আগামী পৃথিবীর নেতৃত্ব তোমাদের হাতেঃ বারাক ওবামা

প্রকাশিত: ৯:৩৭ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০

 

করোনা মহামারি এখন সারা দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর ফলে অনেক স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির শিক্ষা কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে আমেরিকায় হাইস্কুল পাস করা ছাত্রছাত্রীদের জন্য অনলাইন সমাবর্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আমেরিকান হাইস্কুল কর্তৃপক্ষ। সেখানে ছাত্র ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা। তার বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

 

হাই, সবাই তোমরা কেমন আছো? আমি তোমাদের এই সমাবর্তন ২০২০ অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে খুবই আনন্দিত। অভিনন্দন জানাচ্ছি তোমাদের পিতামাতা, অবিভাবক ও শিক্ষকবৃন্দকে যারা তোমাদের এই দীর্ঘ পথে তোমাদের পাশে ছিলো। গ্র্যাজুয়েশন হলো জীবনের সেরা অর্জনের একটি। তোমাদের অনেকেই বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে এই অর্জনের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছো। কেউ অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে, কেউ মা-বাবাকে বেকারত্বে ভুগতে দেখে, কেউ আবার নানা বৈষম্য মোকাবিলা করে এ পর্যন্ত এসেছো। বেড়ে ওঠার গতানুগতিক চাপের পাশাপাশি এখন নতুন করে যোগ হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাড়তি চাপ, নানা ধরনের সহিংসতার খবর, আর জলবায়ু পরিবর্তনের অশনিসংকেত। এসবের মধ্য দিয়েও যখন তোমরা লক্ষ্যের কাছাকাছি এসে উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলে, তখনই একটা মহামারি এসে পুরো পৃথিবীকে ওলট-পালট করে দিলো।

 

আমি জানি, তোমরা তোমাদের পিতামাতাকে ভালোবাসো,তাদের সাথে সময় কাঁটাতে, গেইম খেলতে ও একসাথে টিভি দেখতে পছন্দ করো – ছুটির এই কয়েক মাসে আশা করি তোমরা তা করতে পেরেছো। আমি তোমাদের সাথে একমত যে,অনলাইন সমাবর্তনের অনুষ্ঠান হওয়াতে বসে বসে লম্বা বক্তৃতা শোনার হাত থেকে অন্তত তোমারা রেহাই পেয়েছো। অনুষ্ঠান খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। আমার তো পুরো দিন বসে বসে বক্তৃতা শুনতে হয়েছিলো। তার ওপর সমাবর্তনের টুপি সবাইকে মানায় না, বিশেষ করে যাদের কান আমার মতো বড়, তাদের। এই সংকট কেটে গেলে আবার তোমরা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার অনেক সময় পাবে। উদযাপনও করতে পারবে।

 

গ্র্যাজুয়েশন হলো পরিণত জীবনের দিকে পা বাড়ানোর প্রথম ধাপ। এই সময়েই আমরা নিজেদের জীবনের হাল ধরতে শুরু করি। আমরা ঠিক করি, কোন দিকে যাবো, কোন পেশায় নিজেকে জড়াবো। কার সঙ্গে নিজের জীবন গড়বো। কোন নীতি মেনে জীবনে এগিয়ে যাবো। তবে বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতো কিছু ভাবতে গেলে ভয় লাগাটা খুব স্বাভাবিক। এখন চাইলেও তুমি সাধারণ একটা কলেজে ভর্তি হওয়ার কাজটা স্বাভাবিকভাবে করতে পারবে না। পড়াশোনার পাশাপাশি তুমি যে কাজ করবে, সেটাও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক অবস্থাসম্পন্ন পরিবারও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। আর যে পরিবারগুলো আগে থেকেই দুদর্শায় ছিল, তাদের জীবন তো সবচেয়ে কঠিন সংকটে।

 

এসব বলার অর্থ হলো, তোমাদের আসলে সময়ের আগেই বড় হতে হবে, পরিণত হতে হবে। আগের সব প্রজন্মের চেয়ে তোমাদের হতে হবে আরও দায়িত্ববান। একটা মহামারি আমাদের সব অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক আর সমাজব্যবস্থার পরতে পরতে জমে থাকা সমস্যাগুলোকে ওপরে তুলে এনেছে। পুরোনো কায়দায় যে সমস্যার সমাধান হবে না, এ ব্যাপারে এখন তরুণপ্রজন্ম সজাগ। তরুণেরা বুঝতে শুরু করেছে, ধনী হয়ে এখন কোনো লাভ নেই, যদি আশপাশের সবাই দারিদ্র্য আর রোগে-শোকে ভোগে। আমাদের সমাজ আর গণতন্ত্র তখনই সক্রিয় রাখা যাবে, যখন আমরা শুধু নিজেদের কথা না ভেবে একে অন্যের জন্য ভাববো।

 

