“অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয় একটি দেশের গুরুত্ব বিবেচিত হয় তার সামরিক শক্তির উপর”

প্রকাশিত: ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০২১

কেন আজ বাংলাদেশের বিমানবাহী রণতরী এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সময়ের দাবী?

 

লিখেছেন: নাহিদ হাসান সানি

শিক্ষার্থী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

একটা দেশের গুরুত্ব অনেকটা বিবেচিত হয় তার অর্থনৈতিক অবস্থা কতটা শক্তিশালী। কিন্তু আমি এখানে দ্বিমত পোষণ করে বলছি বিশ্বে একটা দেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তা নির্ভর করে তার সামরিক শক্তির উপর।

 

উদাহরণস্বরূপ আমি দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান এবং উত্তর কোরিয়ার উদাহরণ টেনে আনতে চাই। এটা আমাদের সবারই জানা, বর্তমান বিশ্বে দক্ষিণ কোরিয়া এবং তার নিকটতম প্রতিবেশী জাপান অর্থনৈতিক দিক থেকে কতটা শক্তিশালী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে আমেরিকা তার বাজার খুলে দেয়াতে দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান প্রচণ্ডভাবে অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই দুই দেশের সামরিক শক্তি কি সেরকমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে? উত্তর- না। কারণ, আমেরিকা চায় না এই অঞ্চলে কোরিয়া-জাপান সামরিক দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ বনে যাক। এই দুই দেশ প্রতিরক্ষায় সম্পুর্ণভাবে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। প্রায় ২৫ হাজার সেনা মোতায়ন রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষায় এবং প্রায় ৫০ হাজার সেনা রয়েছে জাপানে। আর এজন্য দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিবছর ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করে আমেরিকাকে। জাপানের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার প্রতি বছর আমেরিকা পাচ্ছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জন্য। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং এই অঞ্চলে সামরিক অবস্থান ধরে রাখতে স্বভাবতই আমেরিকা চাইবে না কোরিয়া-জাপান সামরিক দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক।

 

দক্ষিণ কোরিয়া-জাপানের একদম বিপরীতে অবস্থান কিম জং-উনের উত্তর কোরিয়া। অর্থনীতি তলানিতে, মানবাধিকার সূচকে তলানিতে কিন্তু এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের দিক থেকে অবশ্যই অগ্রগামী। দক্ষিণ কোরিয়া-জাপানের মত ইকোনমিক জায়ান্টদের রাতের ঘুম হারাম করে রেখে দিয়েছে, আমেরিকার মত মহাশক্তিধর দেশের সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলে। আর এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র দেশটির সামরিক সক্ষমতার জোরে। আপনি, আমি, কিংবা পশ্চিমা বিশ্ব কিম জং-উনকে নিয়ে যতই হাসি ঠাট্টা করিনা কেন এতে করে উত্তর কোরিয়ার সমরিক পরিস্থিতি বদলে যাবে না। তাদের হাতে রয়েছে পরমাণু বোমা এবং এগুলো বহন করে দূরের দেশে গিয়ে ফেলার জন্য রয়েছে বিভিন্ন দূরত্বের ক্ষেপণাস্ত্র। আর এই সক্ষমতা অর্জন করা যে কতটা সাহস এবং কষ্টসাধ্য ব্যাপার তা বর্তমানে ইরানের দিকে তাকালেই বুঝা যায়।

 

উত্তর কোরিয়াকে দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে বন্ধুবিহীন একটি রাস্ট্র, কিন্তু আদতে কি তাই? চীন,রাশিয়ার অদৃশ্য হাত উত্তর কোরিয়াকে ছায়ার মত আগলে রাখছে। চীন, রাশিয়ার কাছে উত্তর কোরিয়া এতটা গুরুত্ব পাওয়ার একমাত্র কারণ তার সামরিক সক্ষমতা। এই অঞ্চলে জাপান, আমেরিকা এবং তাদের সহযোগীদের রুখে দিতে উত্তর কোরিয়া চীন-রাশিয়ার ট্রাম কার্ড এর ভূমিকা পালন করছে।

