ইকরা, নারীশিক্ষা ও কিছু কথা

প্রকাশিত: ৪:৫৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২০

লিখেছেন ফারুক আবদুল্লাহ 

ইসলামে শিক্ষার গুরুত্বের কথা আমরা জানি। এবং এই গুরুত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে ইসলাম নারী এবং পুরুষের মাঝে কোনো বিভাজন সৃষ্টি করে নি। রাসূল ﷺ দ্বিধাহীন ভাষায় বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। সুতরাং জ্ঞান অর্জন ইসলামে নারীদের নীতিগত অধিকার।

আমরা যদি বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করি, তাহলে নারীশিক্ষা আরো বেশী গুরত্ববহ হয়ে উঠে বেশ কিছু কারণে। আমি একে একে কারণগুলো আলোচনা করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

একটি শিশুর জন্য তার প্রথম পাঠশালা হচ্ছে তার পরিবার। স্বভাবতই এই প্রথম পাঠশালায় প্রধান শিক্ষক হলেন তার মা। পুরুষকে জীবন ও জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হতে হয়। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় জীবনের সিংহভাগ সময় তাকে বাইরে কাটাতে হয়। ফলে সন্তান প্রতিপালনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে মায়ের কাঁধে, যিনি একজন নারী। বুঝ হওয়ার পর থেকেই একটা শিশু তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করে৷ সে কী হতে চায়, কার মত হতে চায়- এসব। বোধ-বুদ্ধি বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন স্বপ্নকে সে নিজের মাঝে সযত্নে বড় করে তুলতে শিখে। এবং বাকি জীবনে এর প্রভাব থাকে অবিচল। এই স্বপ্নই তাকে সামনের দিকে নিয়ে যায়। এই যে একটা কিশোর স্বপ্ন দেখছে, কী স্বপ্ন সে দেখবে, তা নির্ভর করবে তার মায়ের প্রতিপালনের উপর। একটা দৃষ্টান্ত দিই। তাহলে বুঝতে সহজ হবে।

আমার এক ক্লাসমেট। তার মা-বাবা উচ্চ ‍শিক্ষায় শিক্ষিত। বাবা এক কলেজের প্রফেসর। মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ল পড়েছেন। মা-বাবার ইচ্ছা ছিলো ছেলেকে ধর্মীয় এবং জেনারেল উভয় শিক্ষায় সমানভাবে শিক্ষিত করে তুলবে‌ন। বাবা কর্মজীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও মা সেভাবেই ছেলেকে প্রতিপালন করেন। ঐ ছেলে ১৬ বছর বয়সে আমাদের সাথে দাওরা ফারেগ হয়! মাত্র ১৬ বছর বয়সে আলেম হয়ে এখন সে কলেজে পড়ছে।

স্কুল ও মাদরাসা, দুই সিলেবাসের সমন্বয় কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়। তাও আবার উভয় জায়গায় সমানভাবে ভালো রেজাল্ট করে। এই সাফল্যের প্রধান কারণই হলো তার শিক্ষিত মা। বাবা দুই সপ্তাহ পরে একদিনের জন্য বাসায় আসেন। বিভিন্ন ব্যস্ততায় মাঝে তিনি স্কুল-মাদরাসা দুই সিলেবাসের সমন্বয় নিয়ে কিছুটা পিছুও হটে গিয়েছিলেন। কিন্তু মা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলেন স্টিক টু দ্যা গোল৷ মা শিক্ষিত না হলে এই সাফল্য কোনভাবেই সম্ভব ছিলো না‌। তাহলে বোঝা গেল সন্তানকে স্বপ্ন দেখানোর জন্য এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার জন্য মা‘র শিক্ষিত হওয়া জরুরী।

মুসলিম হিসেবে ঈমান-আমল রক্ষার জন্য নারীদের শিক্ষিত হয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তাও অত্যন্ত ব্যাপক। এক্ষেত্রে আমাদের মাঝে একটা বিশেষ সংশয় হলো- আমরা অনেকে বলি, পড়াতে তো ইচ্ছে করে, কিন্তু বর্তমান স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির যা পরিবেশ- মেয়েদের পাঠাতে ভয় করে। অভিভাবকদের এই অভিযোগকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দুঃখজনকভাবে পরিবেশের এই সমস্যার কারণে আগ্রহী অনেক শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিন্তু এই অভিযোগের ভিত্তিতে মেয়েদেরকে পড়ালেখা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা কোন সমাধান নয়। সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। নিরাপদ পরিবেশ খুঁজে বের করতে হবে কিংবা সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষা যেহেতু অত্যাবশ্যকীয় বিষয়, তাই সমস্যার অজুহাতে শিক্ষাকে অগ্রাহ্য না করে সমস্যা সমাধানের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এটা প্রত্যেকের দায়িত্ব।

এবার আসি মূল কথায়। ধর্ম আমাদের জীবনের সবচে গুরত্বপূর্ণ অধ্যায়। ধর্মকে ঘিরেই আমাদের জীবনের চাকা চালিত হয়, হওয়া উচিত। তাই ধর্ম সম্পর্কে আমাদের জানতে হয়।

ইসলামকে জানার সবচে বড় মাধ্যম শিক্ষা। কারণ ইসলাম জ্ঞানসমৃদ্ধ ধর্ম। ইসলামের প্রথম কথাই হচ্ছে “পড়ো তোমার স্রষ্টার নামে।” অন্যদিকে রাসূল ﷺ বলেছেন, “প্রত্যেক মুসলমানের উপর জ্ঞান অন্বেষণ করা ফরজ।” এই যে ধর্মে জ্ঞানের এত এত গুরুত্ব, তার কোথাও কিন্তু নারী-পুরুষে বিভাজন করা হয়নি।

