করোনা ভাইরাস : ওষুধ কিনে বাড়িতে মজুদ রাখলে যে বিপদ

প্রকাশিত: ১১:০৭ অপরাহ্ণ, জুন ৯, ২০২০

শুধুমাত্র করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় এখনো পর্যন্ত কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। কোনো টিকাও নেই। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির যেসব লক্ষণ প্রকাশিত হয়, তার চিকিৎসায় এখন যেসব ওষুধ ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলোই দেয়া হচ্ছে কোভিড ১৯ রোগীদের।

চিকিৎসকেরা যেসব ওষুধে সুবিধা পাচ্ছেন বলে জানাচ্ছেন সেগুলো প্রচুর পরিমাণে কিনে বাড়িতে মজুদ করে রাখছেন বহু মানুষ। সেই সুযোগে অনেক ওষুধের দাম বেড়ে গেছে। এসব ওষুধ কিনে বাড়িতে মজুদ করার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে এর নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।

যেসব ওষুধের বিক্রি বেড়ে গেছে
ঢাকার কয়েকটি বড় ফার্মেসির সাথে কথা বলে জানা গেল যেসব ওষুধের বিক্রি বেড়েছে তা হল ঠাণ্ডা, হাঁপানি, সাইনোসাইটিস ও অ্যালার্জির ওষুধ। শরীরে নানা ধরনের ‘প্যারাসাইট’ আক্রমণ প্রতিহত করে এমন ওষুধ। ব্যাকটেরিয়াজনিত প্রদাহ প্রতিরোধ করে এমন অ্যান্টিবায়োটিক।

প্যারাসিটামল, ভিটামিন-সি, জিঙ্কের ঘাটতি পূরণ করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এমন সম্পূরক ওষুধ। জ্বর, শুষ্ক কাশি, শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যাই মূলত প্রধান লক্ষণ।

এছাড়া ক্লান্তি, মাংস পেশিতে ব্যথা, গলা ও মাথা ব্যথা ইত্যাদির ওষুধ কিনছেন মানুষ। ফার্মেসিগুলো জানিয়েছে এসব প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকেরা কোভিড ১৯ রোগীদের যেসব ওষুধ খেতে বলছেন মূলত সেগুলোই কিনতে আসছেন মানুষজন।

কেন এসব কিনছেন মানুষজন?
আজকাল ওষুধের দোকানে অন্যসময়ের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ দেখা যায়। বেশ কিছু ওষুধ কিনে বাড়িতে রেখে দিয়েছেন ঢাকার এমন এক বাসিন্দা বলছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপরে আমার আস্থা নেই। সেখানে চিকিৎসা সম্পর্কে যেসব খবর পড়ছি, তাতে আমি এখন হাসপাতালে যেতে চাই না। তাই বাড়িতেই দরকারি ওষুধ কিনে রেখে দিয়েছি। একটু ভয় কাজ করছে মনে।’

তিনি বলছেন, আগেভাগে পরিবারের সবার শরীরকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী করে তুলতে চান তিনি। তাই তিনি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে এমন সম্পূরক ওষুধও কিনেছেন।

ঢাকার মগবাজারের একজন বাসিন্দা রাজিয়া সুলতানা বলছেন, ‘করোনাভাইরাসের তো কোনো ওষুধ নেই। কয়েকটা ওষুধের নাম আমি ফেসবুক গ্রুপে দেখেছি। যদি সত্যিই কিছু হয়, বাজারে এসব ওষুধ যদি না পাওয়া যায়? এরকম ইতিমধ্যেই হচ্ছে শুনেছি। অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না শুনেছি। তাই কিছু ওষুধ কিনে রেখেছি। অক্সিজেনের অনেক দাম তাই সেটা কেনা হয়নি।’

এর ঝুঁকি কোথায়?

ভাইরলজির চিকিৎসক ডা: নজরুল ইসলাম বলছেন, ‘ধরুন শরীরে কিছু অর্গানিজম থাকে। আপনি বেশি অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে ফেললেন বা দরকার না থাকলেও খেলেন, তখন সেই অর্গানিজম অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। নির্দিষ্ট সেই অ্যান্টিবায়োটিক, যেটা আপনি বেশি খেয়েছেন তখন সেটা কার্যকারিতা হারায়। আপনার যখন সত্যিই কোনো প্রদাহ তৈরি হবে, তখন সেই অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না অথবা আংশিক কাজ করবে। এজন্য অ্যান্টিবায়োটিক যত কম খাওয়া যায় ততই ভাল।’

তিনি বলছেন, ওষুধ দরকার হলে উপকারী, কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করলে ক্ষতিই বেশি।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলছেন, ‘করোনাভাইরাসে এই ওষুধ কাজ করে, এটা করে না এরকম জনশ্রুতি শোনা যাচ্ছে। কোনো চিকিৎসক হয়ত একটা ওষুধের কথা বললেন, কোনো দেশের প্রধান হয়ত একটার কথা বললেন, এতে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। একারণেই মানুষজন নিজেরা ওষুধ কিনে কিনে মজুদ করছে যা খুবই বিপদজনক।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসির অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার বলছেন, ‘প্রতিটা ওষুধেরই কোনো না কোনো সাইড এফেক্ট আছে। একেক জনের একেক রকম সাইড এফেক্ট হয়। চিকিৎসকেরা প্রশ্ন করে সেগুলো জেনে নেন আর সেই অনুযায়ী ওষুধ দেন। কিন্তু আপনি নিজে নিজে খেলে সেটা জানবেন না। তাতে আরো উল্টো সাইড এফেক্ট হয়ে বিপদ বাড়বে।’

তিনি আরো বলছেন, ‘এখন দরকার নেই, তবুও একটা রোগ হতে পারে সেটা ভেবে একটা টক্সিক জিনিস শরীরে ঢোকানোর কোনো মানে হয় না।’

ওষধের সংকটের কি সম্ভাবনা আছে?

যে ওষুধগুলো মানুষজন কিনছে সেগুলো বাংলাদেশে যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে বলে বাংলাদেশে সরকার সবাইকে আশ্বস্ত করছে। অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার বলছেন তিনি মনে করেন না ওষুধের ঘাটতি হবে।

তিনি বলছেন, ‘বাংলাদেশে ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানির কোনটিই কিন্তু একদমই বন্ধ ছিল না। যেসব ওষুধ লোকে কিনছে তা মোটামুটি বাংলাদেশের বেশিরভাগ কোম্পানিই তৈরি করে। যেমন এমন কোনো দেশি কোম্পানি নেই যারা প্যারাসিটামল বানায় না। তাদের কাঁচামালও যথেষ্ট আছে। করোনা পরিস্থিতিতে কাঁচামাল আনার ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন সবাইকে অনুমোদন দিয়ে রেখেছে।’

ওষুধ কিনে মজুদ রাখা কাম্য নয় উল্লেখ করে অধ্যাপক বাছার বলছেন, ‘বাজার থেকে কিনে মজুদ করে রাখার ফলে যার সত্যিই দরকার হবে সে হয়ত করোনাভাইরাস হওয়া সত্ত্বেও ওষুধটা যোগাড় করতে পারবে না। অথবা দাম বেড়ে গেলে অনেকে সেটা কেনার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলবে।’

সরকার যা করছে

আজই বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে একটি গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসন। যাতে বলা হয়েছে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ফার্মেসিতে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের বেশি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওষুধ প্রশাসন সাবধান করে দিয়েছে যে এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া বিভিন্ন ফার্মাসিতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে। তবে তারপরও ভয়ে ওষুধ কিনে মজুদ রাখা থামছে না ।

সূত্র : বিবিসি