আল্লামা ইকবাল: একটি নাম, একটি জাগরণ (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ৮:৩৯ অপরাহ্ণ, জুন ২২, ২০২০

আল্লামা ইকবাল, যার দর্শনে প্রভাবিত হয়ে অখণ্ড পাকিস্থান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ৷ ইসলামী পুনর্জাগরণের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম দিয়েছিলেন তাঁরই স্নেহধন্য সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী৷ এমনকি ইরানে ইসলামী বিপ্লবের চিন্তানায়ক ড. আলি শারয়াতিও তাঁর দর্শনে প্রভাবিত ছিলেন৷ তিনি ছিলেন ইসলামী পুনর্জাগরণের কবি, ভারতবর্ষে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা ও পাকিস্তানের আধ্যাত্মিক জনক৷ মহামহীম পরওয়ারদেগার তাকে উত্তম প্রতিদান দিন৷

 

একজন দর্জির ঘরে জন্ম  নিয়েও যে জগদ্বিখ্যাত হওয়া যায়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন আল্লামা ইকবাল। তাঁর পিতা শেখ নুর মুহাম্মাদ ছিলেন প্রাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোটের অন্যতম টুপি-ব্যবসায়ী৷ মা ইমাম বিবি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও নেককার মহিলা। তাঁর কোল আলোকিত করে  ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর আল্লাম ইকবাল জন্ম নেন।

 

ইকবালের পূর্ব-পুরুষগণ ছিলেন কাশ্মীরের বাসিন্দা। উনিশ শতকে শিখ সাম্রাজ্য যখন কাশ্মীর দখল করে নেয় তখন তাঁর দাদা বর্তমান পাকিস্তানের প্রাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোটে এসে বসতি স্থাপন করেন।

 

আল্লামা ইকবালের পিতা  শেখ নূর মুহাম্মদ ছিলেন ইসলামের শাশ্বত বিধানের প্রতি গভীর অনুরাগী। দ্বীন ইসলামের খেদমত করার জন্য হৃদয়ে কতটা আগ্রহ ও ভালোবাসা লালন করতেন, তা দু’টি ঘটনার দিকে লক্ষ করলেই বুঝে আসে।

 

আল্লামা ইকবালের জন্মের পর যখন তাঁকে পিতার কোলে দেয়া হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যদি তোমার এই জীবন ইসলামের কোনো উপকারে আসে তাহলে দীর্ঘজীবী হও, অন্যথায় এ জীবন মূল্যহীন।’

শিয়ালকোটের সেই জরাজীর্ণ ঘরের মেঝেতে পিতার কোলে বসে ইকবাল কি বুঝতে পেরেছিলেন জীবনের মূল্য? সেই মূল্যবোধই কি মুসলিম হোমল্যান্ডের স্বপ্নদ্রষ্টা আল্লামা ইকবালকে তাড়া করে বেড়িয়েছে সারাজীবন?

 

মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু ইকবাল মাওলানা গোলাম হাসান ও সৈয়দ মীর হাসানের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। স্কচ মিশন স্কুলের শিক্ষক সৈয়দ মীর হাসান মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তনে খুব আগ্রহী ছিলেন। পিতা শেখ নূর মুহাম্মদের অনুমতিক্রমে ইকবালকে তিনি স্কচ মিশন স্কুলে ভর্তি করেছেন। এখানেও ইকবালের সঙ্গে তাঁর বাবার  ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। বাবা বললেন, ‘যদি স্কুল থেকে ফেরত এসে বাকী জীবন ইসলামের খেদমত করতে পারো, তাহলে আমি তোমাকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেব।’   ইকবাল কথা রেখেছিলেন। পিতার সঙ্গে কৃত ওয়াদা জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন।

 

প্রাথমিক স্তর থেকে এফএ পর্যন্ত দশ বছরকাল তিনি সৈয়দ মীর হাসানের তত্ত্বাবধানে শিক্ষাগ্রহণ করেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সৈয়দ মীর হাসান অভিনব পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণ ইকবালের মনে প্রবল জ্ঞান পিপাসা জাগিয়ে তোলেন।

 

আল্লামা ইকবাল ১৮৮৮  সালে প্রাথমিক, ১৮৯১ সালে মিডল এবং ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি ও মেডেলসহ উত্তীর্ণ হন। ১৮৯৫ সালে ইকবাল ঐ কলেজ থেকে এফএ পাস করেন এবং একই বছর ১৮ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে লাহোর গমন করেন। 

 

১৮৯৭ সালে লাহোর সরকারি কলেজ থেকে আরবী ও ইংরেজিতে প্রথম স্থান ও দু’টি স্বর্ণ পদক লাভ করে স্নাতক ও ১৮৯৯ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে স্বর্ণ পদকসহ মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।

 

১৯০৫ সালে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য লন্ডন পাড়ি জমান। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দর্শন শাস্ত্রে আবারো মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন৷ এ সময় তিনি শিষ্যত্ব লাভ করেন বিশ্বখ্যাত দার্শনিক ড. এম সি ট্যাগার্টের।

 

এরপর তিনি পশ্চিম ইউরোপ ভ্রমণে বের হন। শেষে জার্মানীর মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ১৯০৭ সালে পারস্যের দর্শন শাস্ত্র বিষয়ক  “The Development of Metaphzsics in Persia” বিষয়ের উপর গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। সর্বশেষ লন্ডন হতে ডিস্টিংশন সহকারে ব্যারিস্টারী পাস করেন আল্লামা ইকবাল।

 

ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন অবসানের পর কাশ্মীরের মুসলমানরা নানাবিধ নির্যাতন ও লাঞ্চনার শিকার হয়। অসহায় কাশ্মীরি মুসলমান ভাই-বোনদেরকে সহযোগিতা করার জন্য লাহোরে চলে আসা কাশ্মীরীরা “আঞ্জুমান” নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর আল্লামা ইকবাল এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যেহেতু তিনিও ছিলেন মূলত কাশ্মীরী। এবং তাঁর পূর্বপুরুষরা নির্যাতনের শিকার হয়েই কাশ্মীর ছেড়েছিলেন।।

বাকি অংশ দ্বিতীয় পর্বে