আত্মোন্নয়ন এবং সফলতার মূলমন্ত্র (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:৫৯ অপরাহ্ণ, মে ২৯, ২০২০

বিশ্বখ্যাত আত্মোন্নয়ন প্রশিক্ষক সজল রোশান এর ভিডিও লেকচার অবলম্বনে –

অনুলিখনঃ উষামা তাসনীন।

আমরা আমাদের এই সিরিজের লেখাগুলোতে একে একে কথা বলবো সাতটি চিরন্তন ,ভাবনা ,বিশ্বাস আর অভ্যাস নিয়ে – যা দেশ,জাতি,পেশা নির্বিশেষে প্রতিটা সফল মানুষের মাঝে বর্তমান। যে সাতটি অভ্যাস তৈরি করে অগণিত মানুষ তাদের জীবনকে আরো সুন্দর,সফল ও অর্থবহ করেছে। নেপোলিয়ন হিল, এন্থনি রবিন্স, শিব খেরা,  স্টিভেন কোভি, ডেল কার্নেগি, আত্মোন্নয়েনের বিশ্ব বরেণ্য সব লেখক,বক্তা,সুফী সাধক,যোগী, ঋষি এই সাতটি শ্বাসত অভ্যাস তৈরি করতে বলেছেন।

আজকে লিখবো নেগেটিভিটিকে কিভাবে জয় করতে হয়। যেসব  ভাবনা, অভ্যাস আপনার সাফল্যের পথে বাঁধা , সেসব ভাবনা অভ্যাস আপনার অবচেতন মন থেকে মুছে ফেলতে হবে। এরপর সেখানে ইতিবাচক,অত্যাবশ্যক অভ্যাস ও ভাবনার আবাদ করতে হবে। আমাদের অবচেতন মনে একবার কোন স্বপ্ন, আকাংখা, অভ্যাস, ভাবনা বা বিশ্বাস বদ্ধমূল হলে সে ভাবনা বা বিশ্বাস আমাদেরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষপথে পরিচালিত করে।

 

প্রথমেই ইতিবাচক চিন্তা।

দুনিয়ার সব সফল,বিখ্যাত,সুখী,সমৃদ্ধ মানুষদের মাঝে এই একটা বৈশিষ্ট্য চিরন্তন। তা হচ্ছে তাঁরা সব সময় ইতিবাচক চিন্তা করে। সাফল্য ,সম্ভাবনা ,বিজয়ের ভাবনায় তাঁরা তাদের মন মগজকে পূর্ণ করে রাখে। সেখানে নেতিবাচক কিছুর জন্য আরা জায়গাই থাকে না। বহু সফল মানুষের গল্প আমরা জানি- যারা সীমাহীন প্রতিবন্ধকতা স্বত্তেও কাংখিত লক্ষে পৌঁছেছেন। তাঁরা পর্বতপ্রমাণ সমস্যার সামনে দাঁড়িয়েও সমাধানের রাস্তা খুঁজেছেন । যারা লোকের কথায় কান না দিয়ে নিজের সামর্থে আস্থা রেখেছেন। যারা অন্ধকারে আলো জ্বেলে পুরো দুনিয়াকে আলোকিত করেছেন।

একবার মিশিগানের এক স্কুল থেকে এক বাচ্চাকে একটা চিঠিসহ স্কুল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। তাঁর মায়ের কাছে লেখা সে চিঠিতে বলা হয়- আপনার টমি আমাদের স্কুলে লেখাপড়া চালিয়ে নেয়ার মতো মেধাবী নয়। টমের মা এ চিঠির কোন উত্তর দেন নি। শুধু প্রতিজ্ঞা করলেন- নিজেই টমিকে পড়াবেন।

সারাজীবনে মাত্র কয়েক মাস স্কুলে পড়ার সুযোগ পাওয়া এ টমিই পরবর্তীকালের জগত বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন। এই এডিসন ইলেক্ট্রিক ভাল্ব আবিষ্কারের সময় দশ হাজারেরও বেশি ব্যর্থ এক্সপেরিমেন্ট চালান। তবুও ব্যর্থতার কাছে বশ্যতা স্বীকার করেন নি।

