ঢাকা, সোমবার ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১২ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

আসহাবে কাহফের বিস্ময়কর ঘটনা (শেষ পর্ব)


প্রকাশিত: ৮:৫১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০২০

আসহাবে কাহাফের সাত যুবক যখন নিজ লোকালয় ছেড়ে অজানার পথে হিজরত করছিলেন, তখন তাদের সাথে একটি কুকুরও সফরসঙ্গী হলো। তার নাম ছিলো বুরাকিশ। তারা কুফফারদের জনপদ ছেড়ে অনেক দূর চলে আসলেন। তারপর তারাঅক্লন পাহাড়ের পাদদেশে এক গুহায় এসে আশ্রয় নিলেন। সেই গুহা তুরস্কের তারতুস নগরীতে এখনো টিকে আছে। দীর্ঘ পথ চলার পর তারা ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। প্রার্থনা শেষে পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে সামান্য বিশ্রামের উদ্দেশ্যে গুহার মধ্যকার যমীনে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। সাথে সাথেই হালকা ঘুম অনুভব করলেন এবং সেই হালকা ঘুমের পথ ধরেই গভীর নিদ্রায় চলে গেলেন।

পরেরদিন নির্দিষ্ট সময়ে  রাজদরবারে ঐ যুবকদের অনুপস্থিতিতে বাদশা ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। তাদের ধরে আনার জন্য লোক পাঠালেন। কিন্তু  আল্লাহ তায়ালা ঐ গুহা ও গুহাবাসী সম্পর্কে তাদের গাফেল করে রাখলেন। ফলে তারা অনেক খুঁজাখুঁজির পরেও তাদের কোন খোঁজ পেলো না। তাই তারা একটি সীসার ফলকে তাদের নাম, তাদের বংশপরিচয় ও তাদের হারিয়ে যাওয়ার তারিখ লিখে তা রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণে রেখে দিলো।

এটাই সেই গুহার প্রবেশদ্বার

এখানে ঘটে গেলো আল্লাহ তায়ালার এক বিষ্ময়কর ঘটনা: দিনের পর রাত আসছে। রাতের পর দিন। পার হয়ে গেছে বছরের পর বছর। যুবকগণ শুয়ে আছেন। গভীর নিদ্রা তাদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে । বাইরের কর্ম-ব্যস্ত জীবনের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। আকাশে বিজলীর গর্জন, বাতাসে ঝড়ের ক্ষিপ্রতা, কোন কিছুই তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে নি। সূর্য উদিত হওয়ার সময় ডান পাশে হেলে গেলে সামান্য আলো গুহার ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে এবং আল্লাহর হুকুমে তাদেরকে তাপ দেয়। সূর্যের প্রখর উত্তাপ সেখানে প্রবেশ করে না। আবার সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় একটু বাম দিকে হেলে যায়। খোদা পাকের অপার মহিমায় তাদের শরীরে কোন প্রকার সমস্যা হয় না। কুকুরটি তার দুই বাহু প্রসারিত করে বীরের মতো  প্রহরীর কাজে গুহারদ্বারে বসে আছে। এভাবে কেটে গেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন-

তুমি ধারণা করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা ঘুমন্ত । আমরা তাদের পাশ পরিবর্তন করে দিতাম ডান দিকে ও বাম দিকে। আর তাদের কুকুরটি ছিলো সামনের পা দুটি গুহার প্রবেশদ্বারের দিকে প্রসারিত করে। আপনি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখলে ভয়ে, আতঙ্কের পিছনে ফিরে পালাতেন।   কাহাফঃ ১৮

গুহার ভিতরের অংশ

গভীর নিদ্রায় তিনশত নয় বছর পার হয়ে গেলো। এবার তারা ক্ষুধা ও পিপাসায় দুর্বল শরীর নিয়ে জাগ্রত হলেন। তারা ভাবলেন সময় বেশি অতিক্রান্ত হয় নি। ইতিহাসের চাকা এখানেই থমকে ছিলো। তাদের একজন বললেনঃ হে বন্ধুগণ, আমার মনে হয় এখানে আমরা দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পার করেছি। তোমাদের মতামত কি?  অন্যজন বললেনঃ আমার মনে হয় পূর্ণ একদিন আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। যে ধরণের ক্ষুধা ও পিপাসা  অনুভব করছি, তাতে তাই মনে হয়।

