ঢাকা, শনিবার ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৬ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

আলেমদের গালমন্দ করার ভয়াবহ পরিণতি


প্রকাশিত: ৪:০৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৮, ২০২০

আলেমদের গালমন্দ করার ভয়াবহ পরিণতি।

লিখেছেন: মাওলানা নূরুল হুদা।

 

আলেমগণ নবীদের উত্তরসূরী, এবং নিঃসন্দেহে আম্বিয়ায়ে কেরাম, সাহাবা, তাবেয়ীনদের পরে ওলামায়ে কেরাম সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি। জাহিলিয়্যাতের ঘোর অন্ধকারে তাঁদের উপমা হলো আলোর মশালের মতো, যে মশাল মানুষের জন্য আলো বিতরণ করে। উদ্ভ্রান্ত জাতির হাত ধরে ধরে তাঁরা হেদায়াত, কল্যাণের পথে রাহনুমায়ী করেন।

 

সমস্ত মানুষের মধ্য থেকে আলেমরাই আল্লাহ তা’য়ালাকে অধিক ভয় করেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “বান্দাদের মধ্য থেকে আলেমগণই আল্লাহ তা’য়ালাকে অধিক ভয় করে থাকেন।(১)

সাধারণ জনগণের তুলনায় আলেমদের মর্যাদা অনেক বেশি, এরশাদ হয়েছে, “আপনি বলুন, (হে নবী) যারা জানে আর যারা জানে না তারা উভয়ে কি সমান হতে পারে!(২)

আল্লাহ তা’য়ালা আলেমদের শান, মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন, যা নিম্নোক্ত আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়। “আল্লাহ তা’য়ালা স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, এবং ফেরেশতাগণ, আলেমগণ ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর।(৩)

আল্লাহ তা’য়ালা যাদেরকে নিজ সত্তার সাথে, ফেরেশতাগণের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন তাাঁদেরকে সম্মান করা মুসলমানদের জন্য আবশ্যক।

 

কিন্তু আফসোসের কথা হলো—ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা ও মুসলমানদের বিশুদ্ধ পথে পরিচালনা করার জন্য যে আলেমগণ নিজেদের সর্বস্ব কোরবান করেছেন, তাদেরকেই ধৃষ্টতা ও ঔদ্ধত্য দেখিয়ে গালি দিচ্ছে কিছু লোক, এমন লোকদের পরিণতি ভয়ংকর। বস্তুত, আলেমদের সমালোচনা ধর্মের সমালোচনার নামান্তর।

 

ইমাম ত্বহাবী রহ. তাঁর বিখ্যাত “আকিদাহ” গ্রন্থে বলেন, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ওলামায়ে কেরাম- যারা হাদীস, ফিকহ, দ্বীনি দূরদর্শীতাসম্পন্ন—ন্যায়সঙ্গ পন্থা ব্যাতিত তাঁদের সমালোচনা জায়েজ নেই। যারা অন্যায়ভাবে তাদের সমালোচনা করবে তারা গোমরাহ হিসেবে গণ্য হবে।(৪)

এজন্যই সালাফগণ আলেমদের গালি দেয়া থেকে বিরত থাকতেন।

হাফেজ ইবনে আসাকির রহ. বলেন, “জেনে রাখো হে আমার ভাই (আল্লাহ তায়ালা আমাকে, তোমাকে তাঁর সন্তুষ্টি নসীব করুন, আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা মুত্তাকি, পরহেজগার)। পরকথা হলো যে— আলেমদের রক্ত বিষাক্ত, এবং তাদের দোষ চর্চাকারীদের গুনাহ প্রকাশের ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান স্বতঃসিদ্ধ। কেননা, যা থেকে তারা নির্দোষ সেই দোষে তাদেরকে দোষারোপ করা ভয়াবহ অন্যায়, তাদের উপর মিথ্যা অপবাদ দেয়া জাত স্বভাব, ইসলাম প্রচারের জন্য আল্লাহ যাদের মনোনীত করেছেন তাদের মতের বিরোধিতা করা গর্হিত আচরণ”। (৫)

আহমদ বিন হাম্বল রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত:
“আলেমদের রক্ত বিষাক্ত। যে তাাঁর ঘ্রাণ নিবে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে, যে তা ভক্ষণ করবে সে মারা যাবে”।(৬)

মালেক বিন দিনার রহিমাহুল্লাহ বলেন,
“কোনো ব্যক্তি খেয়ানতকারী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে বিশ্বাসঘাতকতার পক্ষে আমিন হবে, আর কোনো ব্যক্তি খারাপ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে বদ লোক হয়েও আল্লাহর নেককার বান্দাদের সমালোচনা করে”।(৭)

ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন,
“যে আলেমদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে, তার আখেরাত বরবাদ হয়ে যাবে”।(৮)

আবু সিনান রহিমাহুল্লাহ বলেন,
দ্বীনের মাসআলা শিক্ষা গ্রহণের পূর্বেই যদি কোনো ছাত্র সমালোচনা শিখে যায়, তাহলে সে কীভাবে সফল হবে!”(৯)

আহমদ বিন আযরয়ী রহিমাহুল্লাহ বলেন,
“আলেমদের সমালোচনা, (বিশেষ করে আকাবির ওলামায়ে কেরামের) কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত”।(১০)

 

★আলেমদের সমালোচনাকারীদের শাস্তি ও পরিণাম:

১. পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার পরে ফাসেক উপাধিতে ভূষিত হওয়া।

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পুরুষরা যেনো একে অপরকে তিরস্কার না করে, হতে পারে তারা যাদেরকে তিরস্কার করা হয়েছে তিরস্কারকারীদের থেকে উত্তম, এবং কোনো মহিলারা যেনো একে অপরকে তিরস্কার না করে, হতে পারে তারা (তিরস্কৃতরা) তিরস্কারকারীনীদের থেকে উত্তম, তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না, একে অপরকে খারাপ উপাধিতে ভূষিত করো না, ঈমানের পরে ফাসেক নাম ধারণ করা কতইনা নিকৃষ্ট। আর যারা তওবা করলো না, তারাই তো জালেম”। (১১)

 

২. মন্দ প্রথা জারি করার গুনাহ:

কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার দেখাদেখি আলেমদের গালিগালাজ করবে, তাদের গুনাহের বোঝা তার ওপরও আপতিত হবে। যেমনিভাবে কল্যাণকর কাজে পথ দেখানো ব্যক্তি অনুরূপ কল্যাণের অধিকারী হয়, তেমনিভাবে খারাপ কাজে উৎসাহ প্রদানের কারণে অনুরূপ খারাপ কাজের দায়ও তার উপর আসবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর আমি সংরক্ষণ করে রাখবো তারা যা অগ্রে প্রেরণ করেছে, এবং তাদের কর্মের প্রতিদান। (১২)

 

৩. সে নিকৃষ্ট মানুষ হিসেবে গণ্য হবে:

আহমদ বিন আব্দুর রহমান ইবনে গন্ম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, “আল্লাহর উত্তম বান্দা তারাই, যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা মনে পড়ে, আর আল্লাহর নিকৃষ্ট বান্দা হলো তারা,‌ যারা চোগলখুরী করে, মুমিনদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটায়, নির্দোষ ব্যক্তিদের দোষ তালাশ করে”।(১৩)

 

৪. আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা:

যেমন হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আছে “যে আমার কোনো বন্ধুর প্রতি শত্রুতা পোষণ করবে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবো”।(১৪)

 

৫. মজলুম আলেমের দোয়া কবুলের লক্ষ্যবস্তু হওয়া:

সাধারণ মজলুমের দোয়া এবং আল্লাহর মাঝে যেখানে কোনো আবরণ থাকে না, সেখানে আল্লাহর অলির দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে তো সন্দেহের কোনো সুযোগ নেই।

হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত আছে, “আমার অলি যদি আমার কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করে, আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি, এবং যদি কোনো কিছু থেকে পানাহ চায়, আমি অবশ্যই তাঁকে মুক্তি দান করি”।(১৫)

 

বর্ণিত আছে ,তালেবে ইলেমদের পিছনে উজিরের প্রচুর ধন-সম্পদ ব্যয় করার বিষয়টি যখন বাদশা মেনে নিতে পারছিলেন না, তখন উজির জবাব দিলেন—আমি আপনার জন্য এই সম্পদ ব্যয়ের মাধ্যমে এমন সৈন্য প্রতিষ্ঠা করেছি, শেষ রাতে যাদের দোয়ার নিশানা ফিরিয়ে দেয়া হয় না। একথা শোনার পর বাদশা সম্মতি জ্ঞাপন করলেন এবং উজিরকে সাহায্য করলেন।(১৬)

 

৬. তাকে তার আমলের অনুরূপ সাজা দেওয়া হবে:

অর্থাৎ পরবর্তী জীবনে তাকেও সমালোচনা ঠাট্টা-বিদ্রুপের শিকার হতে হবে।

ইরশাদ হয়েছে, “আর এগুলো তোমাদের হাত যা অগ্রে প্রেরণ করেছে তার শাস্তিস্বরূপ, এবং আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের উপর অত্যাচারী নন।(১৭)

 

৭. অন্তরের মৃত্যু দিয়ে আল্লাহ তাকে বিপদে ফেলবেন:

হাফেজ ইবনে আসাকির রহিমাহুল্লাহ বলেন,
যে ব্যক্তি আলেমদেরকে নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে, আল্লাহ তা’আলা তার অন্তরের মৃত্যু দিয়ে তাকে বিপদগ্রস্ত করবেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যারা আল্লাহ তায়ালার বিধি-বিধানের বিরোধিতা করবে তারা যেনো সতর্ক থাকে, হয় তারা ফেতনায় আক্রান্ত হবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সম্মুখীন হবে।(১৮)

 

৮. কুরআনে কারীমের বিধি-বিধান বয়ান, দ্বীনের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদানের কারণে, যারা জেনেশুনে ওলামায়ে কেরামকে গালি দিবে, তাদের জন্য ভয়াবহ শাস্তির ঘোষণা রয়েছে‌। এক্ষেত্রে তাদের কোনো ওজর গ্রহণযোগ্য হবে না।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে নবী! আপনি বলুন, তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে নিয়ে, তাাঁর আয়াত নিয়ে, তাঁর রাসূলকে নিয়ে উপহাস করছো! তোমরা কোনো ওজর পেশ করো না, ঈমান আনার পর তোমরা অবশ্যই কুফরীতে লিপ্ত হয়েছো”।(১৯)

 

৯. তার শেষ পরিণতি হবে বীভৎস:

বর্ণিত আছে, বিখ্যাত শাফেয়ী আলেম মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ জুবাইদী, যিনি তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন, হাদিস, ফিকাহ বিভিন্ন শাস্ত্রে তিনি পণ্ডিত ছিলেন, তার ছাত্র ও ভক্তবৃন্দের সংখ্যাও ছিলো অগণিত। কিন্তু তার মৃত্যুর আগ মুহূর্তে জামাল মিশরী খেয়াল করলেন, তার জিহবা ঝুলে পড়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, তার এই ভয়ঙ্কর পরিণতির কারণ ছিলো, তিনি জীবদ্দশায় ইমাম নববীর সমালোচনা করেছিলেন।(২০)

 

★আলেমদের গালমন্দ করার কুফল:

 

ক. তাঁদের ইলমের মাধ্যমে উপকৃত না হওয়া।

খ. আলেমদের গালমন্দ করা, দোষ চর্চা করার অর্থ হলো প্রকারান্তরে কোরআন ও হাদিসের দোষ চর্চা করা।

 

মোটকথা; এই উম্মতের মেরুদণ্ড হলেন ওলামায়ে কেরাম। অতএব, যে জাতি তাঁদের মেরুদণ্ডকে অবহেলা করবে, তাদের বেঁচে থাকার কোনো সার্থকতা নেই। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে দ্বীনের সহীহ সমঝ দান করুন, আলেমদের যথাযথ কদর করার ও তাাঁদের কথা মেনে চলার তাওফিক দান করুন, আমিন।।

 

টীকা:

(১) সূরা ফাতির, আয়াত: ২৮.
(২) সূরা জুমার, আয়াত: ০৭.
(৩) সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৮.
(৪) আল আকিদাতুত ত্বহাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৪৫.
(৫) তাবয়ীনু কিযবিল মুফতারী, পৃষ্ঠা: ২৮.
(৬) আল মুয়ীদ ফি আদাবিল মুফিদি ওয়াল মুস্তাফীদ, পৃষ্ঠা: ৭১.
(৭) শুআবুল ঈমান লিল বায়হাকি, খণ্ড- ০৫, পৃষ্ঠা ৩১৬. সিফাতুস সফওয়াহ, খণ্ড- ০৩, পৃষ্ঠা: ২৮৬.
(৮) সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, খণ্ড- ০৪, পৃষ্ঠা: ৪০৮.
(৯) তারতীবুল মাদারীক, খণ্ড- ০২, পৃষ্ঠা: ১৪.
(১০) আর রদ্দুল ওয়াফির, পৃষ্ঠা: ১৯৭.
(১১) সূরা হুজরাত, আয়াত: ১১.
(১২) সূরা ইয়াসিন, আয়াত: ১২.
(১৩) মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং: ৪৮৭১, ৪৮৭২.
(১৪) সহীহ বুখারী
(১৫) সহীহ বুখারী
(১৬) তুহফাতুত ত্বালীবিন, পৃষ্ঠা: ১১৫.
(১৭) সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৪২.
(১৮) সূরা নূর, আয়াত: ৬৩.
(১৯) সূরা তাওবা, আয়াত: ৬৫, ৬৬.
(২০) আদ দুরারুল কামিনাহ, খণ্ড- ০৪, পৃষ্ঠা: ১০৬।