ছোট গল্প: কবর

প্রকাশিত: ১০:১৫ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০

 

লিখেছেনঃ  সাদ আহাম্মেদ।

 

শাওন, সাতক্ষীরায় এক জাদুটোনা করা মহিলা তার স্বামী আর বাচ্চাকে জীবন্ত পুড়িয়ে খেয়ে ফেলেছে। একটু যেয়ে রিপোর্টটা কভার করতে পারবা?– এইরকম একটা মামাবাড়ির আবদার রাত ২ টার দিকে শুনে আনন্দে আমার পবিত্র মনটা বিগলিত হয়ে গেলো। ফোন করেছেন রিজভী ভাই, আলো পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক। উনার কথার সারসংক্ষেপ থেকে বুঝলাম, সাতক্ষীরা জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম কুঞ্জবাড়ির এই ঝাড়ফুঁক দেয়া মহিলাকে গ্রামবাসী ঘিরে রেখেছে তার পরিবারকে বলি দিয়ে শয়তানের সন্তুষ্টিতে উৎসর্গ করার জন্য। কেউ কেউ সাহস করে মহিলাকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করছে কিন্তু কাছে গেলেই মহিলা কি একটা বিড়বিড় করে পড়ে, লোকজন ওখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। রিজভী ভাইয়ের ফোনভাষ্য অনুযায়ী, এটা একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা। আমার এই মুহূর্তে রওনা হওয়া উচিত। আমি উনার কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোনটা কেটে দিলাম। তারপর চিৎকার করে ঘর কাঁপিয়ে কাকে যেন গালি দিয়ে বললাম, শা_য়ার রিপোর্ট। মনে মনে ভাবলাম, কোথাকার কোন পাগল ছাগল মহিলা কী আকাম করছে এইজন্য রাত দুইটায় আমাকে এই করোনার পরিস্থিতিতে আলো পত্রিকার ভাড়া করা দুই সিট ভাঙ্গা মাইক্রোতে করে এখন সাতক্ষীরা যেতে হবে। কতো নদী, কতো সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এই বিশাল জার্নিটা আমার করতে হবে জানি না। বাট আই জাস্ট ফাক দিজ ব্লাডি সাংবাদিকতা।

 

প্রিয় পাঠক, এই ঘটনা এপ্রিলের ৩০ তারিখ রাতের। ঠিক তার ২৩ ঘন্টা পর কী অদ্ভূত এক পরিস্থিতিতে আমি পড়েছিলাম তা হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারছেন না। আমিও পারি নি। প্রায় ১৬টা দিন আমি ভেবেছি কিভাবে কথাগুলো লিখবো। এই লেখাটা লিখতে আমার কষ্ট হয়েছে, কিন্তু আমি জানি আমার যে লিখতে হবেই।

 

আমার সহকারী বিল্লাল খুবই ফালতু একটা ছেলে। গতবছর স্ট্যামফোর্ড থেকে ফটোগ্রাফীতে মাস্টার্স করেছে। তার ধারণা সে প্রীতরেজা সাহেবের থেকেও ভালো ফটোগ্রাফি বোঝে। প্রত্যেকটা ছবি তোলার পর সে ফিসফিস করে বলে, সব এপারচারের খেলা বুঝলেন শাওন ভাই। আর একটুখানি ফোকাস আর এঙ্গেল। তাকে আমি ভোর ছয়টায় ফোন দিলে সে লাজুক কণ্ঠে বলে, ভাই একটু ব্যস্ত ছিলাম। পরে কল দেই।
আমি পাশ থেকে নারী কন্ঠ শুনতে পাই। ওকে ইনিয়ে বিনিয়ে বলছে, কই যাও খালি!
আমি গলা খাকাড়ি দিয়ে বললাম, হারামজাদা বিয়ে করছোস দুই দিন। এখন কি বউরেও এপারচার শিখাইতাছোস। এক ঘণ্টার মধ্যে তোর বস্তি বাসার সামনে আসবো, রেডি থাকবি। সাতক্ষীরা যাইতে হবে।

 

ও কিছু বলার আগেই ফোন কেটে দিলাম। কিছুক্ষণ আগে তাকে হারামজাদা বললেও ছেলেটা আসলে অতটাও খারাপ না। আমি নিজে আলো পত্রিকার একজন ফ্রিল্যান্সার, এখনও পারমানেন্ট হই নি। সেখানে বিল্লাল আমার সাথে টুকটাক ছবি তোলার কাজ করে তাই কোন পজিশনই পায় নি। আমাকে একটা রিপোর্ট করার জন্য যে অল্প টাকা দেয়া হয় তার ২৫% ওকে দিয়ে দেই। মাঝে মাঝে একটু বেশিও দেই। কখনোই এইসব নিয়ে ও গাইগুই করে না। মোটমাট ৩০টার মত রিপোর্ট আমরা একসাথে কভার করেছি। সবই এই রকম আজিব অথবা ফাজিল টাইপ লোকাল রিপোর্ট। যেমন কিছুদিন আগে এক বাবুর্চী বেজির মাংসের বিরানী রান্না করে বিয়ে বাড়িতে বরযাত্রীকে খাইয়েছে। তাই সবার এখন প্রাণ যায়যায় অবস্থা। এই রিপোর্ট করতে আমি যখন মুন্সিগঞ্জ গেলাম, তখন বেজি খাওয়া জামাই আমাকে দেখে প্রায় কেঁদে ফেললো। বললো, ভাই বিয়া করতেইতো গেছিলাম। দেহেন আমারে কি খাওয়ায় দিলো। কোথাও মুখ দেখাইবার পারতাছি না।আমি কোন প্রশ্ন খুঁজে না পেয়ে মুন্নী আপুর মত জিজ্ঞাসা করলাম, বেজীর মাংশ খেয়ে আপনার অনুভূতি কী?

জামাই আরো জোরে চিক্কুর পেড়ে কেঁদে বললো, ঢাকায় আইজকা যামু হসপিটালে ভর্তি হইতে। একটু পরপর খালি ঢেঁকুর উঠতেছে, আর মনে হইতাছে কিডনী বাইর হয়ে যাইবো ঢেকুর এর সাথে।আমার এসিস্ট্যান্ট বিল্লাল মাঝে মাঝে খুবই ফালতু কাজ করে। সে দাঁত খিলাল করতে করতে বললো, ভাই শান্ত হোন। আমি দুই বছর ফিলিপাইন ছিলাম। ঐখানে মানুষ অনেক টাকা দিয়ে বেজি কিনে খায়। ওখানের ডাক্তাররা বলে, যারা বেজি খায় তারা নাকি খুবই যৌনশক্তির অধিকারী হয়। আপনের বউরে একটু জিজ্ঞেস করেন না?

