করোনা বদলে দিয়েছে ঈদের আমেজ

প্রকাশিত: ৫:২৩ অপরাহ্ণ, মে ২৫, ২০২০
করোনা আমাদের সব বদলে দিয়েছে। চিরায়ত সমাজব্যবস্থা, ধ্যান-ধারণা, আন্তরিকতা, দর্শন সবকিছু। মানুষ করোনাকালে নতুন করে পরিচিত হচ্ছে চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে। প্রতিনিয়ত মানুষ স্বগতোক্তি করছে জীবন এমন ছিল না, জীবন এমন হওয়ার নয়। বাঙালি একবেলা না খেয়ে থাকতে পারে কিন্তু আড্ডা ছাড়া একটা দিন- স্রেফ ভাবা যায় না। কর্মব্যস্ত জীবনে যখন বছর ঘুরে ঈদের কয়েকদিনের ছুটি সঞ্চয় হয় তখন আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব মিলে কী জম্পেশ আড্ডাই না হয়! ঈদের সেই বিরামহীন আড্ডার ভেতর কী রুচি, স্বাদ, পুষ্টিই না আছে!
বিশ্ব মুসলিমের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ঈদ ৷ পৃথিবীতে বসবাসরত প্রত্যেক জাতির ও ধর্মের মধ্যে বিশেষ দিনকে উপলক্ষ করে উৎসবের রেওয়াজ প্রাচীনকাল থেকেই। সাম্প্রতিককালে ঈদ শুধু সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং ঈদ একটি বাণিজ্যিক বিশালতা নিয়েও সমাসীন। গত বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঈদের অর্থনৈতিক লেনদেন দেড় লাখ কোটি টাকা। বাঙালি মুসলমানের শুধু ঈদ নয়, রমজান মাস এলেই বাড়তি খরচের হাত প্রশস্ত হয়। মানুষ সামর্থ্যের বাহিরে গিয়েও খরচ করে আনন্দ নিয়ে। দেশের উচ্চবিত্তের প্রায় এক লাখ পরিবার ঈদকে উপলক্ষ করে ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কেনাকাটার জন্য পাড়ি জমায়। এবার করোনা উচ্চ, মধ্য ও নিম্নবিত্ত সকলের ঈদ আনন্দ সংকোচন করে দিয়েছে ৷
সম্প্রতি করোনায় দীর্ঘমেয়াদি লকডাউনে মানুষ শুধু কর্মহীনই হয়নি, হয়েছে উপার্জনহীন, সর্বোপরি স্বপ্নহীন। সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণি যারা সম্মান, অধিকার ও কর্তব্যসচেতন তারা এখন জীবন-জীবিকা নিয়ে ঘোর অমানিশায় পতিত। লাগাতার তিন মাস আয়বিহীন থাকায় মধ্যবিত্তের মানইজ্জত তো গেছেই, এখন আবরু রক্ষা করা কঠিন। এমন দুমনা সময়ে ঈদ দিতে পারছে না মানুষের মাঝে আনন্দের বার্তা। দেশের সব মানুষের জন্য এমন নিরানন্দের ঈদ আগে আসেনি।
সরকার করোনার অর্থনৈতিক মন্দায় টিকে থাকতে শিল্প, কৃষিসহ অনেক সেক্টরে প্রণোদনা দিচ্ছে। মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। অসচ্ছল পরিবারের জন্য ৫০ লাখ রেশন কার্ড ও ৫০ লাখ পরিবারকে এককালীন ২৫০০ টাকা প্রদান করেছে। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে আমাদের সরকারের উদ্দেশ্য লোকপ্রিয়। কিন্তু যাদের হাতে বণ্টনের মহান দায়িত্ব তারা অধিকাংশ মহাচোর। করোনার মৃত্যুর সংখ্যার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে খবর আসছে রিলিফের চাল, তেল ও নগদ টাকা চোর চেয়ারম্যান-মেম্বারদের তালিকা।
করোনার ঈদ অবস্থার কতটা নিম্নগামী করে সেটাই দেখার বিষয়। এটা এমন এক ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধি, যা আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি এলে রক্ষে নেই। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলতে হয়। করোনা পরিস্থিতিতে এবার ঈদের জামাতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়া, কোলাকুলি করা, বয়োজ্যেষ্ঠদের কদমবুচি করা উচিত হবে না বোধহয়। এতে সংক্রমণ বাড়তে পারে। তাহলে আমাদের বহমান ঈদ সংস্কৃতি ও লোকাচার করোনার কারণে কি পাল্টে যাচ্ছে?
করোনা ক্রান্তিকালের এবারের ঈদ আনন্দ, সৌহার্দ্য ও যোগাযোগের জন্য ইতিবাচক নয়। তবু প্রকৃতির নিয়মেই ঈদ এসেছে। একমাস রোজা রাখার পর প্রতিদান প্রাপ্তি এবং আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য অপেক্ষমাণ মুসলমানরা ৷ প্রার্থনা থাকবে ঈদকে উপলক্ষ করে স্রষ্টা যেন করোনার হাত থেকে আমাদের রক্ষা করেন এবং  করুণা করেন।