করোনাকালে অর্থ সঙ্কটে রাজধানী ছাড়ছেন অনেকেই

প্রকাশিত: ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

মাহবুবুর রহমান এআর লিংক নামের একটি ইন্টারন্যাশনাল কুরিয়ার সার্ভিসের সাব-এজেন্ট। তিনি মূলত গার্মেন্ট সামগ্রী দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিতেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউনের শুরু থেকেই কাজ কমতে থাকে প্রতিষ্ঠানটির। এখন একেবারে কাজ এবং আয় দুটোই বন্ধ রয়েছে মাহবুবের।

আক্ষেপ করতে করতে মাহবুব বলছিলেন- ‘ছেলে-মেয়ে ঢাকার স্কুলে পড়লেও বাড়িতে পাঠাতে বাধ্য হয়েছি। বাসা ভাড়াসহ ছেলে-মেয়েদের খরচ চালাতে পারছিলাম না। তাই পাঠিয়ে দিযেছি। আমি একটি মেসে উঠেছি। পরিস্থিতি ভালো হলে তাঁদেরকে আবার নিয়ে আসবো।

রাফিয়া খানম চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। গত মে মাসের ১ তারিখে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তিনি তাঁর এক মেয়ে সুফিয়া খানমকে সঙ্গে নিয়ে থাকতেন রাজধানীর কলাবাগানে। সুফিয়া সিটি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। মায়ের চাকরি চলে যাওয়ায় আর বাসা ভাড়া দিতে পারছিলেন না। তাই বাসা ছেড়ে দিয়ে চলতি মাসের ২৫ তারিখে তিনি গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরাতে চলে গেছেন।

কথা প্রসঙ্গে আক্ষেপ করতে করতে রাফিয়া খানম বলছিলেন- ‘মেয়ের বাবা বেঁচে নেই। কত সখ ছিলো মেয়েকে অনেক লেখাপড়া শেখাবো। কিন্তু চাকরি চলে যাওয়ায় বাসা ছেড়ে দিয়ে চলে আসছি। এখন আমার মেয়ের কী হবে? আমি কিছুই ভাবতে পারছি না। আমার কোনো জমানো টাকা নেই যে, মেয়েকে সেই টাকা দিয়ে পড়াবো। মেয়ের কথা ভেবে কষ্টে বুকটা ফেঁটে যাচ্ছে আমার।’

শুধু মাহবুব বা রাফিয়া নয়; রাজধানী ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়া এমন অনেক উদাহরণ গণমাধ্যমের ফুটেজে উঠে এসেছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস শুধু মানুষের প্রাণই কেড়ে নিচ্ছে না। করোনাকালীন অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অনেক সাধারণ মানুষ এখন আকষ্মিকভাবে চাকরিচ্যুত ও বাস্তুহারাও হচ্ছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ভাড়াটিয়া পরিষদ নামের একটি বেসরকারি সংগঠনের সভাপতি বাহরানে সুলতান বাহার বলেন- ‘আমার ধারণা- ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ এই করোনাকালে বাসা ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে গেছেন। এদের কেউ চাকরি হারিয়েছেন। কেউ নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। টাকা না থাকলে বাসা ভাড়া দেবেন কীভাবে? এই পরিস্থিতি আরও অনেকদিন চলবে বলে সবাই ধারণা করছেন। সুতরাং এই সংকট আরও বাড়বে। সেজন্য সরকারকেই এই ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।’

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত বলেন- ‘আমি বুঝতে পারছি না এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। মানুষ টাকা আয় করতে না পারলে বাসা ছেড়ে দেবে সেটাই স্বাভাবিক। এখন দেখার বিষয় চাকরিচ্যুতদের জন্য সরকার কী ব্যবস্থা নেয়। তবে চাকরিচ্যুতির সংখ্যা আরও বাড়বে। তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে আমার মনে হচ্ছে। অন্তত দুই কোটি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। এভাবে চলতে থাকলে সামনে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি আসতে পারে।’