ক্ষমার মহত্ব ও ক্ষমার দৃষ্টান্ত

প্রকাশিত: ৩:৫২ পূর্বাহ্ণ, জুন ১১, ২০২০

লিখেছেন-তুহিন মাহমুদ ।

আপন মানুষের ষড়যন্ত্র বড়ই কঠিন, তাদের দেয়া আঘাত অত্যন্ত ভয়াবহ । কেননা তারা আপনার দুর্বলতা সম্পর্কে খুব ওয়াকিফহাল। তারা দুর্বলতা বুঝে এমন আঘাত করে যা হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে, যা কখনো ভোলার নয়।

পয়গম্বরদের ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ আম্বিয়ায়ে কেরাম তাঁদের জাতির বা কওমের লোকদের থেকে বিভিন্নভাবে কষ্ট পেয়েছেন এবং ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। তবে আপন লোকদের থেকে সবাই কষ্ট পাননি।

২জন নবী আপন মানুষদের থেকে খুব কষ্ট পেয়েছেন এবং ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে, আল্লাহ তায়ালা উনাদের দুজনকেই ষড়যন্ত্রকারীদের উপর প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন এবং তাদের উপর এক ঐতিহাসিক বিজয় দান করেছেন।

একজন হলেন হযরত ইউসুফ আলাইহিসসালাম। তিনি আপন মানুষদের এমন এক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন যা পয়গম্বরদের ইতিহাসে বিরল।

ইউসুফ আলাইহিসসালামকে নিয়ে কেইস স্টাডি করলে দেখা যায়, তিনি যে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন তা ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টা নেই।

ভাইয়েরা মিলে ছোট ভাই ইউসুফ আলাইহিসসালামকে হত্যা করতে চাইলো। শেষ পর্যন্ত কূপে ফেলে দিলো। এই নির্মমতা তো প্রতিবেশী বা জাতির অন্য লোকেরা করেনি, করেছে নিজের ঘরের লোকেরা।

ফলে কি হয়েছে জানেন?

আল্লাহ তায়ালার হেকমত দেখেন,

ভাইয়েরা উনাকে কূপে ফেলে দিলো কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় মিশরীয়রা উনাকে কূপ থেকে তুলে নিয়ে রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে দিলেন এবং তিনি মিশরীয়দের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন।

আরেকটা জিনিস লক্ষণীয়,

আল্লাহ তায়ালা ইউসুফ আলাইহিসসালাম এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ সন্তানের বাবাকে সন্তান হারানোর কান্না থেকে বাচিঁয়েছেন।

এটা আল্লাহর বিশেষ প্লান ছিলো। কারণ, তৎকালীন যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিলো, তার ভয়াবহতা থেকে বাচার জন্য খাবার সংরক্ষণ ও অর্থনীতিতে সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার মতো ইউসুফ আলাইহিসসালাম এর মত দ্বিতীয়জন ছিলো না। কেননা আল্লাহ তায়ালা উনাকে সেই জ্ঞান দিয়েছেন। আর সেই সময় যদি সঠিক পদক্ষেপ নেয়া না হতো তাহলে অসংখ্য মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে না খেয়ে মারা যেতো। দুর্ভিক্ষের প্রথম প্রভাব বা ধাক্কা পরিলক্ষিত হতো শিশুদের উপর। না খেয়ে মরতে হতো লক্ষ লক্ষ শিশুকে। ফলে, লক্ষ সন্তানের বাবাকে চোখের পানি ফেলতে হতো।

কিন্তু মনে হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা লক্ষ লক্ষ পিতার চোখের পানি একজন পিতা অর্থাৎ ইউসুফ আলাইহিসসালামের পিতা ইয়াকুব আলাইহিসসালামকেই দিয়েছেন। আর ইয়াকুব আলাইহিসসালামও উত্তম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি আদরের মানিক ইউসুফ আলাইহিসসালামকে হারিয়ে ৩৭বছর (মতান্তর)একাই কেঁদেছেন।

সর্বশেষ, আল্লাহ তায়ালা ষড়যন্ত্রকারী ভাইদের উপর ইউসুফ আলাইহিসসালামকে বিশেষ মর্যাদা দান করলেন এবং বাবার কাছে সন্তানকে ফিরিয়ে দিলেন। যে ভাইয়েরা ষড়যন্ত্র করে উনাকে কূপে ফেলেছে সে ভাইদেরকে ইউসুফ আলাইহিসসালাম বলেন, “তোমাদের বেপারে আজ আর আমার কোন অভিযোগ নেই”। তিনি ভাইদের ক্ষমা করে দেন। সুবহানআল্লাহ!

