চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন অধ্যাপক ড. এবিএম আব্দুল্লাহ

প্রকাশিত: ৪:২২ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

চলমান পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন অধ্যাপক ড. এবিএম আব্দুল্লাহ। বলেছেন, করোনা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সরকারকে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে। এভাবে যদি রোগী বাড়তে থাকে তাহলে লকডাউনের সরকারি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত এ চিকিৎসক বলেন, প্রয়োজনে সেনা নামাতে হবে। কারফিউ দিয়ে জনগণকে লকডাউন মানতে বাধ্য করতে হবে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ে (মানবজমিনকে) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ সার্বিক পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বলেন, সরকারের সামনে দুটি প্রশ্ন। একদিকে জীবন অন্যদিকে জীবিকা।
জীবনও বাঁচাতে হবে। জীবিকা নিয়েও ভাবতে হবে। দুটির মধ্যেই ভারসাম্য জরুরি। তিনি বলেন, প্রশাসনের দুর্বলতা আর জনগণের শৈথিল্যতা সবমিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে দেশ।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লকডাউন অনেকদিন চলছে। নিম্নআয়ের মানুষ আর পেরে উঠছে না। সামনে এখন প্রশ্ন জীবন না জীবিকা। ধীরে ধীরে সবমিলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথা হচ্ছে, জীবনই আগে। জীবন না থাকলে জীবিকা দিয়ে কী হবে। আবার জীবিকাও যদি না থাকে তাহলে জীবনও অর্থহীন হয়ে পড়ে। এ দুটোর মধ্যে একটি ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থায় আমাদের যেতে হবে। গত কিছুদিন লকডাউন একেবারেই ঢিলেঢালাভাবে পালিত হচ্ছে। মানুষ একেবারেই মানছে না। সরকার দোকানপাট খুলে দিয়েছে, মসজিদ খুলে দিয়েছে, লকডাউন শিথিল করে দিয়েছে। আর এই শিথিলতার সুযোগে মানুষ রাস্তায় বের হয়ে পড়েছে। দলে দলে মানুষ রাস্তায় বের হয়েছে। ফুটপাথ একেবারেই জমজমাট। ঈদের আগে সবাই মার্কেটে ভিড় করেছে। দোকানে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মানুষ। কোনো শারীরিক দূরত্ব মানুষ মানেনি। গায়ের ওপর গা লাগিয়ে ঠেলাঠেলি করছে মানুষ। কোনো মাস্কও নেই। আমরা বারবার বলছি, এবারের ঈদটা না হয় একটু নিরানন্দই হোক, জাঁকজমকপূর্ণ না হোক। বেঁচে থাকলে ঈদ করা যাবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সবাই ঈদের আনন্দটাকেই বড় করে দেখেছে, জীবনের দিকে তারা তাকাচ্ছেই না। একটা কথা বারবার বলেছি, এবারের ঈদে কেউ বাড়ি যাবেন না। যে যেখানে আছেন সেখানেই ঈদ করেন। সবাই আমরা বিপদে আছি। কে শোনে কার কথা? এতে যা হবার তাই হয়েছে। আগে গ্রামের অবস্থা ভালো ছিলো। এখন ধীরে ধীরে গ্রামের পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। ঢাকার বাইরে আগের চেয়ে রোগী বেড়েছে। লাখ লাখ মানুষ গ্রামে গিয়ে এ রোগের বিস্তার ঘটিয়েছে আবার এই মানুষগুলো ঢাকায় এসে নতুন করে তা ছড়াবে। এতে আমাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ। গত ক’দিনের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রোগী বেড়েই চলেছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে সামনের দিনগুলোতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। সব মিলিয়ে চতুর্দিক থেকে আমরা ঝুঁকির মধ্যে আছি।

