ঢাকা, বুধবার ১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৫ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

আসহাবে কাহাফের বিস্ময়কর ঘটনা (প্রথম পর্ব)


প্রকাশিত: ১১:৫৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

 

আল্লাহর রাসূল (সা:) তখনো মদিনায় হিজরত করেন নি। নবুয়াতপ্রাপ্তির পর মক্কাতেই ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। মক্কার লোকদের মুক্তির জন্যে ইসলামের ছায়াতলে শামিল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু মক্কার কিছুসংখ্যক লোক ব্যতীত অধিকাংশ কোরাইশ নেতারা তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয় নি।

 

তারা বেঁকে বসেছে। বাপ-দাদার ধর্ম মূর্তি-পূজা ছেড়ে তারা কিছুতেই এক আল্লাহর ইবাদত করবে না। তারা খুবই বিরক্ত। রাসূলের চাচা আবু তালেবের কাছে বারবার অভিযোগ করেও কোন সুরাহা হয় নি। মুহাম্মাদ তাঁর মতো করে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছেন। ইসলাম মেনে নেয়ার অর্থ হলো মুহাম্মাদের দ্বীনের কাছে আত্মসমর্পণ করা। তখন নেতৃত্ব চলে যাবে মুহাম্মাদের হাতে। এটা কিছুতেই হতে পারে না। তারা এক অনাকাঙ্খিত ভয়ে শংকিত হয়ে উঠলো। মুহাম্মাদ কি আসলেই নবী ?  এটা নিশ্চিত হওয়া দরকার। তাই তারা নযর ইবনে হারেস ও ওকবা ইবনে আবী মুয়ীত নামে দুজনকে মদীনার ইয়াহুদী পণ্ডিতদের কাছে প্রেরণ করলো। মুহাম্মাদ (সা:) সম্পর্কে তারা কী বলে জানার জন্যে।

 

মদীনার ইয়াহুদী পণ্ডিতরা তাদেরকে বলে দেয় যে, তোমরা তাঁকে তিনটি প্রশ্ন করো। তিনি এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলে বুঝে নেবে যে, তিনি আল্লাহ্‌র রাসূল। অন্যথায় বুঝতে হবে তিনি আল্লাহ রাসূল নন, মিথ্যাবাদী।

(১) তাঁকে ঐসব যুবকের অবস্থা জিজ্ঞাসা করবে, যারা প্রাচীনকালে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। তাদের ঘটনা কী? কারণ এটা অত্যন্ত বিস্ময়কর ঘটনা।

(২) তাঁকে সে ব্যক্তির অবস্থা জিজ্ঞাসা করবে, যে পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিম এবং সারা বিশ্ব সফর করেছিলো। তার ঘটনা কী?

(৩) তাঁকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করবে যে, রূহ কী?

 

তারা মক্কায় ফিরে এসে বললো-  আমরা একটি চূড়ান্ত ফয়সালাকারী বিষয় নিয়ে ফিরে এসেছি। অতঃপর কোরাইশরা রসূলুল্লাহ্‌ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এ প্রশ্নগুলো নিয়ে হাজির হলো এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমাদের প্রশ্নের জবাব আগামীকাল জিব্রাঈল আমিন আসলে বলে দিবো। তিনি ইনশাআল্লাহ বলতে ভুলে যান। ফলে ১৫ দিন পর্যন্ত ওহী আসা বন্ধ থাকে। এদিকে কাফেররা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে থাকে “মুহাম্মাদের প্রভু মুহাম্মাদকে ভুলে গেছে”।  ওহী আসা বন্ধ থাকাতে আল্লাহর রাসূলের খুবই কষ্ট হচ্ছিলো। তার উপর কাফেরদের এমন কথাবার্তায় আল্লাহর রাসূল খুবই ব্যথিত হন।  ১৫ দিন পর জিব্রাঈল আমিন ওহী নিয়ে দুনিয়াতে আসেন। সূরাতুল “কাহাফ” অবতীর্ণ হয়। এই সূরায় কাফেরদের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া হয়।

 

 “কাহাফ” অর্থ গুহা। আর “আসহাবে কাহাফ” অর্থ “গুহাবাসী”।গুহাবাসীদের ঘটনাটি ঘটেছিলো প্রাচীন গ্রিক শহর আনাতোলিয়ায় । বর্তমানে ভৌগোলিকভাবে শহরটি তুরস্কে অবস্থিত। তবে কুরআনে অবশ্য নাম-ঠিকানা উল্লেখ করা নেই। পবিত্র কোরআন শরীফে আসহাবে কাহাফের ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে-

