ইতিহাস থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

প্রকাশিত: ৩:১১ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০

ইয়াহিয়া ইবনে মুয়ায রহ. এঁর সামনে একবার একজন তিলওয়াত করলো –

فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا

‘আপনারা তার (ফিরাউন) সঙ্গে কথা বলবেন নম্রভাবে।’ [ত্ব-হা, ৪৪]

ইয়াহিয়া ইবনে মুয়ায রহ. এতটুকুন শোনামাত্রই ঠুকরে কেঁদে উঠেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে নিজে নিজেই বলতে লাগলেন-

‘ও আমার রব্ব, যে ব্যক্তি নিজেকেই খোদা বলে দাবি করত তার প্রতি আপনার দয়া ও উদারতা যদি এই হয়- তবে কি করে আমরা সে মানুষের প্রতি রূঢ় আচরণ করি- যে আপনাকেই রব্ব বলে মানে!’

ইবনে কাসীর রহ. এই আয়াতের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন-

‘ফিরাউন হচ্ছে পৃথিবীর সবচে’ বড়ো দাম্ভিক ও অহংকারী। আর মূসা আ. হচ্ছেন আল্লাহর শ্রেষ্ঠতর পছন্দের লোকদের মধ্যে অন্যতম।

এতদসত্ত্বেও, আল্লাহ মুসা আ. এবং তাঁর সহযোগী অপর এক সম্মানিত নবী হারুন আ. কে নির্দেশ দিচ্ছেন- যেন তাঁরা ফিরাউনের সাথেও কোমল ভাষায় কথা বলে এবং নম্রভাবে সম্বোধন করে।’

যে নিজেকেই রব্ব দাবি করেছিল। আল্লাহকে অস্বীকার করে নিজেকেই প্রতিপালক হিসেবে মানতে মানুষকে বাধ্য করেছিল। তার প্রতিও নম্রভাবে কথা বলার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন, দুজন নবীকে।

অথচ ইসলামের চোখে শিরকের থেকে বড়ো অপরাধ আর নেই। আর ফিরাউন তো কেবল শিরকই করে নি। বরং সে মানুষকে শিরক করতে বাধ্য করেছে।

সে তো নিজের স্বমন্ধ্যে ঘোষণা করেছিল, ‘আনা রাব্বুকুমুল ‘আলা’। ‘আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালক।’ [আন-নাযিয়াত, ২৪]

আদতে কোরআনে আল্লাহ্‌ এই প্রসঙ্গের অবতারণা আমাদের শিক্ষা দিচ্ছেন- বিনম্র হওয়াটা কতখানি আবশ্যক।

যদি ফিরাউনের ব্যাপারে মুসা আ. এঁর প্রতি নির্দেশ এই হয়! তাহলে এক মুসলমানের অপর মুসলমানের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?

ইমাম ফুদাইল বিন ইয়াদ রহ. বলতেন,

‘আল্লাহ্‌র কসম, যথোপযুক্ত কারণ ছাড়া একটা কুকুর কিম্বা শুকরেরও ক্ষতি করার অনুমতি ইসলাম দেয় নি। সেখানে কী করে একজন মুসলিম অপর মুসলিমের ক্ষতি করতে পারে?’

আমি খুব বিস্মিত হই! অফলাইনে, অনলাইনে সর্বত্রই- একটু ইখতিলাফ, দ্বিমত, অপছন্দ হওয়ার দরুণ মানুষ একে অপরের সঙ্গেই কী রুঢ় আচরণই না করে! গালাগালি করে। দূর্ব্যবহার করে।

এমনকি কেউ কেউ অপবাদ দিতেও পিছপা হয় না। কখনো কখনো ইসলামের নামেও এসব করে। যে যাই বলুক- কা’বার রবের শপথ, কারো অন্তরে পরিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রবেশ করলে সে এ কাজ করতে পারে না!

এইসব ঔদ্ধত্য, অহংকার, রুঢ়তা ঈমানকে ক্রমশ দূর্বল করে। শেষাবধি কেউ কেউ ঈমানের দৌলত থেকে বঞ্চিত হয়। ঈমান বিহীন মরতে হয়। ইবলিস এর সবচে’ বড়ো উদাহরণ।

একবার সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী রহ. প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি এমনভাবে শয্যাগত হন, ধরে নেওয়া হয়েছিল তিনি মারা যাবেন।

সে সময় তিনি বারংবার কায়মনোবাক্যে তওবা করতে থাকেন। তওবায় তিনি প্রতি বার এই ওয়াদা করতেন-

‘আল্লাহ যদি আপনি আমাকে সুস্থতা দান করেন তবে আমি আর কখনোই কোনও মুসলমানের কোনও প্রকার ক্ষতির কারণ হব না এবং বায়তুল মাকদিস উদ্ধারে আমৃত্যু কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াই করব।’

ইবনে কাসীর রহ. বলছেন, আল্লাহ্‌ তাঁর এই দোয়া কবুল করেছিলেন। সে যাত্রায় তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন। এরপরই তিনি জেরুজালেম অভিযান পরিচালনা করেন। ক্রুসেডারদের পরাজিত করে হৃত বায়তুল মাকদিস পুনরোদ্ধারে সমর্থ হন।

এই ঘটনাটাও আমাদের জন্য একটা মূল্যবান শিক্ষা। কিন্তু আমাদের দূর্ভাগ্য ইতিহাস থেকে আমরা উপকারী শিক্ষা আমরা কমই গ্রহণ করি।

যাহোক, অপর মুসলমানের ক্ষতি করা, কারো প্রতি শত্রুতা পোষণ করা, রুঢ়তা থেকে আল্লাহ্‌ আমাদের নিরাপদ রাখুন। নতুবা অন্য কিছুই হয়ত বিচার দিবসে আমাদের জন্য কোনও উপকার বয়ে আনবে না।

রমযান তো অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে, এই রমযানে সুলতান সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী রহ. এঁর মত এইরকম একটা তওবা কি আমরা করতে পারি না?