শুধু এডিসন নয়,এমন অসংখ্য মানুষের উদাহরণ দেয়া যাবে যারা প্রত্যাখ্যানকে ব্যক্তিগতভাবে নেন নি। ব্যর্থতাকে চূড়ান্ত মনে করেন নি। ইতিবাচক চিন্তার কারণ নেতিবাচক বাস্তবতার অনুপস্থিতি নয়। বরং ইতিবাচক চিন্তার অভ্যাস।

এন্ড্রু কার্নেগি একবার বলেছিলেন-

“মানুষ নিয়ে কাজ করাটা অনেকটা স্বর্ণের জন্য মাটি খোঁড়ার মতো। এক আউন্স স্বর্নের জন্য কয়েক টন মাটি সরাতে হয়। কিন্তু যখন মাটি খুঁড়বেন তখন আপনাকে স্বর্ণই খুঁজতে হবে,মাটি নয়। ঠিক একইভাবে একজন মানুষের দোষত্রুটি খুঁজলে কয়েক টন পাওয়া যাবে। কিন্তু আপনি যখন খুঁজবেন তখন তাঁর গুণের উপরই দৃষ্টি রাখুন।

 

যারা সমালোচক তাঁরা সবকিছুর মধ্যেই সমালোচনা করার মতো ঠিকই কিছু একটা পেয়ে যাবে।

এক শিকারীর অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা সমপন্ন একটি পোষা কুকুর ছিলো। বিস্ময়কর সে কুকুরটি পানির উপর দিয়ে হাঁটতে পারতো। এ দৃশ্য দেখানোর উদ্দেশ্যে সে তাঁর এক বন্ধুকে শিকারে আমন্ত্রণ জানায়। সারাদিনে তাঁরা বেশ কয়েকটি বুনোহাঁস শিকার করে। যখনই কোন হাঁসকে গুলি করা হয় তখনই কুকুরটি পানির উপর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে সেটা পানি থেকে তুলে আনে। সারদিনে বেশ কয়েকবার কুকুরটি এভাবে পানির উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে গুলিবিদ্ধ পাখি তুলে আনলো। শিকারি খুব স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিলো যে তাঁর বন্ধু তাঁর কুকুরের এই অতি প্রাকৃতিক ক্ষমতা সম্পর্কে বিস্ময় প্রকাশ করবে,ভূয়সী প্রশংসা করবে। কিন্তু তাঁর বন্ধু প্রশংসা তো দূরে থাক বিশেষ কোন প্রতিক্রিয়াই দেখায় নি। শিকার থেকে ফেরার পর শিকারী শেষ পর্যন্ত তাঁর বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলো- তুমি কি আমার কুকুরের মধ্যে বিশেষ কিছু খেয়াল করেছো?

শিকারির বন্ধু তখন জবাব দিলো- ও ইয়েস! আই নোটিসড। তোমার কুকুর সাঁতার জানে না।

হোয়াট আ নেগেটিভ মাইন্ড!

সফল মানুষরা তাঁদের চারপাশে যা ই ঘটুক একটা আশাব্যঞ্জক মনোভাব বজায় রাখেন। তাঁরা জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতের চেয়ে তাঁদের পূর্বের সাফল্য এবং পরবর্তী কর্মপন্থায় মনোনিবেশ করেন যা তাদেরকে তাঁদের লক্ষপানে নিয়ে যায়।

 

আমেরিকান বেইস বল মেগাস্টার ওয়েড বগস দারুণভাবে বলেছেন –

‘A positive attitude causes a chain reaction of positive thoughts, events and outcomes. It is a catalyst and it sparks extraordinary results.’

