অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার স্টিভেন স্মিথ এবং কিছু অজানা কথা

প্রকাশিত: ৩:১৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ৬, ২০২০
ছবিঃ ইন্টারনেট

অস্ট্রেলিয়ান রসায়নবিদ বাবা ও ব্রিটিশ মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া স্টিভেন স্মিথ পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিলেন না। তবে ক্রিকেটের প্রতি আকর্ষণটা ছিল একটু বেশিই। আর তাই তো মাত্র দশ বছর বয়সে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- “কী হতে চাও?”, তখন নির্দ্বিধায় উত্তর দিয়েছিলেন- ” ক্রিকেটার হবো”। আর তাই তো খুব কম বয়সেই নিজের প্রতিভার ঝলক দেখানো শুরু করেন স্মিথ। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই সাদারল্যান্ড ক্রিকেট ক্লাবের বর্ষসেরা অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেটার, বর্ষসেরা অনূর্ধ্ব-২১ ক্রিকেটার এবং বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরষ্কার জেতেন। হ্যাঁ, মাত্র ১৫ বছরের স্মিথের সাফল্যগাঁথাই বলছি। এর পরের বছরই মাত্র ১৬ বছর বয়সে সিডনির গ্রেড ক্রিকেটের প্রথম শ্রেণীর গ্রেডে অভিষেক হয়ে যায় তার। তখন স্মিথের বয়স ১৬ হলেও তাকে দেখলে কেউই মানতে পারত না সেটা। কেনই বা মানবে? তাকে দেখলে যে মনে হত ১২/১৩ বছর বয়সের একজন নেমে গেছে ব্যাট প্যাড হাতে। ওই কচি বয়সেও যথেষ্ঠ পরিণত ছিলেন স্মিথ। কীভাবে?

তাহলে শুনুন- একদিন গ্রেড ক্রিকেটের এক ম্যাচে ব্যাটিং করছিলেন। প্রতিপক্ষের এক জ্যেষ্ঠ ক্রিকেটার স্মিথের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং করছিলেন। হঠাৎ স্মিথকে উদ্দেশ্য করে স্লেজিং শুরু করলেন তিনি। নিরীহদর্শন স্মিথ চুপ ছিলেন অনেকক্ষণ। কিছুই বলছিলেন না ওই ফিল্ডারের স্লেজিংয়ের জবাবে। কিন্তু একসময় চুপ করে থাকতে না পেরে পেছন ফিরে জিজ্ঞেস করলেন- “তোমার বয়স কত?”

আকস্মিক প্রশ্নে বিস্মিত হলেও ওই ক্রিকেটার জবাব দিলেন- “আমার বয়স ৩০”

শুনে স্মিথ বললেন- ” তোমার বয়স ৩০ আর তুমি এখনও দ্বিতীয় গ্রেডে খেলছ?”

স্মিথের কথা বেশ হাসির উদ্রেক করেছিলো মাঠে উপস্থিত ক্রিকেটারদের মাঝে । যদিও ম্যাচ শেষে ওই জ্যেষ্ঠ ক্রিকেটার স্মিথকে এসে অভিনন্দন জানান । এর দুবছর পর অ্যালান বোর্ডার ওভালে মসম্যানের বিপক্ষে একটি প্রথম গ্রেডের ম্যাচে স্মিথ মাত্র ৬৭ বলে ১৫ চার ও ৯ ছয়ের সাহায্যে ১৩৪ রানের একটি ঝড়ো ইনিংস খেলে আবারও নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। ওই ম্যাচেরই এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষের এক বাঁহাতি স্পিনারে নো বল করে বসেন এবং ওই বলে স্মিথ চারও মারেন। ঘটনা সেটা না। ঘটনা হচ্ছে, এর পরের বলটা ছিল ফ্রি হিট। স্মিথ করলেন কি, ব্যাটিং স্ট্যান্স বদলে হয়ে গেলেন বাঁহাতি। সবাই তো অবাক। এমনকি বোলার নিজেও অবাক। কী করছে ছেলেটা? কিন্তু না… স্মিথ সফল হয়েছিলেন। ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার অঞ্চলের উপর দিয়ে বলকে সীমানা পার করেছিলেন.… ছক্কা। স্মিথ এমনই ছিলেন, পাগলাটে। অধিনায়ক হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ।সাদারল্যান্ডে মাত্র ১৯ বছর বয়সেই স্মিথ পেয়েছিলেন অধিনায়কত্ব। স্মিথ খেলতে পারতেন ইংল্যান্ডের হয়েও।

