। তবে আত্মহত্যার জন্য জাটিঙ্গা গ্রামে উড়ে আসে কেবলমাত্র গিরিশিরার উত্তরে বসবাসকারী পাখিরা৷ দক্ষিণের পাখিরা গ্রামে উড়ে আসে না৷

√ বিজ্ঞানীদের অবাক করেছে ফুকন সাহেবের আরেকটি তথ্য৷ ধরা পড়া প্রায় সব প্রজাতির পাখিই দিনের বেলায় ওড়ে এবং রাতে বাসায় থাকে। তার মানে হচ্ছে নিশাচর পাখিরা জাটিঙ্গায় ধরা পড়ে না, যা স্বাভাবিক অবস্থার উল্টো৷

ড. সেনগুপ্ত ও ফুকন সাহেব গ্রামবাসীদের হাতে ধরা পড়া প্রায় ৩৮ টি প্রজাতির পাখির নাম লিপিবদ্ধ করেন। গ্রামে ধরা পড়া সবকটি প্রজাতির পাখিই স্থানীয়। গ্রামটির ১০-১৫ কিলোমিটারের মধ্যে পাখিগুলো বসবাস করে। এদের মধ্যে আছে hill partridge, green pigeon, bitterns, emerald dove, tiger bittern, black bittern, little egret, pond heron, Indian pitta, kingfisher, necklaced laughingthrush, black drongo, moorhen সহ আরোও অনেক পাখি।

 

এখানেই লুকিয়ে আছে এক চাঞ্চল্যকর ও অমীমাংসিত রহস্য। কিছু পাখি, যেমন grouse, hornbill ও imperial pigeon আশেপাশের জঙ্গলে থাকলেও কোনোওদিন এরা ওই সব ভয়ঙ্কর রাতে জাটিঙ্গা গ্রামে উড়ে এসে ধরা পড়ে নি। এমনকি গ্রামে ধরা পড়ে নি ময়না চড়ুইয়ের মতো সহজলভ্য স্থানীয় পাখিও। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, কিছু স্থানীয় পাখি আত্মহত্যার জন্য উড়ে আসছে, আবার কিছু পাখি একই জায়গায় থেকেও গ্রামের দিকে উড়ে আসছে না কেন?

 

ভূ-চুম্বক, মাধ্যাকর্ষণ টান ও উপত্যকার বায়ুমণ্ডলের বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও আবহাওয়ার প্রভাব তো সব পাখির ওপরই সমানভাবে পড়ার কথা! এই রহস্যের আজও কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি।

 

 

ড. সুধীন সেনগুপ্ত, ড. সেলিম আলী ও আনোয়ার উদ্দীন চৌধুরীসহ এপর্যন্ত যেসকল পাখি বিশারদগণ জাটিঙ্গায় অবস্থান করে পর্যবেক্ষণ করেছেন; তাদের ভাষ্যমতে জাটিঙ্গা রহস্য উন্মোচনের পথে এখনও অনেক পথ বাকি৷ এই রহস্য সমাধানের জন্য দরকার ornithologists, geologists, geophysicists, weather experts দের একত্রিত ও নিরবিচ্ছিন্ন গবেষণা। তবেই এই রহস্যের সমাধান সম্ভব হবে।

 

অন্যদিকে পাখিদের মৃত্যু রুখতে গ্রামবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াবার চেষ্টা করেছিলেন ফুকন সাহেব। ‘বার্ড ওয়াচার’ ক্লাব তৈরি করেছিলেন জাটিঙ্গা গ্রামের তরুণদের নিয়ে। তাদের জঙ্গলে ক্যাম্পিং-এ নিয়ে গিয়ে পাখি চিনিয়েছিলেন৷ পরিবেশে পাখির প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছিলেন৷ ফলে পাখি মারার হার কমে এসেছে। তবে জাটিঙ্গা গ্রামে পাখির আসার হার কমেছে গত কয়েক বছরে৷ আর তা নিছকই বৃক্ষনিধন ও পরিবেশ দূষণের কারণে৷ কিন্তু আজও জাটিঙ্গা গ্রামটির দূর্গম অবস্থানের সুযোগ নিয়ে গ্রামবাসীরা পাখি মেরে চলেছে।

 

• সবশেষে বলা যায়,

জাটিঙ্গা রহস্য যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই আছে। কীসের আকর্ষণে প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পাখিরা আত্মাহুতি দিয়ে চলেছে মানুষের লোভের আগুনে, তার সন্ধান মেলেনি আজও। পাখিদের আত্মহত্যার এই রহস্য উন্মোচন হবে কিনা বা হলেও তা কতো শতাব্দী পর হবে তা জানে না কেউই৷

 

পাখিদের এই আত্মাহুতির ঘটনা দেখতে চাইলে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে অবস্থান করতে হবে জাটিঙ্গায় ৷ নিকটবর্তী বিমানবন্দর শিলচর থেকে ১১০ কিলোমিটার ও গোয়াহাটি থেকে ৩৫০ কিলোমাটার দূরে৷ বিমানবন্দরে নেমে বাসে হাফলং-এ যেতে হবে। ট্রেনে যেতে চাইলে গৌহাটি থেকে লুমডিং পর্যন্ত ব্রডগেজ রেললাইনে। সেখান থেকে আরেকটি মিটারগেজ ট্রেন হাফলং নিয়ে যাবে। সেখান থেকে লোকাল যানবাহনে করে জাটিঙ্গা যেতে হবে৷ যাওয়ার সময় অবশ্যই সেখানে বেশ কিছুদিন থাকার প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হবে৷