আমাদের মন চিন্তার এক বিরামহীন কারখানা। প্রতিদিন প্রতিটা মুহূর্তে মন নতুন নতুন ভাবনা উতপাদন করছে। আমাদের এই চিন্তার কারখানায় দুইজন দক্ষ,আজ্ঞাবহ ম্যানেজার সর্বক্ষণই কর্মব্যস্ত থাকেন। যাদের একজনকে আমরা বলবো মিস্টার পজিটিভ। আরেকজনকে বলবো মিস্টার নেগেটিভ। মিস্টার পজিটিভ হচ্ছেন- যাবতীয় ইতিবাচক ভাবনা, চিন্তা ,অনুভূতির উতপাদন, উদ্ভাবনের কার্যনির্বাহী। কেনো আপনি সফল হবেন, কেনো আপনার পক্ষে সম্ভব, এই জীবন এই জগত কতো সুন্দর ,আমাদের পরিবার ,বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন,সহকর্মীরা কতো চমৎকার -এমন সব নানান ভাবনার বুননে মিস্টার পজিটিভ স্পেশালিস্ট।

আর যে বিভাগ যাবতীয় নেতিবাচক চিন্তা, হতাশা,দুঃখ,রাগ,ক্ষোভ,ঘৃণা, হয় নি,  হবে না – এ সবের উতপাদন করে, সে বিভাগের কার্যনির্বাহী হচ্ছেন মিস্টার নেগেটিভ। কেনো আপনি ব্যর্থ হবেন, কেনো আপনাকে দিয়ে হবে না, জীবন মানে যন্ত্রণা -এমন ভাবনার বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী হচ্ছেন মিস্টার নেগেটিভ।

আপনি যখনই বলবেন- আমাকে দিয়ে এ কাজ হবে না, সাথে সাথে মিস্টার নেগেটিভ তার তৎপরতা শুরু করবে। সে আপনাকে একের পর এক কারণ সাপ্লাই দিতে থাকবে -কেনো আপনাকে দিয়ে হবে না! কারণ আপনি এর আগে কতোবার এ জাতীয় উদ্যোগে ব্যর্থ হয়েছেন, আপনার পরিবারের কারো এ জাতীয় সাফল্যের ইতিহাস নেই, পর্যাপ্ত পূঁজি নেই, অভিজ্ঞতা নেই, সময় নেই,পরিবেশ নেই, টু আরলি, টু লেইট, দেশ,জাতি, বিশ্ব অর্থনীতি – সব মিলিয়ে আপনি দেখবেন, আসলেই তো!

আর একবার নিজেকে বলুন- আমাকে দিয়েই হবে। সাথে সাথে মিস্টার পজিটিভ তার কাজ শুরু করবে। আপনি আপনার জীবনে অসংখ্য, অজস্রবার সফল হয়েছেন তাই আপনি আত্মবিশ্বাসী। আগের ব্যর্থতাগুলোর কারণে আপনি এখন অনেক অভিজ্ঞ। এখনই সঠিক সময়। ঝড়ের মধ্যেই তো আম কুড়াতে হয় ইত্যাদি ।

এবং আপনি দেখবেন- আসলেই তো সম্ভব। আমাদের প্রতিদিনের জীবনে, ঘরে বাইরে, অফিসে,রাস্তায় কতো কতো সমস্যা। কিন্তু এতো কিছুর মধ্যেও জীবন অনেক সুন্দর। জীবনের খুব মজার ব্যাপার হচ্ছে -আপনি জীবনে যা আশা করবেন আপনি তা ই পাবেন।

আল্লামা জালালুদ্দীন রুমি বলেছেন-

“তোমার হৃদয়ে যদি আলো থাকে তাহলে ঘরে ফেরার পথ তুমি অবশ্যই খুঁজে পাবে।”

 

একটা কমিউনিটির গ্রোসারী শপে একজন নতুন ক্রেতাকে সেলসগার্ল উষ্ণ অভিবাদন জানিয়ে বললো – আপনি সম্ভবত আমাদের এই কমিউনিটিতে নতুন।

ভদ্র লোক জবাব দিলেন- হ্যাঁ ।আমি দুই দিন আগেই এখানে মুভ করেছি।  তিনি জানতে চাইলেন- এই কমিউনিটির মানুষেরা কেমন!

সেলস গার্ল বললো- আপনি আগে যেখানে ছিলেন সেখনাকার মানুষেরা কেমন ছিলো?

