কুরআনে কারীমের আয়াত সংখ্যা আসলে কত?

প্রকাশিত: ৬:১৬ অপরাহ্ণ, মে ২৯, ২০২০

লিখেছেন জাহিদ জাওয়াদ

কুরআনে কারীমে সূরার সংখ্যা মোট একশত চৌদ্দটি। আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে এভাবে নাযিল করেননি যে পুরোটা মিলে একটি বক্তব্য। বরং পুরো কুরআনকে বিভিন্ন সূরায় আর সূরাগুলোকে আয়াতে আয়াতে ভাগ করেছেন। তাই কুরআন শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অপরিহার্য অংশ হল, ছাত্র শিক্ষকের কাছ থেকে আয়াতের সূচনা ও সমাপ্তি জেনে নিবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সাহাবায়ে কেরামকে কুরআন তেলাওয়াত শেখাতেন তখন তাদের এটাও শেখাতেন- আয়াতটি কোত্থেকে শুরু হয়েছে এবং কোথায় শেষ হয়েছে। এমনিভাবে সাহাবায়ে কেরাম যখন তাবেয়ীদের এবং তাবেয়ীগণ যখন তাবে-তাবেয়ীনদের কুরআন শেখাতেন তখন আয়াতের সূচনা ও শেষ কোথায় তাও তাদের শেখাতেন।
এটি “ইলমু আদাদি আয়াতিল কুরআন” নামে পরিচিত৷ এবং ইলমুল কেরাআতের একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র।

• আয়াত-গণনা শাস্ত্রের কেন্দ্রসমূহঃ

উম্মতে মুসলিমার স্বর্ণযুগে বড় বড় ইসলামী শহরগুলো বিভিন্ন ইসলামী শাস্ত্র চর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। কোন শহরে এক শাস্ত্রের চর্চা বেশি হতো আবার অন্য শহরে আরেক শাস্ত্র বেশি চর্চা হতো।

ইলমুল কেরাআতের চর্চায় সবচেয়ে অগ্রগামী ছিল ঐ শহরগুলো যেগুলোতে হযরত উসমান রা. তেলাওয়াতে কুরআন, ইলমে কেরাআত ও ইলমে তাজবীদে পারদর্শী উস্তাদসহ এক কপি করে “আলমুসহাফুল ইমাম” পাঠিয়েছিলেন।

বিশুদ্ধ মতানুসারে এ শহরগুলো হচ্ছে মক্কা, শাম, বসরা, কুফা। এছাড়া এক কপি মদীনার জন্য আরেক কপি নিজের জন্য রেখেছিলেন।

ইলমে কেরাআত ও তাজবীদের সকল শাখার বড় বড় ইমামগণ এই শহরসমূহেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। “ইলমু আদাদি আয়াতিল কুরআন” এর চর্চাও এই শহরসমূহেই বেশি হয়েছিল৷ তাই আয়াত গণনার কেন্দ্র হিসেবে এই পাঁচটি শহরই বেশি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এর বাইরে হিমসী গণনা বলে একটি গণনা পদ্ধতি আছে তবে সেটি বেশি প্রসিদ্ধ নয়।

মদীনার ক্বারীদের মাঝে দুটি গণনা প্রচলিত ছিল। একটির নাম (المدني الأول) বা প্রথম মাদানী গণনা। অপরটির নাম (المدني الثاني) বা দ্বিতীয় মাদানী গণনা। তো পাঁচ শহরে মোট ছয়টি গণনা স্বীকৃত ছিল। এগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরছি।

• আয়াত গণনার স্বীকৃত ছয় পদ্ধতি

১. প্রথম মাদানী গণনাঃ

কুফাবাসী এই গণনা পদ্ধতি মদীনাবাসীদের বরাতে বর্ণনা করেন। নির্দিষ্ট কারো নাম না নিয়ে কেবল “আহলে মদীনা থেকে”- এই পদ্ধতিতে। এর দ্বারা স্পষ্ট যে, আহলে মদীনার অনেক ক্বারীর মাযহাব ছিল এটি (তাই আর আলাদা করে নাম উল্লেখ করা হয়নি)৷ বিখ্যাত সাত রাবীর অন্যতম ইমাম নাফে এই গণনার রাবী। এই গণনা পদ্ধতি অনুসারে কুরআন মাজীদের মোট আয়াত সংখ্যা ৬২১৭টি।

২. দ্বিতীয় মাদানী গণনাঃ

এই গণনা পদ্ধতির ভিত্তি আবু জাফর ইয়াযীদ বিন কা’কা'(র) ও শাইবা বিন নিসাহ রহ.। তাঁদের থেকে সুলাইমান বিন মুসলিমের সূত্রে বর্ণনা করেন ইসমাইল বিন জাফর রহ.৷ এই গণনা পদ্ধতিতে আবু জাফর ও শাইবার মাঝে ছয় জায়গায় ইখতেলাফ আছে। তাই শাইবার বর্ণনায় দ্বিতীয় মাদানী গণনায় আয়াত সংখ্যা ৬২১৪ আর আবু জাফরের বর্ণনায় ৬২১০।

৩. মক্কী গণনাঃ

এই গণনা পদ্ধতির ভিত্তি হলেন আবদুল্লাহ বিন কাসীর মক্কী রহ.৷ যিনি প্রসিদ্ধ সাত ক্বারীর অন্যতম। মক্কী রহ. এর গণনা অনুসারে মোট আয়াত সংখ্যা ৬২১৯টি।