বলা দরকার, পয়গম্বরদের মধ্যে ইউসুফ আলাইহিসসালাম একমাত্র পয়গম্বর যাকে লোকেরা ঠাট্টা-মশকরার পাত্র বানায়নি। মিশরীয়দের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার সময় উনার সাথে কেউ ঠাট্টা-মশকরা করে নি। অন্য পয়গম্বরেরা যখন লোকদের দ্বীনের দাওয়াত দিতো তখন তাদেরকে নিয়ে মানুষেরা ঠাট্টা মশকরা করত। এটা ছিলো মানুষের স্বভাব। কিন্তু ইউসুফ আলাইহিসসালামের ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। কেউ উনার কথা না মানতে চাইলেও উনার সামনে মন্দ কিছু বলেনি। কেননা, অর্থনীতিতে উনার অবদান মিশরবাসী স্বচক্ষে দেখেছে।

আর দ্বিতীয়জন হল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিসসালাম যার সাথে আপন-পর সবাই শত্রুতা করেছে। যেমনভাবে নির্যাতিত ও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন আপন  আত্নীয়দের কাছ থেকে, আবু লাহাব ছিল অন্যতম, তেমনিভাবে তিনি অত্যাচারিত ও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন নিজের বংশ ও মক্কার অন্যান্য লোকদের থেকেও।

উনার আদরের সন্তান ‘ইবরাহীম’ যেদিন মারা গেলো, সেদিন তিনি ছিলেন শোকে শোকার্ত কিন্তু উনার আপন চাচা-চাচি উনাকে ‘নির্বংশ’ বলে গালি দিচ্ছে, এছাড়াও বিভিন্ন কটুকথা বলে যাচ্ছে, তিনি প্রতিউত্তরে কিছুই বলেন নি।

এছাড়া মক্কাবাসী উনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে এমনকি হত্যা করতে চেয়েছে। তাই আল্লাহ আদেশ করেছেন মক্কা ছেড়ে চলে যেতে। সেখানেও মক্কাবাসী পিছু নিয়েছেন হত্যা করার জন্য। খুঁজে পেলেই হত্যা করে ফেলতো।আল্লাহর ইচ্ছায় গুহার কাছে গিয়েও খুঁজে পায় নি।

মক্কাবাসী প্রত্যাখ্যান করলেও মদিনাবাসি ঠিকই উনাকে রাষ্ট্র নায়কের মর্যাদা দিয়েছেন।

এবং পরবর্তীতে আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি মক্কা বিজয় করেছেন। নিজের জন্মভূমিতে ফিরেছেন বিজয়ীবেশে। যারা উনার সাথে শত্রুতা করেছে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে উনার সম্মুখে পরাজিত করেছেন। তাদের দম্ভ চুর্ণ করে দিয়েছেন। অনেককে করেছেন নির্বংশ।

মক্কাবাসীর উপর যে কোন ধরনের প্রতিশোধ  নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিলো কিন্তু তিনি তা করেননি।

বরং নিজের জন্মভূমির লোকদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। তাদেরকে ক্ষমা করেছেন যারা উনাকে দিন-রাত কষ্ট দিয়েছে, যারা হত্যা করতে চেয়েছে, যারা শুধু মক্কাতে নয় বরং মক্কা থেকে মদীনাতে গিয়েও উনাকে নিশ্চিহ্ন করবে বলে বদরে, উহুদে যুদ্ধ করেছে। এবং অন্যান্য গোত্রের সাথে চুক্তি করে সবাইকে সাথে নিয়ে বিশাল বাহিনী তৈরি করে একেবারে নির্মূল করতে মদীনা গিয়েছে, যা ইতিহাসে খন্দকের যুদ্ধ নামে পরিচিত। অর্থাৎ, উনি যাদের সাথে শৈশব-কৈশর, যৌবন কাটিয়েছেন সেই মক্কাবাসী উনাকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য কি-না করেছে? উনাকে মক্কায় হজ্ব পালন করতে আসতে দেয় নি। মক্কার কাছ থেকে অর্থাৎ হুদায়বিয়া থেকে ফেরত পাঠিয়েছে। এসব করেছে উনার পরিচিত লোকেরা, বংশের লোকেরা যাদের সাথে ৫০ বছরেরো বেশি সময় কাটিয়েছেন। তাদের তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ।

ইতিহাসে এ ক্ষমার চেয়ে বড় নিদর্শন আর নেই!

সুতরাং, সঠিক থাকার পরও যদি আপন-পর মানুষ কষ্ট দেয়, তবে ধৈর্য ধরতে হবে এবং আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখতে হবে যে, তাদের উপর একদিন বিজয় আসবেই। তাদের দম্ভ চুর্ণ হবেই। তাদের কৌশল আল্লাহর কৌশলের কাছে পরাজিত হবেই। কেননা, আল্লাহ উত্তম কৌশল অবলম্বনকারী।