ইসলামে নাম সমাচার

প্রকাশিত: ১২:৫৫ অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০২০

লিখেছেন জাহিদ জাওয়াদ

মানুষের নাম খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সন্তান নিয়ে যে কোনো দম্পতির জল্পনাকল্পনার বড় একটি অংশ জুড়ে থাকে তার নাম।

শরীয়তের দৃষ্টিতেও নামকরণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। হযরত আদম আ.কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম তাঁকে বিভিন্ন জিনিসের নাম শিক্ষা দিয়েছেন। তারপর ফেরেশতাদের সামনে সেগুলো রেখে তাদেরকে সেগুলোর নাম বলার নির্দেশ করেছিলেন।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “আর তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করে বললেন, এগুলোর নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” (সুরা বাকারা ৩১)

হাদীস শরীফে সুন্দর নাম রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারণ কিয়ামতের দিন মানুষকে তার নাম ধরে ডাকা হবে৷ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে ডাকা হবে তোমাদের নামে এবং তোমাদের পিতাদের নামে। অতএব, তোমাদের নামগুলো সুন্দর করে রাখো। (আবু দাউদ ৪৯৪৮)

সন্তানের নামকরণের সময়কালঃ হযরত আয়েশা রা.হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মের সপ্তম দিনে হযরত হাসান রা. ও হুসাইন রা.এর আকীকা করলেন এবং তাদের দুইজনের নাম রাখলেন। (ইবনে হিব্বান)

মুসলিম নামের শ্রেণী বিভাগঃ মুসলিম নাম সাধারণত পাঁচ ভাগে বিভক্ত।

১. কুনিয়াত তথা উপনামঃ আরবে কুনিয়াত রাখার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। সাধারণত সন্তানের নামের আগে “আবু” বা “উম্মু”যোগ করে নাম রাখাকে কুনিয়াত বলা হয়। যেমন- আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, উম্মে হারাম রা.।

২. নসব বা বংশসুচক নামঃ পিতা বা পূর্ব-পুরুষের নামের পূর্বে ইবনে বা বিনতে যোগ করে নাম রাখা। ইবনে মাসউদ রা., ইবনে উমর রা.৷

৩. ইসম বা সাধারণ নামঃ মুল নামটিকে ইসম বলা হয়। যেমন-আব্দুল্লাহ, আব্দুর রহমান ইত্যাদি।

৪. নিসবত বা সম্বন্ধসূচক নামঃ বংশ, গোত্র, পেশা, বাসস্থান, জন্মস্থান ইত্যাদির বিশেষণ যোগে নামকে নিসবত বলা হয় যেমন- বুখারী বুখারা এলাকার দিকে, তিরমীযী তিরমীয শহরের দিকে, তাবারী, তাবারিস্তানের দিকে সম্বন্ধযুক্ত৷ বাংলাদেশী, ভারতীয়, পাকিস্তানী এগুলো এই প্রকারেরই অন্তর্ভুক্ত।

৫. লক্বব বা উপাধীঃ সুমহান অবদান বা গুণের কারণে যে বিশেষণে ভূষিত করা হয়। যেমন- মূসা কালীমুল্লাহ, ইবরাহীম খলীলুল্লাহ। ইমামে আযম, মুফতীয়ে আযম ইত্যাদি।

পূর্বের নাম পরিবর্তনঃ

অনেকের ধারণা নাম একবার রাখলে আর পরিবর্তন করা যায় না। বিষয়টি সঠিক নয়। নাম সুন্দর ও অর্থবহ না হলে তা পরিবর্তন করে ভালো ইসলামী নাম রাখা যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্দর ও অর্থবহ নাম পছন্দ করতেন। নাম অর্থহীন হলে অনেক সময় তা পরিবর্তন করে দিতেন।

এক সাহাবী বলেন, “হুনাইনের যুদ্ধে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ছিলাম। তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলে বললাম, গুরাব (কাক)। তিনি বললেন, না তুমি মুসলিম।” (আদাবুল মুফরাদ ৮৩১)

সন্তানের উপর নামের প্রভাবঃ

হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.এর পিতা ফারুকী (হযরত উমর রা.) বংশোদ্ভূত আর মাতা আলাভী (হযরত আলী রা.) বংশোদ্ভূত ছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের কোন পুত্র সন্তানই জন্মের পর বেঁচে থাকত না।

থানভী রহ.এর নানী হযরত হাফেজ গোলাম মুর্তাযা মাজযুব(রহ.)কে অভিযোগের সুরে জানালেন, হযরত, আমার এই মেয়ের ছেলেসন্তান জীবিত থাকে না। হাফেজ সাহেব রসিকতা করে বললেন, “উমর আর আলীর টানাটানিতে মরে যায়। এবার আলীর সোপর্দ করো, বেঁচে থাকবে।”

এ কথার অর্থ হলো, পিতা ফারুকী বংশের আর মাতা আলাভী বংশের। এখন পর্যন্ত ছেলেদের নাম পিতার নামে অর্থাৎ ‘ফযলে হক’ প্রভৃতি রাখার হয়েছিল। এবার যে ছেলে হবে, তার নাম মাতৃকুলের নামানুসারে শেষে ‘আলী’ রাখতে হবে।

পরবর্তীতে এমনই নামকরণ করা হয়েছিল এবং বুযুর্গের ভবিষ্যতবাণী সত্য হয়েছিল। (আশরাফ চরিত পৃ.৪৭)

আরেকবার কানপুরে কালীমুল্লাহ নামের এক ব্যাক্তি থানভী রহ.এর কাছে এসে জানাল যে, সবসময় তার নানার অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে। আরবীতে ‘কিলম’ অর্থ জখম। তাই হযরত নাম পরিবর্তন করে ‘সালীমুল্লাহ’ রেখে দিলেন। ‘সালামাত’ অর্থ সুস্থতা। এরপর আর ঐ লোকের অসুখ লেগে থাকত না। (বাংলা বেহেশতী জেওর)

আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় নামঃ

ইবনে উমর রা.হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালার কাছে তোমাদের নামগুলোর মধ্যে প্রিয়তম হল, আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান”।(সহীহ মুসলিম ৫৪৮০/২১৩২)

আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় নামঃ

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে লোকের নাম মালিকুল আমলাক (রাজাধিরাজ) রাখা হয়েছে, আল্লাহর কাছে সেটি সর্বনিকৃষ্ট নাম। (সহীহ মুসলিম ৫৫০৩, আদাবুল মুফরাদ ৮২৪)

সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখা সমাজ-ধর্ম উভয় দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ৷ তাই আসুন আমরা সকলে এ ব্যাপারে যত্নবান হই৷