রাসূল ﷺ পৃথিবীর ইতিহাসের সবচে আর্দশ শিক্ষক। তিনি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার শিক্ষক ছিলেন। নারীরা দূর-দূরান্ত থেকে তাঁর কাছে আসতো। এক নারী রাসূলের অনুপস্থিতিতে কার কাছ থেকে শিখবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি আবু বকর রা. এর নাম বলেছেন। রাসূলের চার পাশে পুরুষ সাহাবীদের ভিড় লেগে থাকতো। এতে নারী সাহাবিয়াদের সমস্যা হওয়াতে এক নারী সাহাবিয়া তাদের জন্য একটা সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার আবেদন করলে রাসূল ﷺ তাতে সম্মতি প্রকাশ করেন। এসব কিছু স্পষ্ট ধারণা দেয়- ইসলামে ‘‍শিক্ষা’ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়।

বিশ্বায়নের এই সময়ে ধর্ম-শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা একজন নারীর ধর্মবিদ্বেষী হয়ে উঠা খুবই সহজ‌। কারণ আমাদের দেশে নারীদের জন্য বিস্তৃৃত পরিসরে ধর্ম-শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। সীমিত পরিসরে যা আছে, তাও গুরুত্বের অভাবে অনুন্নত ও অপরিকল্পিত। অন্যদিকে ইসলামের নীতি-আদর্শের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত সবকিছুই প্রযুক্তির কল্যাণে তাদের হস্তগত।

একজন পুরুষ, সীমিত ধর্মীয় পড়াশোনা সত্ত্বেও ধর্ম সম্পর্কে জানার-বোঝার ব্যাপক সুযোগ তার থাকে। প্রতি সপ্তাহে তাকে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ‍জুমার আলোচনা শুনতে হয়। সেখানে ধর্মের বহুদিক নিয়ে আলোচনা হয়। পুরুষ চাইলেই নির্দ্বিধায় যে কোনো ওয়াজ মাহফিলে অংশগ্রহণ করতে পারে। পুরুষ বছরে দুইবার ঈদের নামাজে উপস্থিত হয়। যেখানে ধর্মের বিভিন্ন বিধিবিধান নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। যে সমস্ত দাওয়াতী সংগঠনগুলো আছে, তাদের কর্ম-প্রক্রিয়াও অনেকটা পুরুষ কেন্দ্রিক। ফলে একজন পুরুষের ধর্ম সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তার ভিতরে এক ধরণের ধর্মবোধ তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে জানার এই সবগুলো মাধ্যম শুধুই পুরুষদের জন্য। আপনি চিন্তা করুন, একজন নারীর মক্তবের সীমিত পড়াশোনার বাইরে ইসলাম সম্পর্কে জানার পরিকল্পিত কী ব্যবস্থা আমাদের সমাজে আছে? (দাওয়াত ও তাবলীগের মাস্তুরাত ও মহিলা মাদরাসার কথা কেউ বলতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিবেচনায় তা অত্যন্ত গৌণ।) পক্ষান্তরে একজন নারীকে ধর্মবিদ্বেষী করে তোলার মাধ্যম দিনদিন কিন্তু বেড়েই চলেছে।

ধর্ম-জ্ঞানশূন্য নারীদের ধর্মবিদ্বেষী করা সহজ কেন? এর উত্তর প্রশ্নেই আছে। ধর্ম সম্পর্কে মূর্খতা। ইসলামের নারী সংক্রান্ত কিছু বিধি-বিধান আছে, যার শুধু অনুবাদই যথেষ্ট না। ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। কারণ একটা বিধান বোঝার জন্য তার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বুঝতে হয়। কিন্তু আমাদের প্রগতিশীল নারীরা শুধু অনুবাদ পড়েন বা এমন কারো থেকে ব্যাখ্যা নেন, যারা ইসলামের ন্যায্য আচরণে বিশ্বাস করে না। নারী অধিকার, বহু বিবাহ, পর্দা-বিধান, নারীর ক্ষমতায়ন, মোটা দাগে এই কয়েকটা বিষয়- যেগুলোর অপব্যখ্যা একজন প্রগতিশীল নারীর মাঝে খুব সহজেই ইসলামের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করতে সক্ষম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে অপব্যখ্যাগুলোই কেন তাদের কাছে পৌঁছছে? যুগে যুগে ইসলামিক স্কলাররা যথাযথ ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছেন, সেগুলো কেন প্রগতিশীল নারীদের কাছে পৌঁছে না? ‘ধর্মীয় ঘরানার দায়িত্বশীলদের নারী-শিক্ষায় গুরুত্ব না দেয়া’- প্রধান কারণ হিসাবে এটাকেই আমি দায়ী করবো।

নারীদের সাক্ষরতার হার বাড়ছে। এটা ইতিবাচক। আধুনিক যুগে মানুষের মেধা ও কর্মক্ষমতাকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতএব মুসলিম সম্প্রদায়ে নারীদের অশিক্ষিত রাখা নিঃসন্দেহে শক্তির অপচয়। মুসলিম সমাজেও নারী শিক্ষক, অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক দরকার আছে। সুতরাং ইসলামী জীবনবিধান ও অনুশাসন মেনে নারীর জন্য উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে৷ এই দায়িত্ব নবীর উত্তরসূরীদের। অতীত উদাসীনতা থেকে বেরিয়ে এসে অতি দ্রুত এ ব্যাপারে তাদের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করেন।