কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাস (১ম পর্ব)  

প্রকাশিত: ৫:০৫ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

“কুরআন সংরক্ষণের ইতিহাস ” বিষয়ে প্রথমেই যে প্রশ্নগুলো উঠে আসে সেগুলো হল- রাসূল (সা.) এর যুগে ও তৎপরবর্তী যুগে কিভাবে কুরআন সংররক্ষণ করা হয়েছে? তা কীভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে? এ চেষ্টা-প্রচেষ্টা কতটি পর্যায় অতিক্রম করেছে ইত্যাদি৷

এ সকল প্রশ্নকে সামনে রেখে কিছু পর্যালোচনা করা হবে৷ সেই সাথে অমুসলিম ও ধর্মচ্যুত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে কুরআন সংরক্ষণ বিষয়ে যে সব সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয় সেগুলোরও পরিপূর্ণ যুক্তিযুক্ত জবাব দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ……।

• রাসূল (সা.)- এর যুগে কুরআন সংরক্ষণ

কুরআনে কারীম যেহেতু একসাথে অবতীর্ণ হয়নি বরং বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনমতো অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয়েছে তাই নববী যুগে কুরআনে কারীমকে গ্রন্থাকারে একত্রে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। আর এই লিপিবদ্ধকরণ তেমন প্রয়োজনীয় ছিলোও না৷ কারম আল্লাহ তা’আলা অন্যান্য আসমানী কিতাবের মুকাবিলায় কুরআনে কারীমে এ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন যে, এ কিতাবকে কাগজ-কলম দ্বারা যতটুকু সংরক্ষণ করেছেন তার চেয়ে বেশি সংরক্ষণ করেছেন হাফেজে কুরআনদের বক্ষ দ্বারা।

যেমন সহীহ মুসলিম শরীফে উল্লেখ রয়েছে, রাসূল (সা.)- কে লক্ষ করে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

و منزل عليك كتابا لا يغسله الماء

“আমি তোমার উপর এমন কিতাব নাযিল করেছি, পানি যাকে ধুয়ে মিটিয়ে দিতে পারবে না”৷

সারকথা হলো পার্থিব সাধারণ বই-পুস্তক সংরক্ষণজনিত অসুবিধার কারণে বিনষ্ট হয়ে যায়। যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানী সহীফাগুলো সেভাবেই বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু কুরআনে কারীমকে এমনভাবে বক্ষাভ্যন্তরে সংরক্ষণ করা হচ্ছে যে, তা বিনষ্ট হওয়ার কোন অবকাশ নেই।

এ কুদরতী ফায়সালার কারণেই ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই কুরআনে কারীম সংরক্ষণার্থে মুখস্থ করার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া হত। প্রথম প্রথম যখনই ওহী নাযিল হত, তখন রাসূল সা. নিজেই এর শব্দগুলোকে বার বার উচ্চারণ করতেন, যাতে তা ভালভাবে স্মৃতিস্থ হয়ে যায়। এ প্রসংগে এ আয়াত নাযিল হয়ঃ

لا تحرك به لسانك لتعجل به -إن علينا جمعه و قرآنه -(القيامة١٦/١٧

“তাড়াতাড়ি শিখে নেওয়ার জন্য আপনি ওহী আবৃত্তি করবেন না। এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমারই দায়িত্ব “। এ আয়াতে সুস্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে যে, ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময় কুরআন কারীম স্মৃতিস্থ করার জন্য রাসূল (সা.) এর বার বার শব্দ উচ্চারণ করার কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহ স্বয়ং রাসূল (সা.) এর মাঝে এমন তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তি সৃষ্টি করে দিবেন- একবার ওহী অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি সেটাকে আর ভুলবেন না। এমনকি অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়াল যে, একদিকে তার উপর কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হচ্ছে, অন্যদিকে তা তার স্মৃতিস্থ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে নবী করীম (সা.) এর পবিত্র বক্ষ কুরআনে কারীমের এমন সুরক্ষিত ভান্ডারে পরিণত হয় তন্মধ্যে সামান্যতম সংযোগ-বিয়োগ কিংবা ভুল-চুক হওয়ার কোন আশংকা ছিল না।

এরপরও অধিকতর সাবধানতার খাতিরে প্রতিবছর রমযান মাসে হযরত জিবারঈল (আ.)- কে কুরআনে কারীম শুনাতেন, হযরত জিবরাঈল (আ.) থেকেও তা শুনে নিতেন। তার ইন্তেকালের বছর রমযানে তিনি দু’দুবার হযরত জিবরাঈল (আ.)কে শোনান এবং জিবরাঈল (আ.) থেকেও শোনেন।

হযরত রাসূলে কারীম (সা.) সাহাবায়ে কিরামকে কুরআনে কারীমের শুধু মর্মার্থই শিক্ষা দিতেন না। বরং তাদেরকে কুরআনের শব্দও স্মৃতিস্থ করাতেন।

সাহাবায়ে কিরামের মধ্যেও কুরআনে কারীম আত্মস্থ করা ও মর্মার্থ শিক্ষা করার জন্য এমন প্রবল আগ্রহ ছিল যে, প্রত্যেকেই এ ব্যাপারে অন্যকে ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করতেন। এমনকি মহিলারা পর্যন্ত বিবাহের মোহরানার বিনিময়ে কুরআনে কারীমের তা’লীম দেওয়ার দাবী পেশ করতেন। শত শত সাহাবায়ে কিরাম সব কিছু ছেড়ে শুধুমাত্র কুরআনের তা’লীম গ্রহণ করার সাধনাতেই তাদের জীবন ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। তারা কুরআনে কারীম শুধুমাত্র মুখস্থই করতেন না, নিয়মিত রাত জেগে নফল নামাযে তেলাওয়াতও করতেন। হযরত ওবাদা ইবনে সামিত (রা.) বর্ণনা করেন যে, মক্কা থেকে কেউ হিজরত করে মদীনা এলেই তাকে কুরআনে কারীমের তা’লীম গ্রহণ করার উদ্দেশে কোন একজন আনসার সাহাবীর সাথে যুক্ত করে দেওয়া হত। মসজিদে নববীতে সর্বক্ষণ কুরআন শিক্ষাদান ও তিলাওয়াতের শব্দ এমনভাবে বেড়ে গিয়েছিলো যে শেষ পর্যন্ত হুজুর (সা.)- কে নির্দেশ প্রদান করতে হয়েছে যে, সবাই যেন আরো ধীরে ধীরে কুরআন পাঠ করেন যাতে পরস্পরের তিলাওয়াতের মাঝে দ্বন্দ্ব না হয়।

এসব বর্ণনা থেকে কুরআন নিয়ে সাহাবায়ে কেরাম কীভাবে দিনরাত পড়ে থাকতেন তার কিঞ্চিৎ ধারণা পাওয়া যায়৷ আর অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী কেউ যদি কোনো বই নিয়ে পড়ে থাকে, সেই বই কতটা মজবুতভাবে তার স্মৃতিপটে বসে যাবে তা সহজেই অনুমেয়৷

আজকের পর্বে এ পর্যন্তই৷ আগামি পর্ব শুরু হবে ইনশাআল্লাহ আরবদের অসাধারণ স্মৃতিশক্তি সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে৷ (চলবে)