১৭ বছর বয়সেই তার ডাক পড়ে ইংল্যান্ডের কেন্ট থেকে। সেখানে তাদের পারিবারিক বন্ধু টনি ওয়ার্ড থাকতেন। একদিন সকালে দরজা খুলে দেখেন পিটার স্মিথের ছেলে স্টিভেন স্মিথ গাট্টি পোচকা সহ তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। অবাকই হলেন কিছুটা। কারণ আর কিছুদিন পরই ছিল স্মিথের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। আর ছেলেটা কিনা পরীক্ষা ফেলে চলে এসেছে ইংল্যান্ডে ক্রিকেট খেলতে? হ্যাঁ, স্মিথ পরীক্ষাই দেননি। আর সেজন্য তাকে অবশ্য কম হ্যাপাও পোহাতে হয়নি ছাড়পত্র নিতে গিয়ে। সাদারল্যান্ডের মেনাই হাই স্কুলের অধ্যক্ষের কক্ষে যখন চিন্তিত মুখে বসে ছিলেন কোচ ট্রেন্ট উডহিলের সঙ্গে তখনও জানতেন না, আদৌ তিনি অধ্যক্ষের অনুমতি পাবেন কি না। অধ্যক্ষের কক্ষে বসা সেই সভায় উপস্থিতেরা কেউই মানতে পারছিলেন না স্মিথের সিদ্ধান্তটা। এমনকি নিউ সাউথ ওয়েলসের ক্রিকেট কল্যাণ সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তাও ছিলেন সেখানে। তিনিও মানতে পারছিলেন না স্মিথের সিদ্ধান্তটা। তিনি বললেন- “আগে পড়াশোনাটা শেষ করো। এত তাড়াহুড়োর কি দরকার?”

 তাদের কথা দীর্ঘক্ষণ ধরে ধৈর্য সহকারে শুনছিলেন স্মিথের কোচ উডহিল। শেষে আর পারলেন না নিজেকে সংযত রাখতে। বলেই ফেললেন- ” স্কুলটির প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, আপনারা স্মিথকে যেতে দিন। ও আগামী ১০ বছর লক্ষাধিক টাকা আয় করার ক্ষমতা রাখে”। তার এই মন্তব্য শুনে অধ্যক্ষও মেনে নিলেন- “আচ্ছা, ঠিকাছে। ওর মন যেহেতু ক্রিকেটেই পড়ে আছে তাহলে ও সেটাই খেলুক। ওর জন্য আমাদের দরজা খোলা। ও যেকোনো সময় এসে তার পড়াশোনা শেষ করতে পারবে”। এই হল স্মিথের ইংল্যান্ডে চলে আসার কাহিনী। কিন্তু না, কিছুদিন পরই স্মিথ বাড়ির প্রতি টান অনুভব করতে লাগলেন। খেলায়ও দিতে পারছিলেন না মনোযোগ। পরে টনি ওয়ার্ড তাকে ডেকে নিয়ে বললেন- “তোমাকে আমি তিনটা অপশন বলছি। তোমাকে এর যেকোনো একটা বাছাই করতে হবে-

১) এই মৌসুমটা খেলে যাও অন্তত

 ২) বাড়িতে চলে যাও এখনই না হয়

৩) অথবা আমার সাথে এই কেন্টে থাকো। আমি তোমাকে একটি ক্লাবের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিবো।”

 স্মিথ তৃতীয়টি বেছে নিয়েছিলেন এবং ওয়ার্ডের সহায়তায় সেভেনোক্স ভাইন নামের একটি ক্লাবের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন।

ক্লাবটির হয়ে একদিন ৩ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ১৮৭ রানের একটি ইনিংস খেলেন। যার ফলে কাউন্টি ক্লাব কেন্টের কর্তাদের নজরটাও কাড়েন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। কিন্তু না, কেন্টের আগেই সারে স্মিথকে নিজেদের দলে নিয়ে নেয়। কিন্তু তারা যখন স্মিথকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করাতে চায় তখন স্মিথ আবারও দ্বিধান্বিত হয়ে গেলেন। কি করবেন তিনি? এখানে থাকবেন? না অস্ট্রেলিয়ায় বাবা মায়ের কাছে চলে যাবেন? তখনও অস্ট্রেলিয়ায় স্মিথের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ভবিষ্যত ছিল অনিশ্চিত। সেখানে ইংল্যান্ডে এত সুযোগ সুবিধা পেয়ে কিভাবে ফিরিয়ে দেন? স্মিথকে আবারও এসে উদ্ধার করেন সেই টনি ওয়ার্ড। তিনি স্মিথকে এসে বুঝালেন, তুমি অস্ট্রেলিয়াতেই চলে যাও। নিজের উপর আত্মবিশ্বাস রাখো, অস্ট্রেলিয়া দলে তুমি ডাক একদিন পাবেই।

স্মিথ চলে এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। এজন্য ওয়ার্ডকে একটা ধন্যবাদ দিতেই হয়। নাহলে হয়ত ব্যাগী গ্রীন ক্যাপ পরা এই দুর্দান্ত স্মিথকে ক্রিকেট বিশ্ব আজ দেখতে পেতনা। স্মিথের উত্থানটা একদিকে যেমন অবাক করার মত, অন্যদিকে কঠোর পরিশ্রম ও  অধ্যবসায়ের গল্প। শেষোক্তটি হতে পারে অনুপ্রেরণারও গল্প। কোথায় এসেছিলেন শেন ওয়ার্নের সম্ভাব্য উত্তরসূরী হয়ে ৭২ বোলিং গড় নিয়ে আর কোথায় এখন তিনি? এখন তিনি সবার উপরে। না এভারেস্টের চূড়ায় না তবে টেস্ট ব্যাটসম্যানদের রেংকিংয়ে সবার উপরে ১ নম্বর স্থানটিতে। দীর্ঘ সময় ধরে হাসি, কটাক্ষের শিকার হয়ে আসা স্মিথ এখন হাসতেই পারেন সেইসব নিন্দুকদের উদ্দেশ্য করে।

তথ্যসূত্র- ইন্টারনেট