ভদ্রলোক জবাব দিলো- সেখানকার লোকজন সব দারুণ,অসাধারণ, ফ্রেন্ডলি। আমরা সত্যিই ছেড়ে আসতে চাই নি। বাধ্য হয়েই আসতে হলো।

সেলসগার্ল বললো- আপনি এখানেও দারুণ,অসাধারণ, ফ্রেন্ডলি সব মানুষকেই পাবেন।

 

কিছুদিন পরে সেই গ্রোসারী শপে আরেকজন নতুন ক্রেতা এলেন। তিনি অভ্যর্থনাপর্ব শেষে জানতে চাইলেন- এখানকার মানুষেরা কেমন?

সেলসগার্ল সেই একই প্রশ্ন করলো-  আপনি আগে যেখানে ছিলেন সেখনাকার মানুষেরা কেমন ছিলো?

নতুন আগন্তুক বললো- সেখানকার লোকেরা খুবই আনফ্রেন্ডলি, স্বার্থপর,বিরক্তিকর। সে এলাকা ছাড়তে পেরে আমি খুশি।

সেলস গার্ল বললো- দুঃখজনকভাবে আমার মনে হচ্ছে আপনি এই কমিউনিটিতেও একই ধরণের মানুষই পাবেন।

 

সত্যিই! আমরা যেমনই আশা করি তেমনই পাই। আমাদের বহু মানুষের ব্যর্থ হওয়ার ,বহু প্রচেষ্টাই বিফল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ব্যর্থতার ভয়।

এক লোক ডাক্তারের কাছে গিয়ে বললো- ডাক্তার সাহেব, মাথার সব চুল পড়ে যাচ্ছে।

ডাক্তার বললো -কী কারণে?

সে বললো- টেনশনে।

ডাক্তার বললো – তো কী নিয়ে এতো টেনশন করেন!

সে বললো- এই যে চুল পড়ে যাচ্ছে এটা নিয়ে।

চুল পড়ে যাওয়ার টেনশনে চুল পড়ার মতোই ব্যর্থ হওয়ার ভয়ই ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ।

 

আমেরিকার ইতিহাসে চারবারের নির্বাচিত একমাত্র প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গ্রেট ডিপ্রেশনের মতো সংকটেও আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পুরো বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সে সময় পুরো আমেরিকা জুড়ে, পুরো বিশ্বজুড়ে ভয় আর আতঙ্ক।  তিনি তার উদ্বোধনী বক্তৃতায় বলেছিলেন-

“we have nothing to fear but fear itself. “-  আমাদের কোনকিছুকেই ভয় পাওয়ার  নেই, শুধু ভয়টাকে ছাড়া।

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়বহ দুর্যোগে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট শুধু ভয়টাকে জয় করতে বলেছেন। এই ভয়ের সাথে লড়াই করেই প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট আমেরিকাকে পৃথিবীর এক অজেয় পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। শান্তিতে নোবেল পান। এবং সর্বোচ্চ চারবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

সাফল্য নিহিত থাকে সঠিক সুযোগ চিনতে পারা এবং কাজে লাগাতে পারার মধ্যে। বেশিরভাগ মানুষই সুযোগ চিনতে পারে না কারণ সুযোগ দুর্যোগের ছদ্মবেশে আসে। কঠোর পরিশ্রম,অনিশ্চয়তার আকৃতিতে আসে। সফল মানুষেরা প্রতিটা দুর্যোগের ভেতরেই সম্ভাবনা দেখে। নেপোলিয়ান হিল তার বিখ্যাত Think and Grow Rich বইয়ে একেবারে গাণিতিক ভাষায় বলেছেন-

“Every problem comes with an equal or greater opportunity.”- প্রতিটি সমস্যাই তার সমান অথবা বড় সম্ভাবনা নিয়ে আসে।

এই যে প্রযুক্তি,যোগাযোগের নতুন নতুন মাধ্যম, এতো এতো এপ্লিকেশন,সফটওয়ার এসব একেকটা সমস্যার সমাধান। আমরা শুধু সমস্যাই দেখছি। বিল গেটস, মার্ক জুকারবার্গ, জেফ বেজোস এঁরা সেই সব সমস্যায় বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা দেখে। সুতরাং সম্ভাবনা খুঁজতে থাকুন। সম্ভাবনাই চোখে পড়বে।

সফলতার দ্বিতীয় মন্ত্র নিয়ে লিখবো আগামী পর্বে ।

আমাদের সাথেই থাকুন।