আমি বিল্লালকে একটা ধমক দিয়ে বললাম, চুপ কর।

এরপর বেজি খাওয়া জামাইকে বললাম, আপনি কি পুলিশে জানাইছেন?

জামাই পেটে হাত দিয়ে সত্যি সত্যি ঢেকুর তুলে বললো, জানামু কী! হেয় নিজেও তো বেজির মাংশ খাইছে। ভাই শুনেন, আমি আর আমার শ্বশুর আম্লীগ করি। বাবুর্চী যারে নিয়া আসছি হেয় বিরোধী দল করে। আপনে রিপোর্টে এই ষড়যন্ত্রের কথা লিখ্যা দিয়েন। আমরা দলের জন্য জান দিয়া দেই আর আজকে আমাগো এই অবস্থা। আপনে ,আল্লার দোহাই লাগে, আমাদের ত্যাগতিতিক্কার কথা ভালো কইর‍্যা ছাপায়েন।

 

মে মাসের এক তারিখ ঢাকা থেকে ২৫৯ কিমি দূরে প্রায় ষোল ঘণ্টার জার্নি করে আমরা সাতক্ষীরা পৌছালাম। মাঝখানে গোয়ালন্দের দিকে ব্রহ্মপুত্র-পদ্মার কাছে আমাদের ফেরীতে উঠতে হয়েছিলো। করোনার জন্য সব ফেরী বন্ধ। শুধু পত্রিকার কথা বলে একটা বিশেষ ফেরীতে প্রায় ৮ ঘন্টা অপেক্ষার পর আমরা জায়গা পেয়েছিলাম। যার জন্য এতো আজাইরা কষ্ট আমাদের, আমার বিশ্বাস সেই মহিলার হয়তো কোন অস্ত্বিত্বও নেই বাস্তব জীবনে। রিজভী ভাই আমার খাওয়া পরার জোগান দেয়, তাই বাধ্য হয়ে আমার যেতে হচ্ছে। আমি নিশ্চিত উনি নিজেও জানেন যে এটা একটা ভুয়া খবর। যাত্রাপথে উনি আমাকে দুইবার ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিলেন। মাস্ক নিয়েছি কিনা, জীবানুনাশক আছে কিনা -এইসব হাবিজাবি। এই ভদ্রতাটা না দেখালেও চলতো, কিন্তু উনি দেখালেন। এইসব কেয়ারের জন্যই উনার সাথে ঝামেলা করি না। যাত্রাপথে আরেকটা ফোন পেয়েছিলাম আমার স্ত্রী অরুণিমার কাছ থেকে। ওকে আমি যখন ভালোবাসতাম তখন অরু বলে ডাকতাম। এখনও মাঝে মাঝে ভুল করে অরু বলে ডাকি। ফোনটা আমি ধরি নি। ইচ্ছা করে নি। ওর নাম দেখলেই এখন মেজাজটা বিলা হয়ে যায়।গাড়ির ড্রাইভার মুকাব্বির সাহেব একটা কাঁচা রাস্তার সামনে এসে গাড়ি থামিয়ে বললো, শাওন ভাই এইহান থিকা আপনেরা নিজরা ব্যবস্থা কইর‍্যা নেন।

আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, আরো ৯ কিমি আছে তো কুঞ্জবাড়ি যাইতে। হেঁটে যাওয়া যাবেনা।

মুকাব্বির সাহেব আমাদের কথা পাত্তা না দিয়ে হাই তুলে বললো, ভাই এইটা একটা ডেঞ্জারাস জায়গা। এইহানে হালিমা নামে ওই ডাইন্নী বেটি থাকে। মানুষজন মাইর‍্যা খায়া ফেলায়। আমি যাইতে পারুম না। আর তাছাড়া পটোকল নাই।

বিল্লাল ঘুমিয়ে ছিলো এতোক্ষণ। সে চোখ কচলাতে কচলাতে বললো, ভাই পটোকল কি?

মুকাব্বির তার কথায় পাত্তা দিলোনা। বিল্লাল আমার এসিস্ট্যান্ট, তার কথা ড্রাইভার সাহেবের মতো সম্মানিত সিনিয়র লোকের পাত্তা না দিলেও চলে এটা সে বুঝে গেছে। আমি কথা না বাড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। বিল্লালকেও ইশারা করলাম নেমে যেতে। আমাদের এখান থেকে দুই কিমি সামনেই নলতা শরীফ। সেখানে একটা খাবার হোটেল আছে। ফুলকুমারী নাম। আমার ধারণা- সাতক্ষীরার যারা বাসিন্দা তারা এই রেস্টুরেন্টে জীবনে একবার হলেও খেয়েছেন।

 

সন্ধ্যা সাতটা বাজে তখন। ক্ষুধা যে খুব বেশি লেগেছে তা না। তবুও ভাবলাম কিছু খেয়ে নেই। আবার কখন খাবার পাবো জানা নেই। এখন যে প্রত্যন্ত গ্রামে যাবো সেখানে খাবারের দোকান পাওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখছি না। আর এখন চারদিকে সব লকডাউন, আমার মনে হয়না খুব সহজ হবে খাবার পাওয়াটা। ফুলকুমারী খোলা আছে কিনা আমার সেটাও জানা নেই। বিল্লালকে নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। পথে একটা সিগারেট ধরানোর ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু প্যাকেট খালি। গ্রামের কাচা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নানান চিন্তা আসতে লাগলো। যেই মুহূর্তে অরুর কথা মনে হলো, সাথে সাথেই ওর ফোন আসলো। এবার আমি অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে ফোনটা ধরলাম।শাওন, বাচ্চাটার গায়ে খুব জ্বর। তোমার সাথে বারবার কথা বলতে চাচ্ছে। একটু কথা বলবে?

