আবু তোরাব, ওঠো!

প্রকাশিত: ৬:৩৬ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

লিখেছেন আরজু আহমেদ

আলী রা. আশৈশব বেড়ে উঠেছেন রাসূল ﷺ এর ঘরে। ঈমান এনেছেন ইসলামের একেবারে প্রারম্ভেই। আল্লাহর রাসূল ﷺ এর নবুওয়ত প্রাপ্তির সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র দশের কোঠায়।

সাফা পর্বতের উপর আরোহণ করে যেদিন আল্লাহর রাসূল ﷺ প্রকাশ্যে প্রথমবারের মত ইসলামের দাওয়াত দিলেন। সেদিন প্রত্যেকেই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এমনকি স্বীয় চাচা আবু লাহাব কেবল প্রত্যাখ্যানই নয় বরং অপমান করার জন্য তাঁর (ﷺ) দিকে মুঠো ভরা ধুলো ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিল, ‘ধ্বংস হও’৷ নেতৃস্থানীয় লোকেরা তাচ্ছিল্যভরে ফিরে যাচ্ছিল। আলী রা. তখনও তাঁর কৈশোর অতিক্রম করেন নি। এই উত্তেজিত ও বিক্ষিপ্ত জনতার মাঝে একা নির্ভয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাত তুললেন। তেরো/চৌদ্দ বছরের সৌম্যদর্শন শান্ত কিশোরটি সবটুকু জোর দিয়ে উঁচু গলায় বললেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন, হে আল্লাহ্‌র নবী।’

ইসলামের সেই শুরুর লগ্ন থেকে সাফল্যের চূড়োয় পৌঁছা অবধি প্রতিটি ধাপে তাঁর অকৃত্রিম অবদান ছিল। এই ইসলামের জন্য জীবনজুড়ে স্বীকার করেছেন বহু ত্যাগ৷

একবারের ঘটনা, তিনি জানতে পারলেন- আল্লাহ্‌র রাসুল (ﷺ) ক্ষুধার্ত। খাবার ছাড়াই তাঁকে বেরুতে হয়েছে। এদিকে তাঁর নিজের ঘরেও কিছুই নেই। তিনি কাজ খুঁজতে লাগলেন। একটা একটা করে খেজুরের বিনিময়ে তিনি এক ইহুদির কাছে মজুরি দিলেন। ইবনে আসাকির রহ. বর্ণনা করেন, এইভাবে সতেরোটা খেজুর মজুরি নিয়ে তিনি আল্লাহ্‌র নবী ﷺ এঁর কাছে উপস্থিত হলেন। আহা! কী অকৃত্রিমতা। মেয়ের জামাতা মাত্র কয়েকটা খেজুর নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন!

আল্লাহ্‌র নবী ﷺ নিজের প্রিয়তম কন্যাকে যখন আলী রা. এঁর কাছে বিবাহ দেন। তখন আলী রা. আর্থিক অবস্থা কেমন ছিল তা তাঁরই ভাষ্যে এভাবে বিবৃত হয়েছে, ‘আমার ঘরে কেবল একটামাত্র ভেড়ার চামড়া ছিল। সেটা বিছিয়ে আমরা রাতে ঘুমোতাম। আর দিনের বেলায় ছাগল চড়াতাম।’

আলী রা. এঁর কাছে একবার এক লোক এসে বললো, ‘আমীরুল মুমিনীন, আমাকে কিছু সাহায্য করুন। আলী রা. বললেন, আপনার প্রয়োজন মাটিতে লিখুন। আমি অমন আর্ত মুখের দিকে তাকাতে পারব না।’

এরপর লোকটা যা চেয়েছিলো, তিনি এরও অধিক তাঁকে প্রদান করলেন। তাঁর শাসনাধীন সময়ে কেউ দূরাবস্থায় আছে- সে মুখের দিকে তিনি কী করে তাকান! এটাই হচ্ছে, ন্যায়পরায়ণ শাসকসুলভ বিনম্রতা।

সতেরোই রমযান, আলী রা. রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতে মসজিদে গেলেন। ইবনে মুলযিম তাঁকে হত্যার জন্য তরোবারি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। অতর্কিতে তাঁর মাথায় আঘাত করলো।

আলী রা. সেই অবস্থাতেও যায়েদ ইবনে হুবায়রাকে ফজরের নামাজ আদায় করানোর নির্দেশ দিলেন।ক্ষতস্থান থেকে প্রচুর রক্তপাত হচ্ছিল। এমনকি সব দাড়ি লাল হয়ে গিয়েছিল।

ইবনে মুলযিম ধরা পড়লো। তাঁর সামনে বন্দিকে উপস্থিত করা হলে তিনি নির্দেশ দিলেন কারান্তরীণ করতে। তবে সে সঙ্গে ‘উত্তম আচরণের’ও নির্দেশ প্রদান করলেন।

এই উদারতা ইসলাম ছাড়া আর কে শেখায়! অথচ এই ইবনে মুলযিম তাকে হত্যার জন্য এক হাজার দিরহাম দিয়ে তলোয়ার কিনেছিল। আরও এক হাজার দিরহাম খরচ করে তাতে বিষ মিশিয়েছিল।

আলী রা. এর ক্ষতস্থান থেকে রক্তপাত বন্ধ হচ্ছিল না। সকাল পেরুতে না পেরুতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ৬৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

এমন একটা লোককে সেদিন ইবনে মুলযিম হত্যা করেছিল, যিনি ছিলেন তদানীং সময়ে এই জমিনের বুকে সবচে’ আল্লাহ্‌ ভীরু, উত্তম চরিত্র ও মহৎপ্রাণ মানুষ।

একবার আলী রা. কে আল্লাহ্‌র রাসুল ﷺ খুঁজতে গিয়ে দেখতে পান তিনি মসজিদে মাটির উপর শুয়ে আছেন। ধুলোতে তাঁর পিঠ সাদা হয়ে আছে। রাসুল ﷺ নিজে হাতে তা ঝারতে ঝারতে ডাকলেন, ‘ও আবু তোরাব’! আবু তোরাব, বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় ‘ধুলার বাপ’। আদর করে এই সম্বোধন করেছিলেন।

আলী রা. তাঁর অন্য সমস্ত গুণের সাথে সাথে একজন ভালো কবিও ছিলেন। তাঁর বাবা আবু তালিব ছিলেন আরবের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন।

আলী রা. বলতেন, ‘এমনভাবে লোকেরা দিন কাটায় যেন কখনো সে মরবেই না। অথচ যখন সে মৃত্যু বরণ করে তখন এমনভাবে মৃত্যুবরণ করে যেন কখনো জন্মই নেয় নি।’

এই যে, মৃত্যুর মত অনিবার্য সত্যকে ভুলে থাকা। ভুল পথে নিজেকে চালিত করা- তা শেষ পর্যন্ত আমাদের পুরোটা জীবনকেই আদতে মূল্যহীন করে দেয়। আল্লাহ্ আমাদের‌ দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন তাঁর ইবাদাতের জন্য। যে জীবন ইবাদাতহীন অতিক্রান্ত হয়, সে জীবন তো জন্ম না নেওয়ার মতই অর্থহীন। জন্মের মূল লক্ষ্য থেকেই তা বিচ্যুত।

আল্লাহ্‌ এই বিচ্যুতি থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আলী রা. যখন মারা যান, শেষ যে বাক্যটি তিনি বলেছিলেন,

‘কেউ যদি অণু পরিমাণও ভালো কাজ করে তবুও এর বিনিময় তাকে দেওয়া হবে- আর অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করলে এরও জবাবদিহিতা তাকে করতে হবে।’