 

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে প্রথমেই একটা বিষয় আমাদের মাথায় রাখা উচিত। সেটা হল ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতি এবং ক্ষমতা প্রদর্শন হবে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। ঠিক যেমনটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইউরোপ কেন্দ্রিক ছিল। এই অঞ্চলে পশ্চিমা বিশ্ব তার সহযোগীদের নিয়ে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে উঠে পড়ে লেগেছে। লক্ষ্য চীন ঠেকাও।

 

 

 

চীনকে রুখে দিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত-জাপান-অস্ট্রেলিয়া-আমারিকাকে নিয়ে কোয়ার্ড গ্রুপের আলোচনা অনেকটা এগিয়ে নিয়েছিলেন। জো বাইডেন সেটা চলমান রাখবেন কি না তা সময় বলে দিবে। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট চীন তার আগ্রাসী নীতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক দেশে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।বি.আর.আই প্রোজেক্টের মাধ্যমে তার ট্রেডিং রুটের প্রসার ঘটাচ্ছে। একমাত্র ভারতকে ছেড়ে দিলে এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটা দেশই চীনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। এই সুসম্পর্ক সামরিক এবং অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

 

 

আমাদের দেশে যেসব রপ্তানি উপযোগী ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে এবং আগামীতে গড়ে উঠবে তার রপ্তানির বাজার অবশ্য ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য থাকবে। যার কারণে বাংলাদেশ চাইলেই আমেরিকা-ইউরোপের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে না।এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশ চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে।

 

কিন্তু ভবিষ্যতে যদি এমন পরিস্থিতি হয় যে হয় আমেরিকা নয়তো চীন একটিকে বেছে নিতে – তাহলে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার রপ্তানি বাজার এবং ভারতীয় প্রভাব বলয় বিবেচনা করে আমেরিকার দিকে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে পড়া ছাড়া উপায় থাকবে না। আর এখানেই প্রধান বিপত্তি। চীনের সাথে আমাদের সরাসরি সীমান্ত নেই কিন্তু মিয়ানমারের সাথে রয়েছে। আর মিয়ানমার চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এতটাই ঘনিষ্ঠ মিত্র যে চীন তার স্বার্থ রক্ষায় মিয়ানমারে একটি সফল সামরিক অভ্যুত্থান করতে সক্ষম হয়েছে। চীনের সাথে ভবিষ্যতে আমাদের সম্পর্ক নীচের দিকে গেলে চীন যে মিয়ানমারকে আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেবে না তার নিশ্চয়তা কী? আর যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন আমাদের হাতে কি বিকল্প থাকছে? হয় আমাদের একটি নৌ বন্দর আমেরিকার হাতে তুলে দাও নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় নয়তো নিজেদের সামরিক সক্ষমতা নিয়েই মোকাবিলা কর। সেক্ষেত্রে আমরা সামরিক দিক থেকে কতটা সক্ষম মিয়ানমারকে রুখে দিতে?

 

একটা সময় ছিলো যখন হিটলার তার ট্যাংক বহরের সাহায্যে মাত্র দুই মাসের মধ্যে ফ্রান্স জয় করে নিয়েছিলেন। কিন্তু সে পরিস্থিতি কি এখন আছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি বদলে যাচ্ছে।

 

অতি সম্প্রতি আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধ লক্ষ্য করলে দেখা যায় আধুনিক ড্রোন, মিসাইল প্রযুক্তির কাছে উন্নত ট্যাংক, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা নিরুপায়। মিয়ানমারের সাথে আমাদের যে সিমান্ত রয়েছে তাতে একটি বড়সড় স্থলযুদ্ধ হবার সম্ভাবনা খুবই কম। এখানে কোনো দেশই তার ট্যাংক এবং পদাতিক সেনা এগিয়ে নিতে পারবে না। এখানকার ভৌগোলিক অবস্থা কোনো দেশকেই সেই এডভান্টেজ দেয় নি। এখানে যুদ্ধ বা ক্ষমতা প্রদর্শন সম্পুর্ণটাই হবে নৌপথে এবং আকাশপথে। আমাদের নৌ এবং বিমানবাহিনী কি মিয়ানমারের আগ্রাসন রুখে দিতে সক্ষম ?

