আয়া সোফিয়া আবারো মুসলিমরা ফিরে পেয়েছে

প্রকাশিত: ১২:৪৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০২০

তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরটি দাঁড়িয়ে আছে এশিয়া ও ইউরোপ দুই মহাদেশে ভাগ হয়ে। মহাদেশ দুটিকে যোগ করা বসফরাস প্রণালী শহরটিকে দুভাগে ভাগ করে ফেলেছে। এই শহরেরই ইউরোপীয় অংশে রয়েছে দৈত্যাকৃতির এক স্থাপত্যবিস্ময়।বাইজেন্টাইন শাসনামলে বানানো এই স্থাপত্যকর্মটির বর্তমান নাম আয়া সোফিয়া। এটি নির্মাণ করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ১,৫০০ বছর আগে। খ্রিস্টিয় চতুর্থ শতকে খ্রিস্টান সম্রাট কন্সটান্টিয়াস “হাজিয়া সোফিয়া” নামে স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিলেন। সেসময় ইস্তাম্বুল শহরটির নাম ছিল কন্সটান্টিনোপল। ৩৬০ খ্রিস্টাব্দের ১‌৫ ফেব্রুয়ারি ‘হাজিয়া সোফিয়া’ গির্জা নামে এই স্থাপনা খ্রিস্টানদের উপাসনার জন্য খুলে দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় এক হাজার বছর খ্রিস্টানদের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয় “হাজিয়া সোফিয়া”।

 

খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে তৎকালীন বাইজান্টাইন সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয়ে কনস্টান্টিনোপলের নিয়ন্ত্রণ নেন দ্বিতীয় মুহাম্মাদ খ্যাত ওসমানীয় শাসক সুলতান মোহাম্মাদ ফাতেহ। তিনি কনস্টান্টিনোপলের নাম পরিবর্তন করে ইস্তাম্বুল রাখেন এবং ‘হাজিয়া সোফিয়া’ গির্জাকে ‘আয়া সোফিয়া’ মসজিদে রূপান্তর করেন। মুসলিম আইনশাস্ত্র (ফিকহ) অনুযায়ী কোন মুসলিম শহরে অমুসলিমদের জৌলুসপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা থাকবে না, যা মসজিদের চেয়ে বৃহৎ ও অধিক দৃষ্টিগোচর। অতএব হাজিয়া সোফিয়াকে চার্চ হিসেবে বহাল রাখার সুযোগ ছিল না। একটা উপায় ছিল ভেঙে ফেলা। কিন্তু এরচেয়ে উত্তম বিকল্প হল মসজিদে রূপান্তর। তিনি বিজয়ী হিসেবে গির্জা ছিনিয়ে নিতে পারতেন, রাষ্ট্রীয় টাকায় কিনতে পারতেন, কিন্তু সেসব না করে চুক্তিনামা করে তৎকালীন  ধর্মযাজকদের কাছ থেকে নিজের টাকায় গির্জাটি ক্রয় করে নেন। এখনও সেই ঐতিহাসিক চুক্তিনামা তুরস্কে সংরক্ষিত আছে।

 

“হাজিয়া সোফিয়া”র অবস্থা তখন খুব খারাপ। দরজাগুলিও পর্যন্ত ভেঙে নীচে পড়েছিলো। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ এটির মেরামতের নির্দেশ দেন এবং স্থাপনাটিতে চারটি মিনার সংযুক্ত করেন। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীতে দ্বিতীয় সুলতান সেলিমের শাসনামলে হায়া সোফিয়া মসজিদের বহিরাবরণকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এই কাজের দায়িত্ব পান তৎকালীন ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বিখ্যাত স্থাপত্যশিল্পী ‘মিমার সিনান’। ইতিহাসে সিনান ছিলেন প্রথম স্থাপত্যশিল্পী যিনি তার নির্মিত স্থাপনাগুলোকে ভূমিকম্প প্রতিরোধক্ষম করে তৈরি করেছিলেন। আয়া সোফিয়া মসজিদকেও একই বৈশিষ্ট্য দেয়ার পর তিনি মসজিদের পশ্চিম পার্শ্বে আরো দু’টি মিনার সংযোজন করেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় সুলতান সেলিম ইন্তেকাল করলে ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সুলতানের সমাধি স্থাপন করা হয়।

 

আয়া সোফিয়ার ভিতরের অংশ

 