আমি বিরক্ত হয়া বললাম, অরু তোমার তো আমাকে ফোন করার কথা না। আমার সাথে কোর্টে তোমার তালাকের তারিখ আগামী মাসের দুই তারিখ। ১ মাস ১ দিন পর। তুমি কাগজপত্র গুছাও। আমার মতো খারাপ মানুষের সাথে তোমার কথা বলার তো কোন প্রয়োজন দেখি না।

অরু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, শাওন দুই বছরের বাচ্চা তালাক বোঝে না। ওর গায়ে ১০৩ জ্বর ছিলো কাল রাতে। পারলে একটু কথা বলো। কিছু খাচ্ছে না।
আমি মিমির সাথে কথা বলতে চাইলে, অরু মিমির কানে ফোন ধরলো আর পাশ থেকে বললো, ড্যাড্ডি। কথা বলো।

মিমি হচপচ করে বললো, ড্যাড্ডি কোলে, ঘুরা।

এ কথার অর্থ হলো, আমার ওকে কোলে নিয়ে ঘুরাতে হবে। ওকে বললাম- আম্মু, আমি বাসায় এসে তোমাকে কোলে নিয়ে ঘুরাবো। তুমি খাচ্ছো না কেনো ঠিকমতো।

মিমি জ্বরে মনে হয় ক্লান্ত হয়ে গেছে। ক্লান্ত কণ্ঠে বারবার কোল কোল করছে। আমি ফোনটা কেটে দিলাম। আমার চোখের এক কোনায় একটা অদৃশ্য পানি এসে জমলো। বিধাতা ছাড়া এই অর্থহীন জল আর কেউ দেখতে পায় না।

 

অরুর সাথে বছর চারেক আগে বিয়ে হয়েছিলো। আমি এতীম মানুষ, বাপ মা ভাই বোন কেউ নেই। মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছিলাম। মামা অজিফুল্লাহ মাস্টার আমাকে নিজের বাচ্চার মতই মানুষ করেছেন। মামার বাড়িতে তবুও একটা চাকর চাকর ভাব নিয়ে থাকতাম। কলেজ পাশ করে আমি ঢাকা ভার্সিটিতে যখন ভর্তি হলাম তখন মামা-মামী সবাই ভয়ংকর খুশি হয়েছিলো। খুশী হয়নি আমার মামার মেয়েটা। ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার দিন দুয়েক পর ও একদিন আমার কাছে এসে বললো, শাওন তুই কি চলে যাচ্ছিস সত্যি সত্যিই?

আমি মাথা নেড়ে বললাম, খুশী হইছোস? এখন তুই তোর কলেজের হাফমোছ ওঠা ওই পোলার সাথে ইচ্ছামত প্রেম করতে পারবি। আমি কাউরেই আর কিচ্ছু বলবোনা।

মেয়েটা মাথা নাড়লো। যাওয়ার একদিন আগে রাতে ও আমার রুমে এসে বললো, তুই যদি ঢাকা যাস আমাকে বিয়ে করে তারপর যাবি। আমার পেটে তোর বাচ্চা।
আমি হতভম্ব হয়ে বিছানা থেকে উঠে বললাম, একটা চড় খাবি। এইসব কী ধরণের কথা!

ও হঠাত মুখ চেপে কাঁদতে থাকলো। আমার হাত ধরে বললো, আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি। আমার ভেতর তখন কিছু একটা হয়েছিলো। আচ্ছা, প্রথম যখন কেউ কাউকে ভালোবাসি বলে তখন কেমন একটা অনুভূতি হয় না! মনে হয় না সারা শরীরটা কেউ ঝাঁকিয়ে দিচ্ছে! আমারও তখন শরীর কাঁপছিলো। তখন আমার বয়স মাত্র ১৯। চার অক্ষরের এই শব্দটা বোঝার মত বয়স সেটা নয় বলেই মানি। আমি ওকে কিছু বলতে পারছিলাম না। ও চলে যাওয়ার পরও ঠায় সেখানেই অনেকটা সময় দাঁড়িয়েছিলাম। ঢাকায় চলে গিয়েছিলাম এর পরের দিন। গ্রামে আর ফেরত আসতে চাই নি। মামার গালি খেয়ে আবার আসতে হলো ওর বিয়ের ঠিক এক দিন আগে। বাড়িতে সবাই তখন বিয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আমি রাতে বিছানায় শুয়ে বারবার ভাবছিলাম মেয়েটা যদি আবার এখন আসে কি বলবো! ও কি আসবে একটাবার?

ও আসেনি। আমি নিজেই রাত চারটায় ওর রুমে যেয়ে ওকে ডেকে তুললাম। পাশে মামী ঘুমিয়ে ছিলো। আমি ওকে বললাম, আরেকবার বলবি। আমার জীবনটা ছন্নছাড়া হয়ে যাচ্ছে রে। আরেকবার বল প্লীজ।

কি হয়েছিলো জানিনা। আমি আবেগে কেঁদে ফেলেছিলাম। ও ঘুম থেকে উঠে কিছু বুঝে উঠতে পারছিলো না। মামীও প্রায় জেগে গিয়ে বিড়বিড় করছে। এইরকম বিতিকিচ্ছিরি অদ্ভূত পরস্থিতিতে ও আমার হাত ধরে বললো, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি। শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।আমার মামাতো বোনের নাম ছিলো, স্নিগ্ধা জাহান অরু। সেই অরুর সাথে আমার বিয়েটা হয়নি। ঐ ঘটনার পরদিন  পাশের গ্রামের চেয়ারম্যান সাহেবের ছেলে কামরুল বাশার শুভর সাথে অরুর বিয়ে হয়েছিলো। শুভ ভাই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। সবার সাথে অত্যন্ত অমায়িকভাবে কথা বলতেন। একটাই সমস্যা ছিলো, উনি বউ পেটাতেন। অরুকে পিটিয়ে পিটিয়ে উনি মেরে ফেলেছিলেন। আমি আর মামা মাইক্রো ভাড়া করে লাশটা নিয়ে এসেছিলাম। অরুর ছেলেটাকে আমাদের সাথে আনার চেষ্টা করেছিলাম। ওরা দেয় নি। আমি নিজ হাতে অরুর লাশটা কবরে রেখে দিয়েছিলাম। মাহরাম না হওয়ায় লাশের মুখ দেখার অনুমতি আমার ছিলো না। তবুও ওর মুখের আদলটা দেখতে পাচ্ছিলাম আমি স্পষ্ট। কাফনের কাপড়ে একটা জ্বলজ্বলে মুখ, এই মুখটা প্রতিরাতে এখনও আমার স্বপ্নে এসে হাত ধরে বলে – ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি। অরু আমার জীবনটা এমন ছন্নছাড়া করে দিলি ক্যানো রে?

