কালোজাদু ও সাদা চামড়ার ‘কৃষ্ণাঙ্গ’দের অভিশপ্ত জীবন (শেষ পর্ব)

প্রকাশিত: ১:১৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০২০

লিখেছেনঃ তরিকুল ইসলাম

আফ্রিকায় আলবিনোদের সবচেয়ে বড় নরক হলো তানজানিয়া। কেননা দেশটির প্রতি ১৪০০ জনেই একজন আলবিনো! ওদিকে দেশটির ৬০ ভাগ মানুষ বিশ্বাস রাখেন কালোজাদুতে। দেশটির কতিপয় ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, খনি মালিকশ ও জেলে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল হতে দ্বারস্থ হন কালোজাদুকরদের। নির্বাচনের সময় এলে এই তালিকায় নাম লেখান রাজনীতিবিদরাও। আর গবেষণা মতে নির্বাচনের সময়েই আলবিনোদের ওপর আক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়। তানজানিয়ানদের গড় আয় যেখানে মাসিক দেড় লাখ তানজানিয়ান শিলিং, সেখানে আলবিনোদের একটি ক্ষুদ্র দেহাংশের দাম ২ কোটি তানজানিয়ান শিলিং। জাতিসংঘের হিসেব মতে বিগত ১৮ বছরে তানজানিয়ায় ৮০ জন আলবিনোকে হত্যা করা হয়েছে। তবে এ কথা বলবার অপেক্ষা রাখে না যে, দুর্গম আফ্রিকার অপরাধের কৃষ্ণগহ্বর থেকে সবটুকু তথ্য পাওয়া আদৌ সম্ভব নয়।

 

আলবিনিজম আক্রান্ত তিন সদস্যসমেত একটি তানজানিয়ান পরিবার; Image Source: Telegraph

 

রাজধানী দার-এস-সালামের পুলিশ কম্যান্ডার অগাস্টিন সেঙ্গার বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটিত হয় দুর্গম এলাকায়, অপরাধী অতঃপর গা ঢাকা দেয় মহাদুর্গমে, তাই তাদের ধরতে ভালোই বেগ পেতে হয় পুলিশকে। আলবিনো হত্যার দায়ে দেশটিতে সর্বশেষ ২০১৩ সালে ফাঁসি হয়েছে একজনের। অপরাধের ধরন এখন পাল্টেছে। পুরো প্রাণটা না নিয়ে শরীর থেকে দু-একটা অঙ্গ কেটে নিতে স্বচ্ছন্দ  বোধ করছে অনেক শিকারি। ওদিকে অনিরাপদ এলাকাগুলো থেকে আলবিনো পরিবারদের শহরে পুনর্বাসনের কাজ করছে তানজানিয়ার সরকার। অনেক এলাকায় আবার গড়ে উঠেছে আলবিনোদের আশ্রম।

 

উকেরেওয়ে দ্বীপে ৭০ জন তানজানিয়ান আলবিনো মিলে গড়েছেন নয়া বসতি; Image Source: List Verse

 

জনাব সেঙ্গার দাবি অনুযায়ী, অন্তত হত্যা নাকি কমেছে তানজানিয়ায়। তবে মালাউইতে হত্যা থেমে নেই। গত বছর হুইটনি চিলাম্ফা (২) ও হ্যারি মকোশিনি (৯) নামক দুই আলবিনো শিশুকে হত্যা করা হয়। এ বছরও হত্যা করা হয়েছে ফ্লেচার মাসিনা নামে এক আলবিনোকে। গোড়া থেকে হাত-পা তো বটেই, হৃদপিন্ড, কলিজা, ফুসফুস, চোখ, জিহবা, পুরুষাঙ্গ সব কিছুই কেটে নিয়ে যায় ঘাতকেরা। বাড়ির পাশের মাঠে কেবল পড়েছিলো মাসিনার বীভৎস মাথা, পাঁজর আর কতক নাড়িভুঁড়ি। তাকে হত্যা করেছিলো যে গরিব কৃষক, তার ফসল বেচার আয় ছিলো বছরে দুই লাখ মালাউই-কোয়াচা। অথচ হত্যার চুক্তিটি ছিলো ৪ কোটি কোয়াচার! অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ সালের নভেম্বর থেকে বর্তমান অবধি দেশটিতে ২০টি খুনসহ আলবিনোদের ওপর মোট ৬৫টি আক্রমণ নথিবদ্ধ হয়েছে। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির হুকুমে আলবিনোদের জন্য বিদ্যালয়ের বাইরে থাকে বাড়তি পুলিশি নিরাপত্তা।