 

 

মানতে কষ্ট হলেও সত্যি এটাই যে আমাদের নৌ এবং বিমান বাহিনি খুবই দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।আমাদেরকে যদি ভবিষ্যৎ বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতাধর দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে হয় তাহলে আমাদের সামরিক সক্ষমতা অবশ্যই বাড়াতে হবে। আর এক্ষেত্রে গেমচেঞ্জারের ভূমিকা রাখতে পারে একটি উন্নত বিমানবাহী রণতরী।

 

 

বিমানবাহী রণতরী সমুদ্রে চলমান বিমানবন্দরের কাজ করে। এর সাহায্যে একটি দেশ সমুদ্রে নিরাপদ দূরবর্তী অবস্থানে থেকে শত্রু দেশের উপর বিমান হামলা চালাতে সক্ষম হয়। বিমানবাহী রণতরী কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা জাপান হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। মিডওয়ের যুদ্ধে জাপান তার বিমানবাহী রণতরী আকাগী, কাগা, হিরায়ু, সরয়ুকে হারানোর পর আর সফলতার মুখ দেখতে পারে নি। জাপানের নৌ সক্ষমতা ভেঙে পড়ে।

 

অন্যদিকে আমেরিকা তার বিমানবাহী রণতরীর সাহায্যে আজ অব্দি সমুদ্রে তার সামরিক প্রভাব গোটা বিশ্বে ধরে রেখেছে। আমাদের প্রতিবেশী বন্ধুদেশ ভারতের একটি অপারেশনাল বিমানবাহী রণতরী আছে, আরেকটি তৈরি হচ্ছে।

 

বিমানবাহী রণতরীর পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতায় জোর দেবার সময় এসেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমারে ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলছে ভারত, পাকিস্তান, চীনের মত পরমাণু ক্ষমতাধর দেশ। তাদের কাছে রয়েছে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মিয়ানমারে চলছে সামরিক শাসন। আর একটি দেশে সামরিক শাসন চলমান থাকলে স্বভাবতই সেই দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। আমরা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নতির কথা চিন্তা করব, বৈদেশিক বিনিয়োগের কথা চিন্তা করবো আর এদিকে আমাদের সামরিক অবস্থান আঞ্চলিক অবস্থান বিবেচনায় সবার থেকে পিছিয়ে থাকবে সেটা কখনোই কাম্য নয়।

 

আমাদেরকে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক উন্নতি করতে হবে তার পাশাপাশি আধুনিক যুদ্ধ কাঠামোর কথা মাথায় রেখে সামরিক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। যদিও আমাদের মূলনীতি “কারও সাথে শত্রুতা নয় বরং সবার সাথে বন্ধুত্ব” তথাপি আমাদের সম্ভাব্য শত্রু থেকে আমাদেরকে অবশ্যই সাবধান থাকতে হবে এবং তার থেকে সবসময়ই এক ধাপ এগিয়ে থাকতে হবে। দশ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা মাথায় নিয়েও আমরা যদি সবার সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে শত্রুতা নয় এই নীতিতে চলি তাহলে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিঃসন্দেহে হুমকির মুখে থাকবে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে আমাদের বিমানবাহিনীতে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংযুক্ত করা পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তির বিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণাগার গড়ে তোলা।

 

নৌবাহিনীতে একটি বিমানবাহী রণতরী সংযুক্ত করে আমাদের সমুদ্র রক্ষা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে নিজেদের গুরুত্ব বিশ্বগুরুদের সামনে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবী।

 

তথ্যসূত্র- https://m.somewhereinblog.net/mobile/blog/Nahid2019/30316284