আত্মোন্নয়ন এবং সফলতার মূলমন্ত্র ( দ্বিতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ৮:৪৮ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০২০

বিশ্বখ্যাত আত্মোন্নয়ন প্রশিক্ষক সজল রোশান এর ভিডিও লেকচার অবলম্বনে –

অনুলিখনঃ উষামা তাসনীন।

কথা বলছিলাম সাফল্যের অব্যর্থ, প্রমাণিত সব উপায় এবং উপকরণ নিয়ে। গত লেখায় ইতিবাচক চিন্তা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম।

এই পর্বে লিখবো সফল মানুষদের আরেকটি অবধারিত অভ্যাস একশন মুড নিয়ে।

শুধু প্রার্থনায়, প্রত্যাশায় সাফল্য মিলবে না। আপনাকে অবশ্যই কাজ করতে হবে । এবং তা এখনই করতে হবে। স্রষ্টা আমাদের সামনে রাস্তা উন্মুক্ত করে রেখেছেন। সে রাস্তা ধরে আমাদের এগোতে হবে এবং অবিরাম এগিয়ে যেতে হবে। তবেই মিলবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য।

এক ব্যক্তির ঈশ্বরে অগাধ বিশ্বাস। যে কোন পরিস্থিতিতে ঈশ্বরই তাকে রক্ষা করবেন। একবার তার এলাকায় ভয়াবহ বন্যার আশংকায় সব লোককে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হচ্ছিলো। আর্মি, নেভি, এয়ার ফোর্স, অন্যান্য বাহিনী  একযোগে কাজ করছিলো লোকজনকে সরিয়ে নিতে। সব লোককে সরিয়ে নেয়া হয়ে গেছে। আর্মির একটা গাড়ি টহল দিচ্ছিলো যদি আর কাউকে পাওয়া যায় ! এমন সময় তাঁরা দেখলো এক লোক তার বাড়ির সামনে নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছে। আর্মির দুয়েকজন গিয়ে জিজ্ঞেস করলো- কী ব্যাপার, তুমি এখানে কী করছো ! চারদিকে মাইকিং হচ্ছে, রেডিও, টিভিতে এনাউন্স হচ্ছে- ভয়াবহ বন্যা আসছে। তুমি কি কিছুই শুনো নি? চলো ,দ্রুত গাড়িতে উঠো।

সে বললো- না। আমার ঈশ্বরে আস্থা আছে। ঈশ্বরই আমাকে রক্ষা করবেন।

আর্মি ফিরে গেলো। বাণের পানিতে তার বাড়ির নীচতলা ডুবে গেলো। সে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হঠাত সে নেভির একটা টহল বোটের নজরে পড়লো। নেভির লোকেরা এসে চিৎকার করে বললো- তাড়াতাড়ি বোটে ওঠো। পানি আরো বাড়বে।

সে বললো- নাহ। আমার ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে। ঈশ্বর অবশ্যই আমাকে বাঁচাবেন ।

নেভির লোকেরাও ফিরে গেলো। পানি বেড়ে তার দোতলাও ডুবলো। সে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাত এয়ার ফোর্সের একটা টহল হেলিকপ্টার তাকে দেখতে পেলো। এয়ার ফোর্স তাকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে এলো। কিন্তু সে তাদেরও ফিরিয়ে দিলো। বললো- নাহ! এখনো ঈশ্বরে আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট। পানি আরো বাড়লো। এবং সে পানিতে ডুবে মারা গেলো।

মৃত্যুর পর সে ঈশ্বরকে অভিমানের সাথে জিজ্ঞেস করলো- আমি তোমার উপর এতো আস্থা রাখলাম,ভরসা রাখলাম, বিশ্বাস রাখলাম যে তুমি আমাকে বাঁচাবে । কিন্তু তুমি আমাকে বাঁচালে না কেনো?

ঈশ্বর তখন বললেন- তোমাকে উদ্ধারের জন্য আমি আর্মি,নেভি, এয়ার ফোর্স পাঠিয়েছি। কিন্তু তুমি তাদের সাথে গেলে না কেনো?

স্রষ্টা আমাদের সফল হওয়ার সব রসদ যোগান দিচ্ছেন। প্রতিদিন, প্রতিটা মূহুর্ত আমাদের জন্য নতুন নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসছে। কিন্তু আমরা সেগুলোকে কাজে প্রয়োগ করছি না। সেসব অপার সম্ভাবনা আমরা চিনতে পারি সেগুলো মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাবার পর।

অনেক জ্যোতিষীই আপনার হাত বা মুখ দেখেই আপনার অতীত বলে দিতে পারে। কিন্তু আপনি কারোর হাত বা মুখ না দেখেই তার অতীত বলে দিতে পারবেন- যে আপনি আপনার জীবনে তিনটা বিরাট সুযোগ পেয়েছিলেন যে তিনটা সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে আপনি আজ কয়েকশ কোটি টাকার মালিক থাকতেন। হ্যাঁ , বেশিরভাগ মানুষই আপনার সাথে একমত হবেন।   তিন জাস্ট কৌশলগত একটা সংখ্যা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের জীবনে অজস্র সুযোগ পেয়েছি যেসব সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে পারি নি শুধু দীর্ঘসুত্রিতার কারণে। একশন মুডে না থাকার কারণে।

আমেরিকান কমেডিয়ান জন রিভার্স চমৎকার বলেছেন-

Yesterday is history. Tomorrow is a mystery. Today is a gift from God, which is why we call it the present.

