ঢাকা, শনিবার ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৬ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

অমুসলিমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ বা দোয়া করার বিধান


প্রকাশিত: ১০:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ২০, ২০২০

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- ‘কেয়ামতের দিন বান্দার নেক আমলসমূহের মধ্যে সবচে’ বেশি ভারী হবে তার উত্তম আখলাক।’ সুতরাং একজন মুসলমান উত্তম ব্যবহারের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করবে ও যথাসম্ভব উদার মানসিকতা সম্পন্ন হবে- এটাই ইসলামের শিক্ষা৷

তবে এই উদারতা ও উত্তম আচরণ প্রদর্শন করার ক্ষেত্রে ইসলামে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা। দেদারসে উদারতা প্রদর্শন করে আত্মমর্যাদাবোধ বিকিয়ে দেওয়ার নাম ইসলামে উদারতা নয়৷

অমুসলিমের মৃত্যুতে আমাদের আচরণ কেমন হবে? এ প্রসঙ্গে তিনটি শিরোনামে আলোচনা করা যায়৷ ১. আনন্দিত বা ব্যথিত হওয়া৷ ২. ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন পড়া৷ ৩. মাগফিরাতের দোয়া করা বা শুভকামনা করা৷

 

১. অমুসলিমের মৃত্যুতে আনন্দিত বা ব্যথিত হওয়াঃ

জীবদ্দশায় মৃত অমুসলিম ব্যক্তিটি কোনোভাবে (মৌখিক বা কর্মগত) ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা শত্রুতামূলক কোনো আচরণ করেছে বলে যদি জানা যায় তাহলে তার মৃত্যুতে ব্যথিত হওয়ার তো কোনো সুযোগ নেই-ই বরং আনন্দ অনুভূত না হলে বুঝতে হবে আমার ঈমানে দুর্বলতা আছে৷ এই আনন্দিত হওয়ার বিষয়টি কেবল শরীয়ত নির্দেশিত যে তাই নয়, এটি স্বভাবজাত ও যৌক্তিকও বটে৷ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জমানায় ইসলামের ক্ষতিসাধনকারী কোনো দুশমন মারা গেলে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন৷

পক্ষান্তরে যদি লোকটি সাধারণ অমুসলিম হয়ে থাকে, যার আচরণে পক্ষে-বিপক্ষের কোনোকিছু বোঝা যায় নি; তার মৃত্যুতে সর্বোচ্চ এতটুকু ব্যথা সৃষ্টি হওয়ার অবকাশ আছে- ইশ, লোকটি ঈমানের আলো না পেয়েই চলে গেল বা আহ, লোকটি যদি মুমিনের মৃত্যু পেতো….

 

২. ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন পড়াঃ

ইন্নালিল্লাহ মূলত বিপদ-আপদে পড়ার দোয়া৷ কারো মৃত্যু সংবাদ শুনে আমরা ইন্নালিল্লাহ পড়ি, কারণ যে কারও মৃত্যু সাময়িক সময়ের জন্য হলেও নিকটাত্মীয়দের জন্য বিপর্যয়স্বরূপ৷ মৌলিকভাবে ইন্নালিল্লাহ মৃত্যুসংবাদ শুনে পড়ার দোয়া না৷ তবে মৃত্যুসংবাদের সাথে দোয়াটির অর্থগত তাৎপর্যের মিল রয়েছে৷ দোয়াটির অর্থ ‘আমরা আল্লাহ তায়ালার জন্যই, এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে৷’ এই অর্থগত তাৎপর্যের দিকে লক্ষ করে অনেকে অমুসলিমের মৃত্যুসংবাদ শুনে দোয়াটি পড়ার সুযোগ দিতে চান৷

কিন্তু আমাদের বক্তব্য হলো- প্রথমত দোয়াটি মৌলিকভাবে বিপদ বিপর্যয়ের৷ আর অমুসলিমের মৃত্যু কোনো অবস্থাতেই আমাদের জন্য বিপদ বা বিপর্যয় না৷ দ্বিতীয়ত মৃত্যুসংবাদ পরবর্তী ইন্নালিল্লাহ এখন অনেকটাই ইসলামী শিয়ার বা নিদর্শন (টুপি, দাড়ি, আযান ইত্যাদির মতো) হয়ে গিয়েছে৷ আর ইসলামী শিয়ারসমূহে অমুসলিমদের অংশ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই৷ তৃতীয়ত পাঠকারী যতই অর্থগত তাৎপর্যের দিক লক্ষ করে বলেন না কেন, অন্যদের এই ভুল বোঝার অবকাশ থেকেই যায় যে, তিনি হয়তো অমুসলিমের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছেন৷ সুতরাং সব মিলিয়ে অমুসলিমের মৃত্যুতে ইন্নালিল্লাহ পাঠের অবকাশ কোনো অবস্থায়ই আছে বলা যায় না৷