 

এর পাঁচ বছর পর আমার সাথে অরুণিমার দেখা হয়, পরিচয় হয়। আমার ভার্সিটির জুনিয়র মেয়ে, কারো সাথে তেমন কথা বলতো না ও। শুধু আমার সাথে কীভাবে যেনো একটা ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেলো। আমরা একসাথে থিয়েটার দেখতাম। একটা পত্রিকা অফিসে কাজও শুরু করেছিলাম একসাথে। প্রায়দিন বাসায় ওকে নামিয়ে দিয়ে আসতাম। একদিন নামিয়ে দেয়ার পর ও আমাকে বললো, শাওন ভাই আপনি বাসায় যেয়ে কী খাবেন?
আমি মাথা নেড়ে বললাম, কী আর খাবো ভাই? বাসায় রাতে খাইনা। পাশে একটা হোটেল আছে। ওইখান থেকে সন্ধ্যায় বানানো পেয়াজু, পুরি যেগুলো বেঁচে যায় খেয়ে নেই। রান্না করে খাওয়ার অনেক খরচ। পোষাইতে পারবোনা।

অরুণিমা মুখে চুকচুক করে বলতো, আপনি বিয়ে করেন না কেনো?

আমি হেসে বললাম, আমার মত এতীম গরীবকে কে বিয়ে করবে বলো?

একথা শুনে ও বাই বলে চলে যাচ্ছিলো। কিন্তু গেটের কাছে যাওয়ার পর আমাকে আবার ডাকলো। আমি কাছে গেলে বললো, আমি করবো।
আমি হেসে চলে আসলাম সেদিন বাসায়। তার এক সপ্তাহ পর ধুমধাম করে আমার বন্ধুরা দেড় কেজি জিলাপী, ২৫ টাকা পিছ মালা, ১৪০০ টাকার পাঞ্জাবী আর ২৩০০ টাকায় হোটেলরুম ভাড়া নিয়ে আমাকে বিয়ে করিয়ে দিলো। দিলশাদ আপার বাসায় সবাই রাতে খাওয়া দাওয়া করেছিলো। আমি বাসর রাতে আমার নিউ মুন হোটেলের ভাড়া করা রুমে ওকে বললাম, আমি তোমাকে অরু বলে ডাকি?

ও মাথা নেড়ে বললো, আচ্ছা।

 

সাতক্ষীরার ফুলকুমারী হোটেলে রসুন আর আলু মিক্স টাইপ একটা অখাদ্য ভর্তা খেতে খেতে আমার মনে পড়লো এইসব হাবিজাবি কথা। কী ভয়ংকর একটা জীবন। যে অরুণিমার সাথে এতো নাটক করে বিয়ে হলো, একটা ফুটফুটে বাবু হলো আজ তার সাথে কোর্টে আমার ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে।
হোটেলের খাওয়া শেষ করে বিল্লালকে নিয়ে আমি কুঞ্জগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার প্রস্তুতি নেই। বিল্লাল একবার বলেই ফেলে, শাওন ভাই আমার আসলে যেতে ইচ্ছা করছে না। পথে আমার দুই একটা লোকের সাথে কথা হয়েছে। ওরা বলতেছে ভুলেও যেনো ওইবাড়ির আশেপাশে না যাই। আজকে সকালে নাকি ওসি সাহেব ওই বাড়ির উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠেছিলো। মাঝারাস্তায় নৌকা উল্টে গেছে। ভয়ে কেউ ওই বাড়ির পাশে যাচ্ছেনা। কয়েকটা বাচ্চা রক্তবমি করেছে। গ্রামের সবাই খুব ভয়ে আছে। কেউ কেউ পালিয়ে যাচ্ছে।

আমি হেসে বললাম, এইসব বানাচ্ছে লোকজন। তুই ব্যাটা এইসব হাবিজাবি জিনিস বিশ্বাস করিস? আমাদের কাজ রিপোর্ট লেখা, রিজভী ভাইয়ের কাছে সাবমিট করে পয়সা নেয়া। এইসব হাবিজাবি কথায় কান দিস না। বিল্লালকে দেখে মনে হলো, সে খুবই অসন্তুষ্ট। আমার জন্যই তাকে বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে।

 

হালিমা নামের সেই ডাইনী মহিলাকে নিয়ে আমার খানিকটা হলেও আগ্রহ জন্মেছিলো। আমার যতদূর মনে হয়েছে মহিলা Satanism চর্চা করে। ১৮ শতকের দিকে Satanism এর অনুসারী অনেক বেড়ে গিয়েছিলো। বিশেষ করে ইউরোপে এমন প্রচুর ভয়ংকর শয়তান পূজারী ছিলো। এরপর ১৯৬৬ সালে অনেকটা সাংবিধানিকভাবে এই চর্চা আবার শুরু হয়। একটা চার্চও তৈরী হয় শয়তানকে প্রভু মেনে। এদের মধ্যে দুটো ভাগ আছে, যারা খোদায় বিশ্বাস করে আর যারা করে না। খোদায় বিশ্বাস করে না যেই দলটা এরা সুযোগ পেলেই মানুষ বলি দেয়। সাতক্ষীরার কুঞ্জগ্রাম নামে এই প্রত্যন্ত অঞ্ছলের হালিমা বেগম কি সেই দলের কেউ। আমার মানতে ইচ্ছা হলো না। তবে ৮ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে অনেক অদ্ভূত ব্যাপার চোখের সামনে ঘটতে দেখেছি যার সবকিছু পাঠককে বলতে চাইলেও বলতে পারছি না। তবে এবার যে কিছু একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা হবে তা বুঝতে পারছিলাম। হোটেল থেকে বের হয়ে দেখি একটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। আমি তার কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই ভালো আছেন?

রিকশাওয়ালা হাহুতাশ করে বললো, ভালা নাই ভাই। করোনা না কী জানি একটা আইছে। মানুষ পাইনা। গাড়িতে মানুষ না উঠলে খামু কি?