আমাদের সবারই এক বর্ণময় অতীত আছে। যেখানে সাফল্য ,ব্যর্থতা, পাওয়া, না পাওয়া, হাসি-কান্না,  প্রত্যাশা, প্রাপ্তির এমন বহু হিসাবেই মিল, অমিল রয়ে গেছে। কিন্তু এই জীবনটা যেমন আমরা আর ফিরে পাবো না, আমাদের অতীতকেও আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। অতীতের দিকে তাকিয়ে আমরা কতো সহজেই আমাদের ভুলগুলো চিনতে পারি, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি,কতো সহজেই জিততে পারি।! কিন্তু সেই অতীতের শোক বা জয়োল্লাস কেবল অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নেয়া এক আমেরিকান ভেটেরানের সাথে একবার লম্বা আলাপ করার সুযোগ হয়েছিলো।  ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে আমরা বিভিন্ন সিনেমা , ডকুমেন্টারি থেকে যা জানি এর বাইরে উনার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বললেন – We were soldiers সিনেমায় ভিয়েতনাম যুদ্ধকে বেশ ভালোভাবেই চিত্রায়ণ করা হয়েছে। কিন্তু সত্যিকার রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা কোন ভাষায়, সিনেমায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। রণাঙ্গনে সবই সত্যি সত্যি ঘটছে। সত্যিকারের গুলির শব্দ, সত্যিকারের রক্ত, সতিকারের মৃত্যু।

এই উদাহরণ এই জন্যই দিলাম যে আমাদের অতীত হচ্ছে – বেইসড অন আ ট্রু স্টোরি। সত্য গল্পের উপর ভিত্তি করে নির্মিত। আর বর্তমান হচ্ছে রণাঙ্গনের মতো। সবকিছুই সত্যি সত্যি ঘটছে। so, don’t try to enjoy your present with popcorn.

সাফল্যের কর্মপরিকল্পনাকে রণকৌশলের মতোই প্রয়োগ করতে হবে। এই মুহুর্তে যা করণী তা এখনই করতে হবে। আমরা বেশিরভাগ মানুষই আমাদের মৃত্যুর কথা ভাবতে চাই না। কিন্তু যে কোন মুহুর্তেই আমরা আমাদেরকে হাসপাতালের বিছানায় দেখতে পারি। এই অন্তিম সময়ে আমরা অনুধাবন করবো- আমরা কতো সময়ের অপচয় করেছি। এবং এই অপচয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে – কী সব গুরুত্বহীন বিষয়কে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি। আমাদের লক্ষ উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্কহীন কতো বিষয়কে আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি।

একটা অর্থহীন মুভি পাঁচবার দেখেছি। স্প্যানিশ লীগ নিয়ে বিতর্ক, রাজপরিবারের বিয়ে, সালমান খানের সিনেমার বাণিজ্যিক সাফল্য- এমন আরো হাবিজাবি অনেক গুরুত্বহীন বিষয়ে আমরা কতো সময় নষ্ট করেছি! এসব আমরা কেবল চিরঞ্জীব হলেই করতে পারি।

ব্রিটিশ অভিনেতা,টিভি তারকা ক্রিস্টোফার পার্কার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে রসিকতা করে বলেছেন-

Procrastination is like a credit card: it’s a lot of fun until you get the bill. -দীর্ঘসূত্রিতা ক্রেডিট কার্ডের মতো। বিল হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত খরচ করতে মজাই লাগে।

আমরা সবাই এই দীর্ঘসূত্রিতার আনন্দ উপভোগ করি। এবং পরবর্তীতে অনুশোচনা করি। এই দীর্ঘসূত্রিতা থেকে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়। এই করি- করবো মনোভাব , কাল-পরশু অজুহাত আমাদেরকে অনেক বেশি ক্লান্ত শ্রান্ত করে দেয়। একটা কাজের অগ্রগতি শারিরীক,মানসিক শক্তি যোগায়। আর একটা কাজের ধীরগতি আমাদেরকে আরো শক্তিহীন করে ফেলে। তাই ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করার আবশ্যকীয় পদক্ষেপ হচ্ছে – এখনই করার অভ্যাস তৈরি করা।

এন্টারপ্রেনার স্টিভ ওলেনস্কি টাইম ম্যানেজমেন্টের কার্যকর উপায় হিসেবে তার Two minute rules এর ধারণা দেন।