তৃতীয়জন বললেনঃ সকালে ঘুমিয়েছি, এই দেখো, সূর্য এখনও ডুবে যায় নি। আমার মনে হয় একটি দিবসের কিয়দাংশই আমরা নিদ্রায় ছিলাম।

চতুর্থজন বললেনঃ ছাড়ো এসব মতভেদ। আল্লাহই ভাল জানেন, আমরা কতকাল এখানে ঘুমিয়েছি। কথা হচ্ছে আমার প্রচুর ক্ষুধা পাচ্ছে। মনে হচ্ছে কয়েকদিন যাবত না খেয়ে আছি। আমাদের একজন এখনই শহরে গিয়ে কিছু খাদ্য ক্রয় করে নিয়ে আসুক। সে যেন যাচাই-বাছাই করে হালাল খাদ্য ক্রয় করে নিয়ে আসে। কোনভাবেই যেন হারাম খাদ্য ক্রয় না করে। তবে তাকে অবশ্যই সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে। লোকেরা যদি আমাদের অবস্থান সম্পর্কে জেনে ফেলে তবে তারা আমাদেরকে হত্যা করবে অথবা আমাদেরকে ফিতনায় ফেলে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করবে। তখন তোমরা কিছুতেই সফল হতে পারবে না।

তাদের একজন পূর্ণ সতর্কতা ও  ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় শহরে প্রবেশ করলেন। তিনি দেখলেন কোন কিছুই আর আগের মতো নেই। ঘরবাড়িগুলো পরিবর্তন হয়ে গেছে। পুরাতন পরিত্যক্ত ঘরের স্থানে বিশাল বিশাল প্রাসাদ শোভা পাচ্ছে। আগের রাজপ্রাসাদগুলো জনমানবহীন অবস্থায় পড়ে আছে। তিনি যাদের দেখছেন তাদের কেউই পরিচিত নয়। নদীর স্রোত বয়ে চলছে , পরিবর্তিত রূপ ধারণ করে ঘরবাড়ি ও বন-বনানী ঠিকই আছে। নেই শুধু সেই মানুষগুলো।

তার দৃষ্টি বিচলিত হলো। এদিক সেদিক চোখ ঘুরাতে লোকেরা কিছুটা সন্দেহ করতে লাগলো। তার হাটা-চলার ভঙ্গিতে মানুষের মনে সন্দেহ আরো প্রকট হলো। লোকেরা তাকে ঘিরে ধরলো। উপস্থিত লোকদের একজন তাকে লক্ষ করে বললঃ আপনি কি ভিনদেশী? অন্য দেশ থেকে এসেছেন? এতো চিন্তা করছেন কি নিয়ে? কিছু অনুসন্ধান করছেন ?

তিনি বললেনঃ আমি এখানে অপরিচিত না। আমি কিছু খাদ্য ক্রয় করতে চাই। কিন্তু কোথায় তা বিক্রি হচ্ছে, জানি না। একজন লোক তার হাত ধরে খাদ্যের দোকানে নিয়ে গেলো। সেখানে তিনি রোপার তৈরী কয়েকটি দিরহাম বের করলেন। দোকানের মালিক দিরহামগুলো হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন, এ তো তিনশ বছরের অধিক সময় আগের তৈরী! সে ভাবলো এই ব্যক্তি হয়ত কোন গুপ্তধন পেয়েছেন। সম্ভবত এই দিরহামগুলো ছাড়াও তার কাছে বিপুল পরিমাণ দিরহাম রয়েছে। দোকানের মালিক বাজারের লোকদেরকে ডেকে একত্রিত করলো।

এবার গুহাবাসী লোকটি বললেন-  হে লোক সকল, দেখুন, আপনার যা ভাবছেন, বিষয়টি আসলে তেমন নয়। এই মূদ্রাগুলো লুকায়িত ধনভাণ্ডারের অংশ না। গতকাল মানুষের সাথে লেনদেনের সময় তা আমার হস্তগত হয়েছে। আর এই তো আজ আমি তা দিয়ে কিছু খাদ্য ক্রয় করতে চাচ্ছি। আপনারা তাতে এতো আশ্চর্য হচ্ছেন কেন? আমি তো কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। আর কেনই সন্দেহের উপর ভিত্তি করে আমার বিরুদ্ধে গুপ্তধন পাওয়া ও তা লুকিয়ে রাখার অপবাদ দিচ্ছেন?