ওই সময়ে মসজিদটিতে আরো যেসব স্থান সংযোজন করা হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সুলতানের বসার জায়গা, মরমর পাথরে তৈরি মিম্বার এবং মুয়াজ্জিনের জন্য একটি ছাদযুক্ত বারান্দা। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন সুলতান প্রথম মাহমুদ আবার এই মসজিদ পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। এই সময়ে হায়া সোফিয়া মসজিদে একটি মাদ্রাসা সংযোজন করা হয় যেটি বর্তমানে লাইব্রেরিতে রূপ নিয়েছে। এই লাইব্রেরিতে রয়েছে তিন লাখেরও বেশি বই। সেইসঙ্গে এ সময়ে দরিদ্র মানুষদের তৈরি করা খাবার পরিবেশনের জন্য একটি বড় রান্নাঘর স্থাপন করা হয়। এই মসজিদে সবচেয়ে ব্যাপকভিত্তিক মেরামত ও পুনর্নির্মাণ কাজ হয় ১৮৪৮ ও ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে। সে সময় এই কাজে ৮০০ শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। এবার মসজিদের পিলারগুলোতে বিশাল বিশাল গোলাকৃতি ফলক ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এসব ফলকে শোভা পায় আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামগুলো। পাশাপাশি বিশ্বনবী (সা.), আবুবকর, ওমর, ওসমান, আলী, হাসান ও হোসেইনের নামও এসব ফলকে স্থাপন পায়।

 

ছবি: ইন্টারনেট

 

আয়া সোফিয়া মসজিদের আয়তন প্রায় ছয় হাজার বর্গমিটার। চারটি বিশাল স্তম্ভের উপর মসজিদের মূল গম্বুজ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া, মসজিদে রয়েছে মোট ১০৭টি স্তম্ভ ও নয়টি দরজা। মূল গম্বুজের নীচ দিয়ে মসজিদের ভেতরে সূর্যের আলো পৌঁছানোর জন্য স্থাপন করা হয়েছে ৪০টি জানালা। এসব জানালা দিয়ে মসজিদের সোনালী মোজাইকের উপর যখন সূর্যের আলো নিক্ষিপ্ত হয় তখন চমৎকার এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ ও দৃশ্যের অবতারণা হয় যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

 

সুদীর্ঘকালের ইতিহাস সমৃদ্ধ এই মসজিদটিকে ১৯৩৫ সালে তৎকালীন তুর্কি প্রেসিডেন্ট কামাল আতাতুর্ক যাদুঘরে রূপান্তর করেন। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে আল্লাহ, রাসূলুল্লাহ (সা.), খোলাফায়ে রাশেদিন এবং ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেইন আলাইহিমুস সালামের নাম সম্বলিত ফলকগুলো নামিয়ে ফেলা হয়। অন্য কোনো মসজিদে স্থাপনের জন্য ফলকগুলোকে মসজিদ থেকে বের করতে গিয়ে দেখা দেয় বিপত্তি। এসব ফলকের আকার আয়া সোফিয়া মসজিদের দরজাগুলোর চেয়ে বড় হওয়ায় সেগুলো বের করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ফলকগুলোকে মসজিদের এক কোণে ফেলে রাখা হয়। অবশ্য  এর একযুগেরও বেশি সময় পর ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ফলকগুলোকে আগের মতো স্তম্ভের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়া হয়।

সেক্যুলার শাসক কামাল আতাতুর্কের নির্দেশে মসজিদটিকে যাদুঘরে রূপ্তান্তর করার পর থেকে এখানে নামাজ আদায় করা নিষিদ্ধ ছিল। ২০০৬ সালে তুর্কি সরকার মুসলমানদের নামাজ আদায় এবং খ্রিস্টানদের উপাসনার জন্য যাদুঘরের একটি অংশ বরাদ্দ দেন।

 

অবশেষে দীর্ঘ ৮৬ বছর পর ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করার আদেশ জারি করা হয়েছে। তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করার সরকারি আদেশনামায় সাক্ষর করেছেন। এতে করে হাজার বছরে ঐতিহ্য মুসলমানদের আয়া সোফিয়া আবারো আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠে। বর্তমান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন, ২৪ জুলাই আয়া সোফিয়ার মূল ভবনের ভিতরে মুসলমানেরা প্রথম নামাজ আদায় করবে এবং অন্যান্য মসজিদের মতো আয়া সোফিয়া মসজিদও স্থানীয়, অপরিচিত, মুসলমান এবং অমুসলিমদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।