এই মহামারির আরেকটা তেতো সত্য হলো -এতোদিন বড় বলে যারা সব নীতি নির্ধারণ করে এসেছে, তোমাদের কাছে এসে তা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে এবং এইসব পুরোনো লোকজন যা চিন্তা করে, তাও তোমাদের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ঠেকছে না। এমনকি অনেক সময় তারা সঠিক সিদ্ধান্তটা নিতেও পারে না। তাই পৃথিবীর এই ক্রান্তিলগ্নে তোমাদের এগিয়ে আসতে হবে। আবার পৃথিবীটা সুস্থ করে তোলার জন্য তোমাদের হাতেই সব দায়িত্ব, এই তরুণ প্রজন্মের হাতে। এতে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই, আমি আশা রাখি এটা তোমাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক। এখন যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, এই পরিস্থিতিতে কেউ তোমাকে বলতে পারবে না, ‘এসব বোঝার বয়স তোমার এখনো হয়নি’ অথবা ‘তুমি কিছু জানো না, এটা এভাবেই করতে হয়’। কারণ, আমরা কখনো এমন অবস্থায় পড়িনি, তাই আমরা তরুণদের আর পুরোনো শিক্ষা দিয়ে বোঝাতে পারব না। অনিশ্চয়তায় সব পুরোনো ধারণাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ। আমি এত কিছু বলছি, আমিও তো একজন বুড়ো মানুষ। এই তারুণ্যের শক্তি দিয়ে তোমরা কী কী করতে পারো, কী কী পারো না—আমি এখন এসব শেখাতে যাবো না। শুধু তিনটি উপদেশ দিয়ে যাবো।

 

প্রথমটি হলো, ভয় পেয়ো না। দাসত্ব, স্নায়ুযুদ্ধ, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মহামারি, খরা, সহিংসতা, দুর্দশা —এমন অনেক দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে আমরা গেছি। আর প্রতিবারই সংগ্রাম করে টিকেছি, আমরা আরও শক্তি সঞ্চয় করে ফিরে এসেছি, সমৃদ্ধ হয়েছি আর এটা তোমাদের মতো নতুন প্রজন্মের কারণেই সম্ভব হয়েছে। তোমাদের মতো তরুণরাই এসব দুর্যোগ জয়ের পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সুন্দর আগামীর পথ খুঁজে বের করতে হবে।

 

দ্বিতীয় উপদেশ, নিজের মন যেটা সায় দেয়, তা-ই করো। যা করতে ভালো লাগে, সহজ লাগে, মনের মতো লাগে, তা-ই করো। শিশুরা কিন্তু এভাবেই ভাবে। দুর্ভাগ্যবশত, অনেক বড় বড় প্রভাবশালী-ক্ষমতাধরেরা জটিল ভাবনা থেকে বেরোতে পারে না। তাই হয়তো আমাদের সমস্যাগুলোও মেটে না। আমি আশা করব, সব জটিল জটিল তত্ত্ব বাদ দিয়ে তোমরা একেবারে মৌলিক আদর্শের চর্চা করবে। যেমন সততা, পরিশ্রম, দায়িত্বশীলতা, নিরপেক্ষতা, উদারতা, অন্যকে সম্মান দেখানো। হয়তো সব সময় সব নীতি বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা যাবে না। চলতে গেলে অনেক ভুল করবে, আমরা সবাই করি। কিন্তু নিজের ভিতরে যে সত্য রয়েছে তার সাথে কখনো প্রতারণা করো না, সময় যতই কঠিন হোক না কেনো। তখন লোকেরা তোমার সততা দেখবে এবং তোমার প্রতি ভালো ধারণা রাখবে। সমস্যায় ধৃত না হয়ে সমস্যা উত্তরণের পথ বের করার চেষ্টা করবে।

 

আর সব শেষে, নিজের গণ্ডি গড়ে তোলো। একা কেউ সমাজ বদলাতে পারে না। এখন যখন সবাই নিজেকে নিয়ে চিন্তিত, তুমিও ভাবতে পারো, আপাতত শুধু নিজেকে আর নিজের পরিবার নিয়ে ভাবলেই চলবে। কিন্তু আমরা যদি সত্যিই আবার সুস্থ পৃথিবীটাকে ফেরত চাই, দুঃসময় শেষ করতে চাই, চাকরি-শিক্ষার সমান সুযোগ চাই, যদি পরিবেশকে রক্ষা করতে চাই, ভবিষ্যতের মহামারিকে আগেই রুখে দিতে চাই, তাহলে আমাদের ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে ভাবতে হবে, এক হয়ে কাজ করতে হবে। চলো আমরা একসাথে সংগ্রাম করে বাঁচি, অপরের অধিকার অদায়ে সচেতন হই। লিঙ্গবৈষম্য, জাতিগত কুসংস্কার, অর্থ বৈভবের লোভ পরিত্যাগ করি যা আমাদের শতধা বিভক্ত করেছে এবং বিশ্বটাকে নতুন করে, নতুনভাবে গড়ে তুলি। অভিনন্দন সবাইকে!