আমি মাথা নেড়ে বললাম, তাইলে এক কাজ করেন। আমরা একটু সামনে এক জায়গায় যাবো। কুঞ্জগ্রাম, নিয়া যাবেন?
আমার কথা শুনে রিকশাওয়ালা ভাই আমার দিকে ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, আপনেরা ঢাকাত ত আইছেন না? হালিমা দাইন্নীর বাড়ি। হের বাড়িত আমরা কেউ যাই না। হুনছি আইজকা এক রিস্কাওয়ালা আপনে গো মত একজনরে ওর বাড়িত লইয়া গেছিলো। হেয় আর ফেরত আহে নাই। ওই বুড়ি সবাইরে গিল্লা খায়া ফালায়। আমি নিমু না।

আমি হাত কচলাতে কচলাতে বলি, না ঠিক আছে। আপনি কাছাকাছি নামিয়ে দিয়েন ভাই। সমস্যা নাই। আপনাকে খুশি করে ভাড়া দিবো।
উনি রিকশার প্যাডেলে টান দিতে দিতে বললো, একশো টাকা দিলেও যামু না।

আমি বিল্লালের দিকে একবার তাকাই, একবার রিকশার দিকে। আজকে যদি কুঞ্জগ্রাম যেতে পারি সম্ভাবনা আছে কাল সকালে আমরা ঢাকা পৌছে যাবো।তাই আর চিন্তা না করে বললাম, ভাই একশো না পাচশো টাকা দিবো। চলেন।

 

রিকশার প্যাডেল থেমে গেলো। আমাদের দিকে এসে বললো, উঠেন। ওর বাড়ির পাশ একটা খাল আছে। খালের ওইপারে নামায় দিমু। আপনেগো ঘুইরা হেগগু হাটতে হইবো বিশ মিনিট। তাইলে পৌছায় যাবেন। আর কাছে যাওন যাইবো না।

বিল্লাল আর আমি কথা না বলে উঠে পড়ি। রিকশা করে যখন যাচ্ছিলাম চারদিন কেমন শুনশান হয়ে আছে। আমার সেইসময় প্রথম একটু ভয় লাগা শুরু হলো। কেউ কোথাও নেই। বিল্লালও কেমন ঘাপটি মেরে গেছে। ক্যামেরাটা বুকের কাছে ধরে নিয়ে দোয়া কালাম পড়ছে। একটু পর আমাকে বললো, ভাই কাজটা ঠিক করতেছি বলে মনে হচ্ছে না। জগতে অনেক অশুভ জিনিস আছে। আমরা যারা শহরে থাকি তারা অনেক কিছু টের পাই না, বুঝি না। যে মহিলা নিজের পরিবারের মানুষকে খেয়ে ফেলতে পারে, সে স্বাভাবিক কেউ না ভাই। ভাই এখনও সময় আছে। চলেন ফেরত যাই। আমি বিল্লালের কথা শুনেও না শোনার ভান করি। আবার অরুণিমার কথা ভেবে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি।

 

বিয়ের একবছর পর আমাদের যখন মিমি নামে একটা ছোট্ট পরী হলো তখন থেকে অরুণিমা কেমন যেন বদলে যেতে থাকলো। আমি খুব একগুঁয়ে মানুষ ছিলাম। ওর এই বদলটা মানতে পারছিলাম না। ও সবসময় কেমন যেনো সবকিছু নিয়ে একটা আফসোস করতো। আমি একটা পার্মানেন্ট চাকরীর জন্য হন্য হয়ে এঁকে ওকে অনুরোধ করছি। আমি জানি আমার অল্প আয়ে বাচ্চা নিয়ে ঢাকা শহরে বেঁচে থাকাটা কত কষ্টকর। আমি অরুকে বলতাম, একটু ধৈর্য ধরো। কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। অরু শান্ত থাকতো, মাঝে মাঝে রেগে যেতো। গতবছর যখন মিমিকে ঈদের জামা কিনে দিতে পারলাম না তখন ও আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলো। এরপর একদিন ও আবার চাকরী করা শুরু করলো। চাকরীতে গেলে বাচ্চা কে দেখবে এসব নিয়ে প্রায়দিন তখন ঝগড়া হতো। অবস্থা খুব খারাপ হলো একদিন যখন আমি ওকে তেজগাঁওএ এক লোকের সাথে রিকশায় হাত ধরা অবস্থায় দেখলাম। বাসায় যেয়ে রাতে আমি ওকে বললাম, তোমার সাথে রিকশায় হাত ধরে থাকা লোকটা কে ছিলো অরু?

ও বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলো। আমাকে আমতা আমতা করে বললো, আমার অফিসের কলিগ। এখন কি কলিগের সাথে রিকশায় উঠলেও তোমার সমস্যা হয়? মিমিকে যে প্রতিদিন আমার বোনের বাসায় হাত পা ধরে রাজি করিয়ে রেখে আসতে হচ্ছে এটাতে তোমার সমস্যা হচ্ছেনা?

আমি অরুণিমার পাশে দাঁড়িয়ে বললাম, আমরা কবে এমন হয়ে গেলাম জানি না। তুমি আমাকে নিঃসংকোচে বলতে পারো, ছেড়ে চলে যেতে চাইলে চলে যেতে পারো। সেটাও ভালো। এভাবে প্রতারণার সংসার আমার ভালো লাগে না। তোমার ওই ভদ্রলোকের সাথে কী সম্পর্ক তা আমার জানার দরকার নেই, ইচ্ছাও নেই। তুমি যেকোন সময় ফ্রি টু গো।

অরু রেগে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে বললো, বাচ্চার দুধ কিনার টাকাটা আমার ধার করে আনতে হয় আর তুমি এখন আমাকে সাহিত্যভরা ডায়ালগ দিতে এসেছো। লজ্জা লাগে না? রাতুল আমার সিনিয়র অফিসার। হ্যাঁ উনাকে আমার ভালো লাগে। উনার ব্যক্তিত্বের জন্য ভালো লাগে। সে তোমার মতো অন্য মানুষের কাছে ভিক্ষা করে চলে না। আমাকে এক কাপ চা খাওয়াতে তাকে পকেটে হাত দিয়ে পয়সা গুণতে হয় না। আমার সাথে সে কথা বলে, আমাকে বুঝে। তোমার মতো আমার সাথে না বুঝে ঝগড়া করে না। কথায় কথায় ঘর ছেড়ে দেয়ার কথা বলে না। তোমাকে আমি কেনো বিয়ে করেছি জানি না? আমাকে সারাজীবন এখন মাশুল দিতে হবে এই ভুলের।

 

আমি কিছু না বলে বাসা থেকে বের হয়ে যাই। আর তার পর দিন অরু মিমিকে নিয়ে চলে যায়। আমি দুইদিন যোগাযোগ করার চেষ্টা করে বিফল হয়েছিলাম। এরপর ও একদিন ফোন করে বলে, আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত।

আমি হতাশ কণ্ঠে বললাম, আমি চেষ্টা করছি ভালো কিছু করার। এমন অর্থকষ্ট আর থাকবে না। আরেকবার ভাববে?