 

বর্তমানে গুহার বাইরে এই ফলক রয়েছে

 

তুমি কি মনে করো যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার বিস্ময়কর নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভুক্ত ছিলো? যখন যুবকেরা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলো এবং বলেছিলো: “হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে নিজের কাছ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজ সঠিকভাবে পূর্ণ করুন।”

তখন আমি কয়েক বছরের জন্য গুহায় তাদের ঘুমন্ত অবস্থায় রাখলাম। অতঃপর আমি তাদেরকে পুনরুত্থিত করি, একথা জানার জন্যে যে, দুই দলের মধ্যে কোন দল তাদের অবস্থানকাল সম্পর্কে অধিক নির্ণয় করতে পারে। আপনার কাছে তাদের ইতিবৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক।  তারা তাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিলো এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমি তাদের মন দৃঢ় করেছিলাম, যখন তারা উঠে দাঁড়িয়েছিলো।

অতঃপর তারা বললো:  “আমাদের পালনকর্তা আসমান ও যমীনের পালনকর্তা, আমরা কখনও তার পরিবর্তে অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকবো না। যদি করি, তবে তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ হবে।  এরা আমাদেরই স্ব-জাতি, এরা তাঁর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে। তারা এদের সম্পর্কে প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থিত করে না কেনো? যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, তার চাইতে অধিক পাপী আর কে আছে?”

তোমরা যখন তাদের থেকে পৃথক হলে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাদের থেকে, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করো। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্যে দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজকর্মকে ফলপ্রসূ করার ব্যবস্থা করবেন। তুমি সূর্যকে দেখবে, যখন উদিত হয়, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যায় এবং যখন অস্ত যায়, তাদের থেকে পাশ কেটে বাম দিকে চলে যায়, অথচ তারা গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত। এটা আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম। তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা নিদ্রিত।

 

আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডান দিকে ও বাম দিকে। তাদের কুকুর ছিলো সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। যদি তুমি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতে, তবে পেছন ফিরে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়তে। আমি এমনিভাবে তাদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বললো: “তোমরা কতকাল অবস্থান করেছো?” তাদের কেউ বললো: “একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছি।” কেউ কেউ বললো: “তোমাদের পালনকর্তাই ভালো জানেন তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ।

এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ শহরে প্রেরণ করো; সে যেন দেখে কোন খাদ্য পবিত্র। অতঃপর তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য; সে যেন নম্রতা সহকারে যায় ও কিছুতেই যেন তোমাদের খবর কাউকে না জানায়। তারা যদি তোমাদের খবর জানতে পারে, তবে পাথর মেরে তোমাদেরকে হত্যা করবে, অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। তাহলে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।”

এমনিভাবে আমি তাদের খবর প্রকাশ করে দিলাম, যাতে তারা জ্ঞাত হয় যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কেয়ামতে কোনো সন্দেহ নেই। যখন তারা নিজেদের কর্তব্য বিষয়ে পরস্পর বিতর্ক করছিলো, তখন তারা বললো: “তাদের উপর সৌধ নির্মাণ করো”। তাদের পালনকর্তা তাদের বিষয়ে ভালো জানেন। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হলো, তারা বললো: “আমরা অবশ্যই তাদের স্থানে উপাসনালয় নির্মাণ করবো”।

অজ্ঞাত বিষয়ে অনুমানের উপর ভিত্তি করে এখন তারা বলবে: তারা ছিলো তিন জন, তাদের চতুর্থটি তাদের কুকুর। একথাও বলবে, তারা পাঁচ জন। তাদের ষষ্টটি ছিল তাদের কুকুর। আরও বলবে, তারা ছিলো সাত জন। তাদের অষ্টমটি ছিলো তাদের কুকুর। বলুন: আমার পালনকর্তা তাদের সংখ্যা ভালো জানেন। তাদের খবর অল্প লোকই জানে। সাধারণ আলোচনা ছাড়া তুমি তাদের সম্পর্কে বিতর্ক করবে না এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদও করবে না। তাদের উপর তাদের গুহায় তিনশ বছর, অতিরিক্ত আরও নয় বছর অতিবাহিত হয়েছে। বলো: তারা কতকাল অবস্থান করেছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে রয়েছে।” [আল কুরআন ১৮:৯-২৬]