কেন এই পরিস্থিতি হলো? শৈথিলত্য আসলে কোথায়?
লকডাউন মানুষকে মানতে বাধ্য করাবে তো পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের মধ্যেও ব্যাপক হারে আক্রান্ত হয়েছে। এতে করে মনে হয়, তারাও ভয় পেয়ে গেছে। কথা হচ্ছে, লকডাউন মানার জন্য মানুষকে শক্তভাবে বলতে হবে। মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করতে হবে। বাজার ভেঙে দিতে হবে। এই কাজগুলো করতে গিয়ে পুলিশও ব্যাপকহারে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের অনেকে আবার মৃত্যুবরণও করেছেন। এই ভয়ের কারণে পুলিশও শৈথিল্য দেখিয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, দায়িত্ব কি কেবলই নিরাপত্তা বাহিনীর বা প্রশাসনের? জনগণেরও দায়িত্ব আছে। তাদেরও বুঝতে হবে, যদি অসুস্থ হই, মরেই যাই, তাহলে কি লাভ? জনগণ কি এটা বোঝে না যে, বাইরে গেলে আমি আক্রান্ত হতে পারি। জনগণ স্বাস্থ্যবিধিও পুরোপুরি মানছে না। জনগণের বিশাল অংশ সচেতন না, তারা নাগরিক দায়িত্ব পালন করছেন না। জনগণ সচেতন না হলে প্রশাসনের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। আবার বাস্তবতার কারণেও অনেকে লকডাউন মানতে পারছেন না। বড় বড় শহরে দেখি, বস্তিতে ভর্তি। গাদাগাদি করে একঘরে অনেকের বাস। সুতরাং, তারা বাস্তবতার কারণেও শারীরিক দূরত্ব মানতে পারছেন না।

আইইডিসিআর বলছে, জুনের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা আরো বাড়বে। লকডাউন কঠিনভাবে না মানলে পরিস্থিতির অবনতি হবে। লকডাউন শিথিল করার ঘোষণা এসেছে। সীমিত আকারে যান চলাচলের কথাও বলা হচ্ছে। অফিস, দোকানপাটও খুলবে। মানুষ চলাচল শুরু করবে। সীমিত আয়ের লোকেরা আর লকডাউন মানছে না। জীবন-জীবিকার স্বার্থে সরকার লকডাউন শিথিল করে পরিস্থিতি দেখছে। কিন্তু যদি আগামী পাঁচ সাতদিনের মধ্যে রোগী বাড়তেই থাকে, মৃত্যুর হার বাড়তেই থাকে তবে লকডাউন নিয়ে হার্ডলাইনে যেতে পারে সরকার। বিভিন্ন মহল থেকেও বলা হচ্ছে, সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বাড়বে। পেছনের অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষ লকডাউন সঠিকভাবে মানছে না। পরিস্থিতি খারাপ হলে সরকারকে সিরিয়াস হতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে সরকারকে কারফিউ দিয়ে লকডাউন মানতে বাধ্য করতে হবে।

সর্বশেষ শুক্রবার একদিনেই ২,৫২৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, ওদিকে অর্ধলাখ ছুঁয়ে যাবে এ সংখ্যা।
করোনার কাছে মানুষ বিপর্যস্ত আর অসহায়। জনগণের একটি বিশাল অংশ ঈদে বাড়ি গেছে। যে-যেভাবে পেরেছে বাড়ি গেছে। গাড়ি বন্ধ বলে অনেকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে পর্যন্ত বাড়ি গেছেন। লাখ লাখ মানুষ বাড়ি গেলো আবার তারা ঢাকায় ফিরবেন। যারা গেলেন এবং ফিরলেন তারা যে সংক্রমণ বাড়াবে না এর গ্যারান্টি কি? গত ক’দিনে আক্রান্তের হার অনেক বেড়েছে। মৃত্যুর হারও বেড়েছে। আমরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছি। বেশিরভাগ মানুষ তার নাগরিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করায় এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানায় নিজেদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। প্রশাসন লকডাউন শিথিল করার সুযোগে জনগণ একেবারেই তা মানছে না। আর এর ফলে আমরা নিজেরাই নিজেদের যেমন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি, পাশাপাশি পুরো দেশকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছি।

সরকার ইতোমধ্যেই সাধারণ ছুটি বাতিল করেছে, অফিস আদালত খুলে দিয়েছে। এটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। যদিও সরকার শুরু থেকেই দেখেছে, লকডাউন মানুষ সঠিকভাবে মানছে না। গত ক’দিনে এই প্রবণতা আরো বেড়েছে। সরকারের সামনে প্রশ্ন এখন দুটি, জীবন ও জীবিকা। জীবনও বাঁচাতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষদের জীবিকা নিয়েও ভাবতে হবে। এই দুই অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে আমাদের চলতে হবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার লকডাউন শিথিল করেছে কিন্তু বারবার বলা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার। পরিবহন ছেড়ে দিচ্ছে। বলা হচ্ছে, দূরত্ব মেনে চলার। এখন জনগণ যদি না মেনে চলে তাহলে আমরা আরো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবো। সরকার চেষ্টা করছে জীবনও যেন বাঁচে আবার জীবিকাও যেনো আসে। সঠিবকভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে আমরা নিজেরাই নিজেদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিবো।