ও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো, আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত।

তারপর আমরা আবিষ্কার করলাম, আমরা আসলেই আলাদা দুটো মানুষ। সম্পর্ক, বিয়ে এসব জটিল শব্দে আমরা বাঁধা পড়ে ছিলাম। নিয়মিত আমরা এই বাঁধনের বেড়াজালে ছটফট করেছি। এখন সত্যিই আমাদের মুক্তির সময় হয়ে এসেছে।

 

রিকশাওয়ালা ভাই আমাদের যখন খাল পাড়ে ঘণ্টা দেড়েক পরে নামিয়ে দিলো তখন আমার আর বিল্লালের কেনো যেনো ওদিকে যেতে আর ইচ্ছা করছিলো না। আমি বিল্লালকে বললাম, মহিলার সাথে ঘণ্টাখানেক আলাপ করে আজকে রাতের মধ্যেই ঢাকার দিকে রওনা দিয়ে দিবো। ভয়ের কিছু নেই বিল্লাল। গ্রামের মানুষ অনেক আজাইরা গল্প করে। এইসবে কান দিওনা।

 

কথাগুলো আসলে নিজেকে বলছিলাম। একটু পর মুখে অজানা কারণে মাস্ক লাগিয়ে আস্তে আস্তে খালের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। চারদিকে ভয়ানক অন্ধকার। আমি ভুলে বাসা থেকে টর্চ নেই নি। বিল্লালের কাছে থাকলে এতোক্ষণে ও বের করে ফেলতো। ওকে নিয়ে সামনে হাঁটতে থাকি। পাঁচ মিনিট হাটার পর বিল্লাল থেমে যায়। আমাকে ইশারা করে বলে, ভাই সামনে এইটা কি ভাসে?

আমি কিছু না দেখেই হিমশীতল হয়ে যাই। আগুনের মত একটা কিছু একবার উপরে একবার নিচে নামছে। আমার হাঁটার শক্তি শেষ হয়ে গেলো। ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। বিল্লাল আমার শার্টের খুটো শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর জ্ঞান হলে বুঝলাম এটা আসলে একটা মানুষের সিগারেটের আগুন। সে কাছে এসে বললো, কই যান ভাই। ত্রাণ লইয়া আইছেন।

আমি শান্ত হয়ে বললাম, হালিমা নামে একজন আছেন না , আমরা ঢাকা থেকে  তার সাথে কথা বলতে এসেছি।

লোকটা বললো, ওইহানে ভুল কইরাও যায়েন না। ওই মহিলারে আমাগো হুজুর বন্দক দিয়া আটকায় রাখছে। নাইলে পুরা গ্রাম জ্বালায় দিতো। আপনেরা যান গা। ঢাকায় যায়া কন আমরা কেউ ত্রাণ পাই নাই। অনেকে না খাইয়া গবাদি পশু মাইরা খায়া লাইতাছে। এমনে আর কিছুদিন চললে হবাই না খায়া মইর‍্যা যামু। আপনারা কিছু করেন।

 

আমি লোকটাকে আশ্বাস দিয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সামনে এগোলাম। লোকটা যদিও বারবার নিষেধ করছিলো, কিন্তু তবুও আমি কেনো যেনো থামতে চাইলাম না। বেশ কয়েকটা স্থানীয় পত্রিকায় ইতোমধ্যে এই মহিলাকে নিয়ে লেখালিখি হয়েছে। এই সময়ে এসে এমন একটা উদ্ভট ব্যাপার বেশ পাঠক জনপ্রিয়তা পাবে সেটাই স্বাভাবিক। প্রায় বিশ মিনিট  হাঁটার পর আমরা হালিমা বেগমের বাড়ির কাছে পৌছলাম। বিল্লাল বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বললো, ভাই, জান নিয়ে ফিরে যেতে পারবো তো? আপনি খেয়াল করেছেন এই বাড়ির আশেপাশে একটা মানুষ, পশুপাখি পর্যন্ত নাই! এমনকি একটা জোনাকিও নাই।

আমি কিছু বললাম না। বাড়ির উঠোনের ভেতর ঢুকলাম। একেবারে ভাঙ্গাচোরা একটা বাড়ি। চাঁদের আবছা আলোয় হালকা দেখতে পাচ্ছিলাম সব। কোন মানুষকে দেখতে পেলাম না, আশাও করি নি। দূর থেকে মনে হলো কে যেনো বারবার বলছিলো, পালা। পালা, এক্ষুণি পালা। আমার গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছিলো না। কোনরকমে ডাকলাম, বাড়িতে কেউ আছেন? হালিমা বেগম আছেন?

আমার কথা শুনে পাশের ঘর থেকে একটা আওয়াজ পেলাম। চুল খোলা একটা মহিলা বের হয়ে আসলো। তার চোখ কেমন অদ্ভূতভাবে জ্বলজ্বল করছিলো। এটা দেখে আমার চোখের সামনেই বিল্লাল কলাগাছের মত পড়ে গেলো। আমার জীবনেও আমি কখনো এমন ভয় পাই নি। মহিলার চোখে কিছু একটা ছিলো। তাকানো যায় না বেশিক্ষণ। কোথা থেকে একটা বিশ্রি পচা মাংশের গন্ধ আসছিলো। আমার মনে হচ্ছিলো আমি পড়ে যাচ্ছি। কোনরকমে নিজেকে সামলে মাটিতে বসে পড়লাম। মহিলাটা কাছে এগিয়ে আসলে আমি বুঝতে পারলাম – আমি ভুল করেছি। গ্রাম্য কুসংস্কার ভেবে শহুরে অহংকার অথবা বিজ্ঞানের আভিজাত্য ধারণ করে এখানে আসাটা ভুল হয়েছে। জগতে অশুভ বলে যদি কিছু থাকে, আজকে তা আমার সামনে দাঁড়িয়ে।

মহিলা আমার একদম কাছে এসে খনখনে কণ্ঠে বললো, পানি দিমু?

আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মিনমিন করে বললাম, কী?

মহিলা আবার বললো, পোলাটা মনে হয় ভয় পাইছে। পানি দিমু?

আমি মাথা নেড়ে বললাম, দেন।

মহিলা ভিতরে যেয়ে একটু পর পানি নিয়ে আসলো। আমি বিল্লালের মুখে পানি ছিটাতে ওর জ্ঞান ফিরে আসলো। তারপর আমাকে শক্ত করে ধরে বললো, আপনারে বলছিলাম- না আসতে। আমাদের এখন মেরে ফেলবে ভাই। এক্কেবারে মেরে ফেলবে।

মহিলা একটু দূরে যেয়ে বসে বললো, বাজান আমি কাউরে মারমু না। আমারে একটা উপকার করতে পারবা?

আমার একটু ভয়টা কাটলো। জিজ্ঞাসা করলাম, কী লাগবে?

মহিলা ইতস্তত করে বললো, একটা আগরবাতি আইন্যা দিতে পারবা। মইর‍্যা যাওয়ার আগে একটু দুয়া করমু আমার জামাই আর পোলার লাইগ্যা। ওগো লাশ দিয়া খালি গন্ধ আহে, চাইরদিন ধইরা পইড়া আছে। ওদের কবর দিমু। হেরপর আগরবাতি ধরায়ে একটু মিলাদ পড়মু নিজেই।

আমি হতভম্ব হয়ে বিল্লালের দিকে একবার তাকাই, একবার মহিলার দিকে। তাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনার স্বামী আর বাচ্চা মারা গেলো কিভাবে? গ্রামের লোক বলে আপনি নাকি ওদের মেরে খেয়ে ফেলেছেন?

আমার নিজের কথা শুনে নিজেরই কেমন অবাস্তব লাগছে। কিন্তু মহিলার মধ্যে কোন ভাব অনুভূতি দেখলাম না। আমার দিকে জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে বললো, আমার বাচ্চাটা না জানি কতো কষ্ট পাইতাছে। ওর জন্য আল্লার কাছে দোয়া করমু। পারলে দুইখানা কাফনের কাপড় আইন্যা দিবার পারবা বাজান? গেরামের লোক আমারে বাড়িত থে বাইর হইতে দিতাছেনা। আমার কাছে টেকাও নাই।আমি হালিমা বেগমকে এবার স্বাভাবিক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কি হয়েছে বলেন তো। গ্রামের সবাই কেনো আপনাকে ভয় পাচ্ছে? আপনি নাকি মানুষ মেরে ফেলছেন, নিজের পরিবারের মানুষকে মেরে খেয়ে ফেলেছেন। কী হয়েছে বলেন। আমি তাহলে হয়তো আপনার উপকার করতে পারবো।

 

হালিমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, আমার সোয়ামী ছিলো কবিরাজ। আর আমি ঝাড়ফুক দিতাম। করোনার আগে আমাগোর কাছে অনেক দূরগেরামের লোক আসতো পানি পরা লইতে। দেড় দুই মাস ধইরা কেউ আর আহে না। মাইনসে আগে চাল দিতো, খাইতে দিতো। এহন আর কেউ খাইবার কিছু দেয় না। কুনু ত্রাণও পাই নাই। আমার স্বামী পঙ্গু। হেয় চলবার ফিরবার পারে না। আমি মাঝে মইধ্যে ভিক্কা কইর‍্যা খাবার আইনা দেই।

 

আমার একটা ১৭ বছরের পোলা আছে। ওইটা পতিবন্ধী। কথা কইতে পারে না। ওরা অসুস্থ, কিন্তু ওগো তো মুখ আছে, পেট আছে। কচুরীপানা সিদ্ধ কইর‍্যা খাওয়াইছি, চুরি কইরা খাওয়াইছি। আমারে আগে যারা পীর মানতো, এহন দেখলে খেদায় দেয়। ওগো হাতে পায় ধইর‍্যা খাবার আইনা খাওয়াইছি। কিন্তু দুইহপ্তাহ ধইর‍্যা কেউ খাবার দেয় না। আমার ৬৭ বচ্ছরের সোয়ামী আর বাইচ্চাটা ক্ষুধায় আমারে গাইল পাড়তো। খাইতে দিমু কই থি কও তো বাজান? পাঁচদিন আগে শুক্কুরবার রাগ কইর‍্যা চিন্তা করলাম সব একলগে মইর‍্যা যাই। ওগোরে আমি গলাটিপ্যা মারি ফেলছি। আমি মরবার গেছিলাম। পড়ে মনে হইলো দাফন না হইলে তো দোজখ যামু। এখন অপেক্ষা করতাছি কেউ একখানি সাহাইয্য কইরলে কাফনের কাপড় পড়ায়া ঘরের মদ্ধ্যেই দাফন কইর‍্যা দিমু। বাজান তোমরা তো বড়লোক মানুষ, আমারে একটু সাহায্য করো। তোমাগো লাইগা মরার আগে আমি অনেক দোয়া করমু।আমি বিড়বিড় করে বললাম, আপনাকে সবাই এভাবে ডাইনি বলে কেন? এসব মিথ্যা খবর কেনো বলে?

 

হালিমা বেগম মাথা নেড়ে বলে, ওগো যখন গলা টিপি মারি ফেলছিলাম তহন হয় কেউ দেখি ফেলছিলো। ভাবছে ঝাড়ফুক দেই, এহন জিনে ধইরা ডাইন্নী হয়া গেছি। গেরামের মানুষ খালি মিছা কথা কয়। কেউ কেউ কয় যেন শহর থিকা লোক আমারে দেখবার আসি। তাইলে হয়তো কিছু ত্রাণ পাওয়া যাবি। হেরাও আমার মতন গরীব। এই কুঞ্জগ্রামে জঙ্গলের ধারে কেউ আসবার চায় না বাবা। কেউ আমাগো খাবার মুখি আনি দেয় না।

বিল্লাল ওর পানির বোতলটা হালিমা বেগমকে এগিয়ে দিয়ে বললো, আম্মা পানি খাবেন?