যে ছোট ছোট কাজ দুই মিনিট বা আরো কম সময়ে করা যায় সে সব কাজ পরবর্তীতে করার চেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে করাটা সময়সাশ্রয়ী। পরবর্তীতে করলেও কাজের পরিমাণ তো কমবে না।  so when there is a mountain to climb , don’t think that waiting will make it small. যখন পর্বতারোহণ করতে হবে তখন আপনার অপেক্ষা করার কারণে তো আর পর্বত ছোট হবে না। প্রতিটা কর্মক্ষেত্রেই শীর্ষস্থানীয় পদে লোক খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। কিন্তু প্রচুর প্রায়-যোগ্য লোক আছেন যাদের একটা সাকসেস এনগ্রেডিয়েন্ট মিসিং। সেটা হচ্ছে  The ability to get things done, to get results. কিছু একটা করে, সফল হয়ে সেখান থেকে ফলাফল বের করে নিয় আসা।

 

কূটনীতি, সাংবাদিকতা, মহাকাশ গবেষণা, মিলিটারি অপারেশন, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিটা বড় কর্ম সম্পাদনে কর্মতৎপর একজন মানুষ দরকার। নিয়োগকর্তারা এমন কাউকে খুঁজছেন যে ফলপ্রসূ। একশন ওরিয়েন্টেড।

একটা অসাধারণ আইডিয়াই যথেষ্ট নয়। একটা বাস্তবায়িত আইডিয়া সেই সব চমৎকার আইডিয়ার চেয়ে শতগুণ ভালো যেসব চমৎকার আইডিয়া বাস্তবে আর এক্সিকিউট করা হয় নি।

 

ইন্টারনেট,সার্চ ইঞ্জিন, সোশ্যাল মিডিয়া , স্মার্ট ফোন, আমাদের পৃথিবীর সবকিছুই  একেকটা আইডিয়ার বাস্তবায়ন। সাধারণ আর সফল মানুষদের মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে সফল মানুষরা কর্মতৎপর । আর সাধারণ মানুষেরা অলস, কর্মবিমুখ। সফল মানুষেরা করণীয় কাজ তাৎক্ষণিক করে ফেলে আর অলস লোকেরা পরবর্তী সপ্তাহ বা মাসের জন্য স্থগিত করে রাখে। আপনি যা করতে চান তা তাৎক্ষণিক করে ফেললে আপনি আরো আত্মবিশ্বাসী, আরো আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবেন। আর কাজ স্থগিত করতে থাকলে আপনি আরো হতাশ, আরো কর্ম বিমুখ হবেন।

 

বেশিরভার ইনএক্টিভ মানুষ অপেক্ষা করে একশ ভাগ কর্মোপযোগী পরিবেশের জন্য। শতভাগ নিখুঁত কাজের প্রত্যাশায়। কিন্তু বাস্তবে শতভাগ নিখুঁত বলে কিছু নেই। আমির খানকে আমরা পারফেকশনিস্ট হিসেবে জানি। কিন্তু এটা মূলত আমিরের পার্সোনাল ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি। হলিউড, বলিউডের বড় বাজেটের সিনেমা বা এপল তাদের নতুন ফোন বাজারে আনার আগে একটা আবহ তৈরী করে যে এই সিনেমা বা ফোন made with perfection । কিন্তু এই সব তাদের ব্র্যান্ডিং বা স্ট্র্যাটেজিক পজিশন। তবে তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেরা কিছুই নিয়ে আসে। এর কারণ তারা সেরা কিছুর জন্য অলস অপেক্ষা করে না। বরং সামর্থের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। নিরলস পরিশ্রম করে। প্রতিটা মুহুর্তকে কাজে লাগায়। নিখুঁত কাজের উপযোগী সময়ের অপেক্ষায় বসে না থেকে বরং অবিরাম কাজ করে যায়। কারণ শতভাগ নিখুঁত কাজের উপযোগী সময়ের অপেক্ষায় থাকলে আপনাকে চিরদিনের জন্য অপেক্ষায়ই থাকতে হবে।

আপনি যদি রাস্তার সবগুলো লাইট একসাথে সবুজ হওয়ার জন্য যাত্রা শুরুর অপেক্ষায় থাকেন তাহলে আপনাকে আজীবন অপেক্ষাই করতে হবে।

ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে চাইলে তাই অপরিহার্য মন্ত্র Do it now. Live in the present.

ভবিষ্যত নির্ভর করে আপনি এই মূহুর্তে কী করছেন তার উপর।

আগামী লেখায় কথা বলবো সফল মানুষদের আরেকটি অবধারিত অভ্যাস নিয়ে।

সাথেই থাকুন। ধন্যবাদ।

 

আরও পড়ুন- আত্মোন্নয়ন এবং সফলতার মূলমন্ত্র (প্রথম পর্ব)