কোভিট-১৯ নিয়ে জাতীয় কারিগরি কমিটির বৈঠকেও সরকারের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানানো হয়েছে, বলা হয়েছে এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি আরো বাড়বে। কথাটি অমূলক নয়। বড় বড় হাসপাতালে কোনো সিট খালি নেই। আইসিইউ খালি নেই। রোগী বেড়েই যাচ্ছে। যদি এভাবে রোগী বাড়তেই থাকে তাহলে তো আমরা বিশাল ঝুঁকির মধ্যেই পড়ে যাবো। শহরের পাশাপাশি এখন গ্রামেও রোগী বাড়ছে। এসব রোগী হাসপাতালে এলেই চিকিৎসা পাবেন এর নিশ্চয়তা তো কেউ দিতে পারছেন না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’ কিছুদিন আগে বলেছে, করোনা পৃথিবীতে একেবারে নির্মূল হবে না। করোনা থাকবে এবং আমাদেরকে করোনার সঙ্গে জীবনবিধি পরিবর্তন করে টিকে থাকতে হবে। সরকার শিথিল করেছে কিন্তু রোগী যদি এভাবে বাড়তে থাকে তবে সরকারি সিদ্ধান্তকে আবারো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রয়োজনে দরকার হলে আবারো কঠোরভাবে লকডাউন দিতে হবে। মানুষ না মানলে দরকার হলে কারফিউ দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী না মানলে, সেনাবাহিনী নামিয়ে কারফিউ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

সার্বিক পরিস্থিতিতে করণীয় কি?
পরীক্ষা আরো বাড়াতে হবে। প্রথমদিকে শুধুমাত্র আইইডিসিআর পরীক্ষা করেছে। বর্তমানে তা বেড়ে ৪৯টি স্থানে হচ্ছে। এটা বাড়িয়ে আরো ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রতিটি জেলায় জেলায় এ পরীক্ষা শুরু করা দরকার। তাহলে প্রকৃত চিত্র বোঝা সম্ভব হবে। প্রায় ২৫ ভাগের আবার কোনো লক্ষণ নেই এটি আরো বিপজ্জনক। তাদের পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ, তারা নিজেদের রোগী না ভেবে চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আপনি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসকও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আপনি কারফিউর কথা বলছেন, এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কি কোনো কথা হয়েছে। জবাবে তিনি বলেন, সরাসরি কথা হয়নি। লকডাউন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ নেই। তবে আমি মিডিয়াতে একথাগুলো বলেছি। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই এ কথাগুলো শুনে থাকবেন, বিবেচনা করবেন। কারণ, সিম্পল লকডাউন মানুষ আর মানবে না। পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকারকে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে, প্রয়োজনে কারফিউ দিতে হবে। লকডাউন মানার জন্য প্রয়োজনে সেনাবাহিনী নামাতে হবে।

মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর-এর মধ্যে প্রথম থেকেই টানাপড়েন লক্ষ্য করা গেছে?
শুরুতে করোনা নিয়ে কারোই ধারণা ছিলো না। এটা যে এতো ভয়াবহ রূপ নেবে। অনেক উন্নত দেশের পরিস্থিতিও খারাপ থেকে আরো খারাপ হচ্ছে। আমেরিকার মতো বিশাল দেশে আক্রান্তের হার এক নম্বরে। সেসব দেশেও পিপিইসহ চিকিৎসক নার্সদের নিরাপত্তা সামগ্রী দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। সেখানেও নার্সরা বিক্ষোভ করেছে। আমেরিকা ইউরোপের মতো উন্নত দেশগুলোও লড়াই করে টিকতে পারছে না। অনেক সীমিত অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ যেটুকু পারছে করছে। আমাদের মূল সমস্যা জনসংখ্যা বেশি, ছোট দেশ। অবশ্যই ঘাটতি রয়েছে। সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, একেক সময় একেক কথা বলা হচ্ছে। কোনোপক্ষকেই দোষারোপ না করে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজগুলো এগিয়ে নিতে হবে।
পরিস্থিতি যেদিকে এগুচ্ছে এখন কি সে সময়টিও আমরা পেরিয়ে এসেছে বলে মনে করেন?
সময় তো আর শেষ হয় না। অতীত নিয়ে ভেবে লাভ নেই। সামনে আরো কঠোর হতে হবে। করোনা কতদিন থাকবে এটা আমাদের চিন্তার মধ্যে ছিল না। প্রশাসনের দুর্বলতা, জনগণের শৈথিল্যতা সবমিলে আক্রান্তের হার বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার বা প্রশাসন যদি শৈথিল্য দেখায় তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

সূত্র – মানবজমিন।