হালিমা বেগম কিছু বলে না। পানির বোতলের দিকে তাকায় থাকে। ৫৫ বছরের মহিলা আমাদের দিকে জুলুজুলু চোখে তাকিয়ে বলে, বুকে অনেক কষ্টরে বাজান। আমার পোলাটার নাম শখ করি রাখছিলাম সালমান। যখন মাইর‍্যা ফেলবার লাগছি তখন আমারে পেটে হাত দিইয়্যা দেকাচ্ছিলো ক্ষুধা লাগছে। আমি বুকে পাত্থর চাপি ওরে মারি ফেলছি। আমার মনে অনেক কষ্ট, কেউ আমাগোরে খাবার দেয় নাই। কত চাইছি এট্টু খাওন আমার পোলাটার লাগি। পোলায় মারা যাবার আগি আমার শাড়ির কুচা ধরি ছিলো। একখান মায়ের কেমুন লাগে পোলারে খাওনের জালায় মারি ফেলতে জানো?

আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো। আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। উনার পাশে বসে বললাম, আম্মা আপনার ছেলে, স্বামী সবার দাফনের  ব্যবস্থা আমি করবো। আপনি চিন্তা করবেন না। ভোর হলেই আমরা ব্যবস্থা করবো। আপনি এখন কিছু খেয়ে নেন। আমাদের কাছে কিছু খাবার আছে।

হালিমা বেগম মাথা নেড়ে বললো, না বাজান। আমি আর খামুনা। এই খাবারের লাগি আমার বাচ্চাটারে মারি ফেলছি, এই খাওন আমার মুখে যাইবো না। আমি মরি যাইবার চাই তাড়াতাড়ি। ওগো জন্যি দুয়া করি আল্লার কাছে যামুগা।

 

সেরাতে অনেক চেষ্টা করেও হালিমা বেগমকে আমরা কিছু খাওয়াতে পারি নি। সকালে গ্রামের বেশ কিছু মানুষকে আমরা বুঝালাম। গ্রামের ঈমাম সাহেবকে সব বললে উনি চোখ মুছে বললেন, ভাইসাহেব। আমি সামান্য গরীব ঈমাম। আমার নিজের শুধু দুপুরে অথবা রাতে একটু করে খাবার জোটে। তাও আমার স্ত্রীকে আমি দিয়ে দেই। আমাদের ছয় মাসের বাচ্চাটা এখনো মায়ের উপর নির্ভরশীল। তাই তার মাকে আগে খাবার খাইতে দেই। চারদিকে বাজার বন্ধ, দোকান বন্ধ। যারা একটু ধনী তারা কেউ শহরে চলি গেছে। যারা আছে তারা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রাখছে, কাউকেই সাহায্য আর দিতে পারছে না। এই ক্ষুধার জ্বালায় আমরা কেউ দেখতেই পারি নাই আমাদের গ্রামের এক পরিবার কী দুরাবস্থার মধ্যে দিন যাপন করছে। জীনে ধরেছে বলে আটকে রেখেছিলাম। আফসোস। আসেন চলেন, আমি নিজেই জানাযা পড়াবো।

 

সন্ধ্যা বেলায় দাফন কাফন সব শেষ হলে আমি হালিমা বেগমকে যেয়ে বললাম, আমাদের সাথে চলেন। আমরা আপনাকে খাওয়া পরার একটা ব্যবস্থা করে দিবো।

হালিমা বেগম মাথা নেড়ে বলে, না বাজান। আমি কোথাও যামু না। হিয়া আমার বাজানের কবর আছি। আমি এখানতন কুথাও যাইতে পারমু না। আমার বাজানরে রাখি গেলে ওয় ভয় পাইবো। প্রতিরাইতে আমার বাজান পাশে শুইয়ে থাকতো। শাড়িখান ধরি হেরপর ঘুমাইতো। আমি যদি এহন এরে রাখি যাইগা, ওয় আর ঘুমাতি পারবো না। আমারে তোমরা ওর সাথে একটু শান্তিত ঘুমাতি দাও।

 

কথাগুলো শুনে আমার খুব ছোটকালে মায়ের জানাযার কথা মনে পড়লো। কবরস্থানে ঈমাম সাহেবের দোয়া পড়া শেষ হলে সবাই যখন আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছিলো আমি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার মামা আমাকে বললেন, শাওন চলো। বাসায় যেয়ে মায়ের জন্য দোয়া করবা।

আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, আমি যাবো না। মা আমাকে ছাড়া একা কান্না করবে। আমি কোথাও যাবোনা।

 

আমাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো, তখন আমি কি ভয়ংকর একটা শূন্যতা অনুভব করেছিলাম। এই শূন্যতা বোঝানোর ভাষা আমার নেই। এই শূন্যতা এক জীবন মানুষকে ঘিরে রাখে। নিজের সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষটাকে কবরে রেখে দূরে চলে যাওয়ার মুহূর্তটার যে কষ্ট এটা আর কোন কিছুর থেকে বড় হতে পারে না। আমি হালিমা বেগমের কষ্টটা বুঝতে পারি। তাই আর কথা বললাম না। বিল্লাল আর আমি গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। চারদিকে শুনশান নীরবতায় একটু পর মাগরিবের আযান শুনতে পেলাম। ইফতারের সময়। আমাদের কাছে অল্প কিছু পানি আর খাবার ছিলো। পথের ধারে বসে খেয়ে আবার রওনা দিলাম। চারদিকে তাকিয়ে দেখি মানুষজন খুব কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। এক ছোট বাচ্চা আমাদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো, এউজ্ঞা খাবার দিবেন?

 

চারদিকে একটা গরম ঝাপসা বাতাস বইছে। সুন্দরবনের নেশা ধরানো একটা বন্য সুবাস কুঞ্জগ্রামের চারদিকে ঘুরঘুর করছে। খেয়াল করলাম, জ্বলজ্বলে কিছু ক্ষুধার্থ চোখ আমাদের দিকে হতাশা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। ঠিক সে সময়ের সেই পবিত্র সন্ধ্যার মিটমিটে নীলচে আলো আঁধারে আমার মনে হলো, আমি,আমরা শুধুই একটা ব্যর্থ পৃথিবীর অংশ।