৪. শামী গণনাঃ

এই গণনা পদ্ধতির ভিত্তি হলেন আবদুল্লাহ বিন আমের৷ ইয়াহসাবী রহ.এর শাগরেদ ইয়াহইয়া বিন হারেস আযযিমারী।এই গণনা অনুসারে মোট আয়াত সংখ্যা ৬২২৬টি।

৫. বসরী গণনাঃ

এ গণনা পদ্ধতির কেন্দ্রীয় রাবী বা বর্ণনাকারী হলেন আইয়ুব বিন মুতাওয়াক্কিল ও আসেম আলজাহদারী। উভয়েই বসরার বড় ইমাম ছিলেন। বসরী গণনায় মোট আয়াত সংখ্যা ৬২০৪টি।

৬. কুফী গণনাঃ

কুফী গণনার কেন্দ্রীয় বর্ণনাকারী হলেন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী আবু আব্দুর রহমান আসসুলামী। এই গণনায় কুরআনের মোট আয়াত সংখ্যা ৬২৩৬টি।

কুফী গণনা আগেও প্রসিদ্ধ ছিল, এখনও গোটা ইসলামী বিশ্বে অধিকাংশ মুসহাফ (কুরআনের কপি) এই গণনা মোতাবেকই প্রকাশিত হয়।

শুধু তাই নয় সাত কেরাতের অন্যতম রাবী আসেম কুফীর কেরাআতওয়ালা মুসহাফ তো বটেই, অন্যান্য কেরাআতের মুসহাফও কুফী গণনা অনুসারে ছাপানো হয়। কারণ আয়াত গণনার ভিন্নতা আর কেরাআতের ভিন্নতা সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় এবং উভয় ইখতেলাফের কোনটিই আয়াত সংখ্যা কম-বেশি হওয়ার ইখতেলাফ নয়।

• আয়াত সংখ্যা সম্পর্কে দুটি ভিত্তিহীন বক্তব্যঃ

যুগ পরম্পরায় পূর্বসূরিদের থেকে প্রাপ্ত ও সর্বজন স্বীকৃত গণনা পদ্ধতির বাইরে আমাদের উপমহাদেশে আরো দুটি সংখ্যা প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে। একটি হল ৬৬১৬, অপরটি ৬৬৬৬।

এই দুটি সংখ্যাই ভিত্তিহীন৷ বাস্তবতার সাথে এগুলোর
কোন সম্পর্ক নেই। কেননা ইলমুল কেরাআতের কোন ইমাম থেকে এ সংখ্যা বর্ণিত নয় বরং এটা তাদের মতের বিপরীত এবং এ সংখ্যা দুটির কোনো ধরণের সনদ নেই।

এখন কারো মনে এই প্রশ্ন জাগতে পারে- কুরআনে কারীম তো যেকোনো ধরনের সংযোজন-বিয়োজনের ঊর্ধ্বে। তাহলে কোনো বর্ণনায় আয়াত সংখ্যা একটু বেশি, কোনো বর্ণনায় কম; এর অর্থটা আসলে কী?

এর উত্তর হলো, আয়াত সংখ্যার যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে সেটির সম্পর্ক হ্রাস-বৃদ্ধির সাথে নয়। এটি মূলত আয়াত সংখ্যা গণনার পদ্ধতিগত পার্থক্য। পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ার কারণে সংখ্যায় কম বেশি হয় কিন্তু আয়াত কমবেশি হয় না। উদাহরণ দিলে বিষয়টি সহজে বোঝা যাবে। সূরা ইখলাস এর আয়াত গুলো দেখুন-

قُلۡ ہُوَ اللّٰہُ اَحَدٌ ۚ﴿۱﴾ اَللّٰہُ الصَّمَدُ ۚ﴿۲﴾ لَمۡ یَلِدۡ ۬ۙ وَ لَمۡ یُوۡلَدۡ ۙ﴿۳﴾ وَ لَمۡ یَکُنۡ لَّہٗ کُفُوًا اَحَدٌ﴿۴

আমরা দেখছি সূরা ইখলাছ-এ মোট চার আয়াত। কুফী গণনা, বসরী গণনা, মাদানী গণনা- তিনটাতেই সূরা ইখলাসের মোট আয়াত সংখ্যা চার। কিন্তু মক্কী ও শামী গণনা অনুযায়ী সূরা ইখলাস এর মোট আয়াত সংখ্যা পাঁচ। সেটা এভাবে যে,

قُلۡ ہُوَ اللّٰہُ اَحَدٌ ۚ﴿۱﴾اَللّٰہُ الصَّمَدُ ۚ﴿۲﴾لَمۡ یَلِدۡ ۬ۙ (۳) وَ لَمۡ یُوۡلَدۡ ۙ﴿٤﴾وَ لَمۡ یَکُنۡ لَّہٗ کُفُوًا اَحَدٌ﴿٥﴾

উভয় গণনা অনুসারে সূরা ইখলাস সম্পূর্ণ এক। শব্দ তো বটেই একটি অক্ষরেরও পার্থক্য নেই। কিন্তু এক গণনায় তার মোট আয়াত সংখ্যা চার। আর অন্য গণনায় মোট আয়াত সংখ্যা পাঁচ৷ কারণ একদল তৃতীয় আয়াতের দুটি বাক্যের মাঝে ওয়াকফ ধরেছে৷ আরেকদল ধরেনি৷ এরকম উদাহরণ আরো রয়েছে। আজকের মতো এখানেই শেষ করছি৷

(মাসিক আল কাউসার, কুরআনুল কারীম সংখ্যায় হযরত মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব হাফিযাহুল্লাহুর প্রবন্ধ অবলম্বনে)