কালোজাদু ও সাদা চামড়ার ‘কৃষ্ণাঙ্গ’দের অভিশপ্ত জীবন (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ১০:২২ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

লিখেছেনঃ তরিকুল ইসলাম

 

আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গরাও আছেন। এবি ডিভিলিয়ার্স কিংবা ব্রেন্ডন টেলরদের মতো আফ্রিকান শ্বেতাঙ্গদের কে না চেনেন। কিন্তু সাদা চামড়ার কৃষ্ণাঙ্গ! এও কি সম্ভব? হ্যাঁ, খানিকটা কাঁঠালের আমসত্বের মতো শোনাচ্ছে বৈকি। তবে এক অর্থে তেমন কিছুই কিন্তু অস্তিমান এই বিচিত্র বাস্তবতায়।

 

ধবধবে সাদা গায়ের রঙ, চুল এমনকি চোখের পাপড়িও সাদা, পিটপিট করে তাকায়, কেউ বা হাতে সাদাছড়ি নিয়ে চলে। কোনো না কোনো সময় এ ধরনের ব্যতিক্রমী মানুষ হয়ত পাঠকদের কারো চোখেও পড়েছে। আদতে এটি একটি রোগ। নাম আলবিনিজম। এ রোগে আক্রান্তদের বলে আলবিনো। এ রোগের দরুন দেহে মেলানিন নামক একধরনের রঞ্জকের তৈরি ব্যহত হয়। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন এরা, প্রতি ১৭,০০০ থেকে ২০,০০০ জনে একজন। তবে আফ্রিকায় এই হার ৫০০০ থেকে ১৫,০০০ জনে একজন। আফ্রিকান আলবিনোরাই আজকের লেখার ‘সাদা চামড়ার কৃষ্ণাঙ্গ’।

 

যে মেলানিন সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে আমাদের সুরক্ষা দেয়, যে অতিবেগুনি রশ্মিকে ধরা হয় জীবনঘাতী ক্যান্সারের অন্যতম কারণ, সেই মেলানিনই প্রায় অনুপস্থিত আলবিনোদের দেহে। দেড় ডলারের কমে যেখানে ৮০ ভাগ আফ্রিকানের দিন গুজরান হয়, সেখানে ইউরোপিয়ান আলবিনোদের মতো ১০-১৫ ডলারের সানস্ক্রিন ক্রিম মেখে বাইরে বেরোনোর সৌভাগ্য এদের হয় না। ৯০% আফ্রিকান আলবিনো তাই ৪০ বছরের বেশি বাঁচেনও না। সারা পৃথিবীতে আলবিনোদের শত্রু সূর্য। কিন্তু আফ্রিকার আলবিনোদের অতিরিক্ত একটি শত্রু রয়েছে- শিকারি। এই শিকারিদের কাছে প্রাণ না হারাবার প্রার্থনাতে তটস্থ থাকেন আলবিনোরা।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

নিশ্চয়ই ভাবছেন মানুষ শিকার করে, এমন শিকারিও হয় নাকি? হ্যাঁ, হয়। গন্ডারের শিং, হাতির দাঁত, তক্ষকের চামড়া ইত্যাদির মতো আলবিনোদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও নিষিদ্ধ বাজারে বিকোয়। তাই বনে যেমন পশু শিকার হয়, তেমনি বাসা বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে বা চলার পথে দিনে-দুপুরে তুলে নিয়ে গিয়ে শিকার করা হয় আলবিনোদের। খোলাসা করা যাক ব্যাপারটি।

 

কুসংস্কারাবিষ্ট আফ্রিকায় এখনো মানুষ অর্থবিত্ত, ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কিংবা মনের মানুষকে বশে আনতে সেরা উপায় মনে করে কালোজাদুকেই। তানজানিয়া, মালাউই, মোজাম্বিকসহ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে কালোজাদু ও ডাকিনীবিদ্যা চর্চার একটি অনুষঙ্গ হচ্ছে আলবিনোদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কালোজাদুকর ও তাদের অনুসারীদের বিশ্বাস, আলবিনোদের কাটা অঙ্গে কিছু ভেষজ লাগিয়ে মন্ত্র পড়লেই পূরণ হবে মনোবাঞ্ছা। শুধু কি তা-ই? এইডস সেরে যাবে, এই আশায় কবর থেকে আলবিনোদের লাশ তুলে কাজে লাগানো হয় কালোজাদুতে।

 

ভাগ্যাহত মুরগির বদলে আফ্রিকান কালোজাদুকরদের হাতে ক্বচিৎ আলবিনোর দেহাংশও ‘শোভা’ পায়; Image Source: Lusaka Times

 

তানজানিয়ায় আলবিনোদের ডাকা হয় ‘দিলি’, ভাবার্থ যার ‘টাকা-পয়সা’। কেন এই নাম? হিসেবটা সহজ। যে জিনিস দিয়ে কালোজাদু করলে বড়লোক হওয়া যায়, তার পেছনে স্বাভাবিকভাবেই কোটি টাকার বাণিজ্যও হয়। আলবিনোদের দেহের প্রমাণ সাইজের ছোট একটি টুকরোর দামই ১০-২০ হাজার ডলার। বড়সড় পুরো একটি অঙ্গ প্রায় ৭৫ হাজার ডলার সমমানের। কী বীভৎস! কালোজাদুকরদের কাছে প্রত্যাদেশিত হয়ে অনেকে ভাড়াটে শিকারি দিয়ে হত্যা বা অঙ্গহানির কাজটি করান। আবার অনেক শিকারি নিজ থেকেই ‘শিকার’ করে জাদুকরদের বাজারে কোটি টাকায় আলবিনোদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেচে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দারিদ্র‍্যক্লিষ্ট কিছু দিশেহারা মা-বাবা অবধি নিজ সন্তানকে শিকারির কাছে বিক্রি করেছেন, এমন প্রমাণও আছে।

চলবে…