 

বিদ্যালয়ের বাইরে একঝাঁক আলবিনো শিক্ষার্থী; Image Source: Giving Sight

 

অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশ দক্ষিণ আফ্রিকাতেও ছিটেফোঁটা আছে এই সমস্যা। থান্ডাজাইল এমপুঞ্জি নামের এক কালোজাদুকরের কাছে প্রথমে এসেছিলো দুই তরুণ। বড়লোক হতে চেয়েছিলো তারা। আলবিনো তরুণীর হাত, চামড়া আর যোনী কেটে তাতে জড়িবুটি লাগিয়ে মন্ত্রপাঠ করলেই নাকি হবে কার্যসিদ্ধি। ব্যস, এমপুঞ্জিকে তরুণী হত্যায় সহায়তা করলো ঐ দুই তরুণ। আর বিস্ময়কর হলেও সত্য, প্রাথমিকভাবে মেয়েটিকে অপহরণ করবার কাজে ঐ দুই তরুণকে সাহায্য করেছিলো স্বয়ং তরুণীর প্রেমিক! এ বছরের ফেব্রুয়ারিতেই রায় হয়েছে সেই ঘটনার। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে জাদুকরের। দুই তরুণের ২০ ও প্রেমিকের হয়েছে ১৮ বছরের কারাদণ্ড।

 

আলবিনোদের রক্ষায় এগিয়ে আসবার প্রতীকী আহবান; Image Source: Design Indaba

 

‘আন্ডার দ্য সেইম সান’ নামক এক সংস্থার জরিপমতে ২০১২ সাল থেকে আফ্রিকার ২৯টি দেশে আলবিনোদের ওপর ৫৭০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার ২০৬টিই হত্যা! অবস্থা এতটাই সঙ্গীন যে, গত বছর থেকে কানাডা ও পশ্চিমের কিছু উন্নত দেশে আফ্রিকান আলবিনোদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী পুনর্বাসন সংস্থা। স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়েও আছে ভাবনা। কেনিয়ান আলবিনোদের জন্য দেশটির সরকার দেড় মিলিয়ন ডলারের সান কেয়ার সামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছে। এসব সামগ্রী ব্যবহার না করলে শিকারি বিনাই মারা পড়বে আলবিনোরা, শুধু একটু ধীরলয়ে।

এবার দেখুন দেড় মিনিটের এই ছোট ভিডিওটি।

 

রোগের দরুণ স্বাস্থ্যঝুঁকি আর নিরাপত্তা শঙ্কাই কেবল নয়, আফ্রিকান সমাজে বাঁকা চোখেও দেখা হয় এই আলবিনোদের, যেমনটি দেখানো হয়েছে ভিডিওটিতে। আলবিনোদের অধিকার রক্ষায় ও বৈষম্য দূরীকরণে কাজ করছে স্থানীয় অনেক সামাজিক সংগঠন। জিম্বাবুয়ের সরকার গত অক্টোবরে চালু করেছে ‘বিয়ন্ড দ্য স্কিন’ নামক ক্যাম্পেইন। আলবিনিজম সম্পর্কিত কুসংস্কারের মূলোৎপাটন ও সর্বপ্রকার বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলাই যার লক্ষ্য। স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুযায়ী, আলবিনিজমে আক্রান্তরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তির হয়। কিন্তু তারাই বা কতটুকু সুস্থ-স্বাভাবিক দৃষ্টিসম্পন্ন, যারা বর্ণ-ধর্ম-গায়ের রঙ ইত্যাদির ধাঁধায় ‘মানুষ’ পরিচয়টিকেই ঝাপসা দেখে কিংবা দেখেই না?