এই কথা বলে তিনি স্থান ত্যাগ করতে চাইলেন। কিন্তু লোকেরা কিছুতেই তাকে ছেড়ে দিতে রাজি হলো না। ভিড় ভেঙ্গে কিছু লোক একাকী তার সাথে নম্র ভাষায় কথা বলতে লাগলেন। কথার এক পর্যায়ে তারা জানতে পারলেন, তিনি হচ্ছেন তিনশত নয় বছর পূর্বে জালেম বাদশা দাকায়ানুসের পাকড়াও থেকে পলায়নকারী সম্ভ্রান্ত বংশের সাতজন যুবকের একজন। তারা আরও আশ্চার্যান্বিত হলেন ! এবং আরও জানতে পারলেন যে, তারা হলেন ঐ সমস্ত যুবক যাদের অনুসন্ধানে বাদশাহ সকল প্রচেষ্টাই ব্যয় করেছিলো, কিন্তু তাদের কোন সন্ধান পায় নি। যুবকটি এবার আরও শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। কারণ এখন লোকেরা তাদের ব্যাপারটি জেনে ফেলেছে। তাই তিনি নিজের ও তাঁর সাথীদের জীবন নাশের ভয়ে পালাতে উদ্যত হলেন। লোকদের মধ্যে হতে একজন বললো-  হে ভাই , আপনি ভয় পাবেন না। আপনি যেই জালেম বাদশাহর ভয় করছ, সে তো প্রায় তিনশ বছর আগেই ধ্বংস হয়েছে। এখন যিনি এই রাজ্যের বাদশাহ তিনি আপনার সাথীদের মতই একজন মুমিন বান্দা। এবার বলেন, আপনার অন্যান্য সাথীগণ কোথায়?

যুবকটি এবার আসল ঘটনা বুঝতে পারলেন। ইতিহাসের সেই দীর্ঘ দূরত্বও তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন, যা তাকে মানব সমাজ থেকে আলাদা করে রেখেছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এখন তিনি মানুষের মাঝে চলমান একটি ছায়া ব্যতীত আর কিছুই নন। এরপর তিনি লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন-  আমাকে গুহার অভ্যন্তরে বন্ধুদের কাছে যেত দিন। আমি তাদেরকে আমার ও আপনাদের অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ দেবো। তারা দীর্ঘক্ষণ যাবত আমার অপেক্ষায় আছেন। আমার মনে হচ্ছে, তারা আমার ব্যপারে চিন্তিত।

 এদিকে বাদশাহও তাদের খবরটি জেনে ফেললেন। তিনি গুহাবাসীদের সাথে সাক্ষাত করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। দেড়ি না করে দ্রুত গুহার দিকে চলে আসলেন। তিনি তাদেরকে উজ্জ্বল চেহারায় জীবিত অবস্থায় দেখতে পেলেন। তাদের সাথে মুসাফাহা ও আলিঙ্গন করলেন। তিনি তাদেরকে রাজপ্রাসাদে আহবান জানালেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের আমন্ত্রণ জানালেন।

তারা তখন বললঃ দেখুন, নতুনভাবে জীবন যাপনে আমাদের আর আগ্রহ নেই। আমাদের ঘরবাড়িগুলো বিলীন হয়ে গেছে, পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততি কেউ জীবিত নেই। সময়  আমাদের মাঝে দীর্ঘ পর্দা টেনে দিয়েছে। স্বাভাবিক জীবন-যাপনে এখন আমাদের কোন যোগসূত্রও নেই। এই পার্থিব জীবনের দিকে ফিরে গিয়ে আর কি লাভ? তারপর তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের আবেদন করলেন। তাঁর কাছে ফিরে যাওয়াকেই পছন্দ করলেন।  তাঁর প্রশস্ত রহমত দ্বারা তাদেরকে আবৃত করা প্রার্থনা করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। দেহ থেকে তাদের প্রাণবায়ু  চিরদিনের জন্য বের হয়ে গেলো। তারা আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন।

তাদের কিছু লোক তাদের কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করতে চাইলো , কিন্তু অধিকাংশ লোক বললো- না, আমরা তাদের অবস্থানের উপর মসজিদ নির্মাণ করবো। (সূরা কাহাফ: ২১)