 

৩. মাগফিরাতের দোয়া করা বা শুভকামনা করাঃ

অমুসলিম যেমনই হোন না কেন, মারা যাওয়ার পর তার জন্য দোয়া বা মাগফিরাত কামনা করা যাবে না৷ এমনিভাবে ওপারে ভালো থাকবেন, রেস্ট ইন পিস (RIP) ইত্যাদি লিখে তার জন্য শোক প্রকাশ করা যাবে না৷ এটা আমাদের ধর্মীয় মতাদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক, ইসলামী শরীয়ার দিক থেকে নিষিদ্ধ একটি বিষয়।

কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা শিরক অথবা কুফরী করে তওবা না করে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির জন্য স্পষ্টভাবে জাহান্নামের ঠিকানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এবং এই ফায়সালা অত্যন্ত সুস্পষ্ট৷ তারপরও যদি আমি মনে করি তিনি ভালো থাকতে পারেন বা তার ভালো থাকার সম্ভাবনা আছে অথবা তার ভালো থাকার ব্যাপারে দোয়া করি, তাহলে কেমন যেন আমি আমার বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছি এবং আমার বিশ্বাস পরিপন্থী কথা যেন আমি উচ্চারণ করছি। আর এই বিশ্বাস পরিপন্থী কথা কোনোভাবেই উদারতা নয় বরং এটি সুস্থ চেতনা বহির্ভূত ও দ্বীন সম্পর্কে উদাসীনতা৷ যেমনটি ধরুন— কোনো ব্যক্তি আমার বাবাকে হত্যা করেছে, তার জন্য নিশ্চয়ই আমি আমার মায়ের কাছে কোনো সুপারিশ করতে যাব না এবং তথাকথিত উদারতাও কিন্তু আমি সেখানে প্রদর্শন করব না।এমনিভাবে আমার রাষ্ট্রের সাথে যদি কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে তাহলে আমি অবশ্যই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার ব্যাপারে কোনো ভালো কিছুর আশা করব না।

এই বিষয়গুলো যেমন আমরা বুঝি তেমনি আল্লাহর সাথে শিরক করে, আল্লাহর সাথে কুফরী করে এবং আল্লাহর সাথে দ্রোহিতা করে মৃত্যুবরণ করার পরে কারো জন্য যে শান্তি কামনা করা যায় না সেটাও বোঝা উচিত৷ এটি সম্পূর্ণরূপে আমাদের বিশ্বাস পরিপন্থী৷

তাছাড়া একজন মানুষ যিনি তার জীবদ্দশায় জান্নাতে যেতে চাননি বা জান্নাতের কথা বলা হলেও তিনি অস্বীকার করেছেন, মৃত্যুর পর তার জন্য জান্নাতের দোয়া করা, আশা করা, কামনা করা- এটা কেমন যেন জোর করে ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে কোথাও প্রবেশ করিয়ে দেওয়া। যেটা একজন মুসলিম হিসেবে, একজন সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষ হিসেবে, কোনোভাবেই আমাদের জন্য সমীচীন হতে পারে না।

এছাড়া সূরা তাওবার ১১৩ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা স্পষ্ট ভাবে এরশাদ করেছেন, আমরা যেন কোনো অমুসলিমের জন্য দোয়া না করি এবং জানাযা না পড়ি। সুতরাং কোনো অমুসলিমের মৃত্যুর পর আমি তার জন্য দোয়া করতে পারি না, রেস্ট ইন পিস লিখে বেড়াতে পারি না। এগুলো লেখার অর্থ হলো কোরআনের সুস্পষ্ট বিধান লঙ্ঘন করা। তার জন্য শুভকামনা করার অর্থ হচ্ছে আল্লাহদ্রোহী একজন মানুষের জন্য আল্লাহর কাছে শান্তি কামনা করা। হয়তো অনেকেই মনে করেন- এটা আমাদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি৷ কিন্তু এটা আসলে উদার দৃষ্টিভঙ্গি নয় বরং এটা আমাদের উদাসীনতা। এগুলো মূলত আমাদের দ্বীনি জ্ঞান এর দেউলিয়াপনা প্রমাণ করে।

দ্বীন সম্পর্কে, কোরআন সম্পর্কে, ইসলাম সম্পর্কে, বাস্তবতা সম্পর্কে উদাসীন হওয়ার ফলেই কিন্তু আমরা এ ধরনের উদারতা দেখাতে যাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের সকলকে সুস্থ, শুদ্ধ এবং যৌক্তিক চিন্তাভাবনা করার তৌফিক দান করুক।

[ একাধিক প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলারের বক্তব্য, লেখা ও ফতোয়ার অবলম্বন লেখাটি প্রস্তুত করেছেন রিদওয়ানুল হাসান৷ সহযোগিতায় মেহরান তাহমিদ খান৷ ]