অ্যালেন গিন্সবার্গ এর জন্মদিন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদান

প্রকাশিত: ১০:০০ অপরাহ্ণ, জুন ৩, ২০২০

অ্যালেন গিন্সবার্গ। নামটির সাথে হয়তো সবাইই পরিচিত। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদানের কারণে বাংলাদেশ নামক দেশটির জন্মের সাথে তিনি জড়িয়ে আছেন। একজন মার্কিন কবি, গীতিকার, আলোকচিত্রী এবং মঞ্চ অভিনেতা। তিনি ১৯২৬ সালে ৩রা জুন নিউ জার্সীতে জন্মগ্রহন করেন। আজ গিন্সবার্গের ৯৪তম জন্মদিন।

গিন্সবার্গ ছিলেন যুদ্ধবিরোধী। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মার্কিন সরকার যেখানে পাকিস্তানকে সমর্থন যুগিয়েছিল সেখানে অ্যালেন গিন্সবার্গ বাংলাদেশের পক্ষে সরব ছিলেন। কোলকাতায় তার সাহিত্যিক বন্ধুদের সাথে নিয়ে তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার সংগ্রামে নেমেছিলেন।

ওই বছরের সেপ্টেম্বরে রোলিং স্টোনের কিথ রিচার্ডস কিছু টাকা তুলে দিয়েছিলেন গিন্সবার্গের হাতে; পূর্ব বঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছে, হাজার হাজার বাঙালি শরণার্থী বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে, অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার তারা সেখানে— গিন্সবার্গের কাজ হবে সরেজমিন ঘুরে ওই যুদ্ধের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিবেদন লেখা।

কলকাতায় গিনসবার্গের সঙ্গী হয়েছিলেন তখন বিবিসি’র হয়ে রিপোর্ট করতে আসা গীতা মেহতা। কলকাতার কয়েকজন শিল্পী-সাহিত্যিকের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে তিনি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে ওঠেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অন্যদেরসহ গিনসবার্গকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান শরণার্থী শিবিরগুলোতে।

তখন বাংলাদেশ থেকে অনেক শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গ ও সীমান্তবর্তী অন্যান্য শহরে আশ্রয় নিয়েছিল। সে সময় পূর্ব বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের সংযোগকারী সড়ক হিসেবে কাজ করতো “যশোর রোড”।

অনেক বৃষ্টি হওয়ায় তখন যশোর রোড পানিতে ডুবে গিয়েছিলো। সড়ক পথে না পেরে গিন্সবার্গ অবশেষে নৌকায় করে বনগাঁ পেরিয়ে বাংলাদেশের যশোর সীমান্তে পৌঁছেন। তার সাথে সুনীলও ছিলেন। তারা যশোর সীমান্ত ও এর আশপাশের শিবিরগুলোতে বসবাসকারী শরণার্থীদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন।

যশোর রোডের পাশে গড়ে ওঠা শরনার্থী শিবির এবং এপার থেকে ওপারে যাত্রা করা হাজার হাজার নীরিহ মানুষের নির্মম হাহাকারের প্রতিধ্বনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড কবিতায়।” কবিতার কয়েকটি লাইন-

Millions of babies watching the skies
Bellies swollen, with big round eyes
On Jessore Road–long bamboo huts
No place to shit but sand channel ruts

Millions of fathers in rain
Millions of mothers in pain
Millions of brothers in woe
Millions of sisters nowhere to go

One Million aunts are dying for bread
One Million uncles lamenting the dead
Grandfather millions homeless and sad
Grandmother millions silently mad

Millions of daughters walk in the mud
Millions of children wash in the flood
A Million girls vomit & groan
Millions of families hopeless alone.

যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে তার বন্ধু বব ডিলান ও অন্যদের সহায়তায় এই কবিতাটিকে তিনি গানে রূপ দিয়েছিলেন। কনসার্টে এই গান গেয়ে তারা বাংলাদেশী শরণার্থীদের সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন।

“সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” কবিতার মাধ্যমেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি তাঁর একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং আমেরিকায় ফিরে গিয়ে ১৯৭১ সালের ১লা আগস্ট নিউ ইয়র্কের মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ‘পণ্ডিত রবি শংকর’ও জর্জ হ্যারিসন আয়োজিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’এ অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আয়োজন করা হয়েছিল ৭১এর বাঙলাদেশী শরনার্থীদের সাহায্যার্থে।

এই কনসার্টে জর্জ হ্যরিসন, বব ডিলান, জোয়ান বায়েজসহ আমেরিকার আরও অনেক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীই সঙ্গীত পরিবেশন করেন। পণ্ডিত রবি শংকর ও অপর ভারতীয় কিংবদন্তী গায়ক আলি আকবর খানও গান পরিবেশন করেন এই কনসার্টে এবং এখান থেকে প্রায় আড়াই লাখ ডলার সংগৃহীত হয়।

এই টাকার থেকেও বড়ো ব্যাপার ছিলো এই কনসার্ট সারাবিশ্বকে একটা নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছিলো। সবার কাছে পৌঁছে গিয়েছিলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার কথা এবং আমাদের গৌরবান্বিত স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা। এর পর থেকে জনমত গড়তে থাকে এবং বিশ্ব অপেক্ষা করে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের জন্য।

 

গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি পরে ১৯৯৯সালে প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ তাঁর মুক্তির কথা চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন। প্রথমে খান মোহাম্মদ ফারাবীর অনুবাদ করা কবিতাটি গান হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন কিন্তু কবিতা থেকে গান করাটা অনেক কঠিন ছিলো। তাই এটাকে গান করার দায়িত্ব পড়ে তারেক মাসুদের বন্ধু প্রখ্যাত গায়িকা মৌসুমি ভৌমিকের উপর।

তিনিই এই কবিতার ভাবানুবাদ করেন এবং সুরারোপ করেন। এই গানটি তারেক মাসুদ তাঁর অপর চলচ্চিত্র ‘মুক্তির গান’-এ ব্যবহার করার জন্য গিন্সবার্গের কাছ থেকে অনুমতি এনেছিলেন কিন্তু মুক্তির গান চলচ্চিত্রের ফাইনাল এডিটিং-এর সময় এই কবিতা বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ঢুকানো হয়।

বাংলা করে যে গানটি গাওয়া হয় তার কয়েকটি লাইন:

শত শত চোখ আকাশটা দেখে
শত শত শত মানুষের দল
যশোর রোডের দুধারে বসত
বাঁশের ছাউনি, কাদামাটি জল

কাদামাটি মাখা মানুষের দল
গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে
আকাশে বসত মরা ঈশ্বর
নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে

ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে
যুদ্ধে ছিন্ন ঘর-বাড়ি-দেশ
মাথার ভিতরে বোমারু বিমান
এই কালো রাত কবে হবে শেষ

তথ্যসুত্রঃ

– বাংলা উইকিপিডিয়া

– বাংলা নিউজ২৪ ডটকম

– www.allenginsberg.org