ঢাকা, রবিবার ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১১ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

আল্লামা ইকবাল: একটি নাম, একটি জাগরণ (দ্বিতীয় পর্ব)


প্রকাশিত: ৩:০৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৪, ২০২০
একাধারে কবি, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞ আল্লামা ইকবাল ছিলেন প্রচণ্ড শিকড়-আকড়ে-থাকা মানুষ৷ যৌবনকাল কাটিয়েছেন ইউরোপের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে৷ কঠোর অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে জ্ঞানের রস নিংড়ে এনেছেন৷ কিন্তু ইউরোপের জীবনধারায় গা ভাসান নি।
ছাত্রাবস্থায় ১৮৯৬ সালে শিয়ালকোটের এক কবিতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর কবি প্রতিভার বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। এরপর তিনি বেশ কিছু কবিতা লিখে হায়দারাবাদের প্রখ্যাত কবি ‘দাগ’ এর নিকট পাঠিয়েছিলেন সংশোধনের জন্য।
কবি দাগ কিশোর কবির এ কবিতাগুলি পেয়ে মনোযোগ সহকারে পড়েন ও চমৎকার একটি মন্তব্য লিখে পাঠান। কবি দাগ লিখেছিলেন, ‘এ কবিতাগুলি সংশোধন করার কোন দরকার নেই। এগুলো কবির স্বচ্ছ মনের সার্থক, সুন্দর ও অনবদ্য ভাব প্রকাশের পরিচয়ক ।’ কবি ইকবাল এ চিঠি পেয়ে খুব উৎসাহ পেলেন। তাঁরপর থেকে চললো তাঁর বিরামহীন কাব্যসাধনা।
১৯০০ সালে তিনি লাহোরে অনুষ্ঠিত আঞ্জুমানে হিমায়েতে ইসলাম-এর বার্ষিক সাধারণ সভায় জীবনের প্রথম জনসমক্ষে তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘নালা ইয়াতীম’ বা অনাথের আর্তনাদ পাঠ করেন। কবিতাটি পড়ার পর চারিদিকে হইচই পড়ে যায়৷ কবিতাটি এত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলো- তাৎক্ষণিকভাবে কবিতাটি ছাপা হয় এবং প্রতিটি কপি সে সময় চার টাকা দামে বিক্রি হয়। বিক্রয়লব্ধ  টাকা তিনি ইয়াতিমদের সাহায্যার্থে  দান করে দেন ।

১৯০১ সালে তিনি ছোটদের জন্য লেখেন- মাকড়সা ও মাছি, পর্বত ও কাঠবিড়ালি, শিশুর প্রার্থনা, সহানুভূতি, পাখীর নালিশ ও মায়ের স্বপ্ন প্রভৃতি কবিতা। এরপর আরও অসংখ্য কবিতা বের হয়েছে তাঁর ক্ষুরধার কলম থেকে৷

সূফী কবি রুমী ছিলেন ইকবালের কাব্যপথের আলোকবর্তিকা। আল্লামা ইকবাল ‘আসরারে খুদিগ্রন্থে’ গ্রন্থে তাঁর উপর রুমীর আধ্যাত্মিক প্রভাবের বিবরণ দিয়ে রুমীর স্তুতি বর্ণনায় লিখেছেন,-

“রুমীর প্রতিভায় অনুপ্রাণিত আমি
আবৃত্তি করে যাই গোপন রহস্যের মহাগ্রন্থ।
আত্মা তাঁর জ্বলন্ত অগ্নিকু-
আমি শুধু স্ফুলিঙ্গ
যা জ্বলে ওঠে মুহূর্তের জন্য।”

 

নবী প্রেমের গান আল্লামা ইকবালের মতো কয়জন গেয়ে যেতে পেরেছেন!

“কী মুহাম্মদ সে ওয়াফা তুনে, তো হাম
তেরে হ্যায়,
ইয়ে জাহা চিজ হ্যায় কেয়া? লওহ কলম
তেরে হ্যায়”।
‘জওয়াবে শেকওয়া’র শেষ চরণ’।

আমাদের জাতীয় কবি, বাংলার বিদ্রোহী কবি, কাজী নজরুল ইসলাম, কবি ইকবালের এ অমর পংক্তিটির কাব্যানুবাদ কী সুন্দরই না করেছেন –

“আল্লাহ্ কে যে পাইতে চায়,
হযরতকে ভালবেসে,
আরশ-কুরসী,লওহ-কলম
না চাহিতে পেয়েছে সে।”

আল্লামা ইকবাল সারাটা জীবন কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন— তিনি কখনো দুর্দশাগ্রস্থ মুসমানদের কথা ভুলেন নি।
সকল বিবাদ-বিসংবাদের উর্ধ্বে গিয়ে নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষে লড়েছেন। মুসলিম জাতীয়তাবাদের চিন্তা তাঁকে কখনো স্বার্থপর ও বিলাসী হয়ে উঠতে দেয়নি। তিনি সারাজীবন একজন দুঃখী মানুষ ও একটি অবরুদ্ধ পাখির বেদনায় কেঁদেছেন। হিন্দুস্তানের মাটির পক্ষে গেয়ে গেছেন নিষ্কলুষ প্রেমের গান। তাইতো তিনি ইউরোপমুখী প্রফেসর ইকবাল না হয়ে হয়ে উঠেছেন আমাদের আল্লামা ইকবাল।