এটুকুই কুরআন কাহিনীটি সম্পর্কে জানায়। তাফসির আততাবারিতে আল্লামা জারির তাবারী ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণনা করেন-

 

খ্রিস্টানরা যখন বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়লো , সমাজে পাপাচার বেড়ে গেলো, এমনকি তারা মূর্তি পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়লো এবং গাইরুল্লাহর নামে পশু যবেহ করতে শুরু করলো তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর অত্যাচারী বাদশা চাপিয়ে দিলেন। তার নাম ছিলো দাকয়ানূস। সে নিজেও মূর্তি পূজা করতো এবং গাইরুল্লাহর নামে যবেহ করতো। সে সময় অল্পসংখ্যক লোক ঈসা (আ:) এর আনীত দ্বীনের উপর অবিচল ছিলেন। তারা এক আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করতেন। কিন্তু দাকয়ানূস ঈসা (আ:)-এর ধর্মের অনুসারীদের উপর নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু করে।

 

সে তার সাম্রাজ্যের প্রতিটি জনপদে ঈমানদারদের ধরে ধরে হত্যা করে। যারা ঈমান ত্যাগ করে মূর্তি পূজায় লিপ্ত হতো তাদের সে ছেড়ে দিতো। এতে মুমিনগণ আতঙ্কিত হয়ে শহরের অলিগলিতে আত্মগোপন করে। কিন্তু দাকয়ানূসের বাহিনী তাদের ধরে নিয়ে আসে। তাদের মূর্তির সামনে  দুটি প্রস্তাব দেয়া হয়। হয় এই মূর্তির পূজা করতে হবে এবং মূর্তির নামে কোরবানি করতে হবে অন্যথায় জনসম্মুখ তাদের শূলে চড়িয়ে হত্যা করা হবে। এই কঠিন মুহূর্তে ঈমানদাররা মূত্যুকেই বেছে নেয়। তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের কর্তিত দেহাংশ শহরের প্রাচীরে ও প্রধান প্রধান ফটকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়।  আসহাবে ক্বাহফের সেই যুবকরা যখন দেখলো ঈমানদারদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তখন তারা খুবই ব্যথিত হলো।

 

ভয়ে আতঙ্কে তাদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেলো। তারা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইলো। “হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে নিজের কাছ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজ সঠিকভাবে পূর্ণ করুন”    সূরা কাহাফঃ১০ তারা ছিলো সাতজন যুবক । শহরের নেতৃস্থানীয় শাসকবর্গের সন্তান। দাকয়ানূস বাহিনী যখন  জানতে পারলো এই সাত যুবক তাদের উপাস্যদের ইবাদত করে না, তারা এক আল্লাহর ইবাদত করে, তখন তারা এ খবর বাদশাহকে জানালো। বাদশাহ এতে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে তাদের ধরে আনার হুকুম দিলো। তাদের নাম ছিলো মুকসালমিনা, তামলিখা,মারতুনিস, সানুনিস, সারিনুনিস, যুনিওয়াস, কাস্তিতিউনিস।

 

বাদশার সামনে তারা কী বলেছিলেন, আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ফরমানঃ আমাদের প্রভু মহাকাশ ও পৃথিবীর প্রভু । আমরা কখনো তাকে ছাড়া আর কোন ইলাহকে ডাকবো না। তেমনটি করলে সেটি হবে গর্হিত কাজ।   সূরা কাহাফঃ ১৪ দাকয়ানূস তাদের বক্তব্য শুনে বললোঃ তোমরা হলে নগরের অভিজাত বংশের সন্তান। বয়সেও তোমরা তরুণ। তাই তোমাদের আমি দুটি পথ বলে দিচ্ছি। চিন্তা-ভাবনা করো। হয় আমাদেরে ধর্মে ফিরে এসে রাজকীয় জীবন গ্রহণ করো, অন্যথায় তোমাদের সবাইকে অন্যদের মতো হত্যা করা হবে। তারপর তারা রাজদরবার থেকে বেরিয়ে  একটি গাছের নিচে এসে একত্রিত হলো। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সিদ্ধান্ত নিলো তারা অন্য কোথাও গিয়ে আত্মগোপন করবে এবং সত্য ধর্মে থেকে আল্লাহর ইবাদত করবে। রাজার উৎপীড়ন থেকে নিজেদের ঈমান ও জীবন রক্ষার জন্য তারা একটি পাহাড়ের  গুহায় আশ্রয় নিলো।