ঢাকা, মঙ্গলবার ১৫ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

অদ্ভুত উৎসব ‘মানেনে’ ও মৃতদের সাথে বসবাস

আমজাদ হোসাইন


প্রকাশিত: ১১:১৮ অপরাহ্ণ, জুন ১৭, ২০২০

 

যদি জিজ্ঞেস করা হয়; একটি বাড়িতে আপনি একা রাত্রিযাপন করতে পারবেন? সে বাড়িতে আর কোনো জীবিত মানুষ থাকবে না, শুধু একটি লাশ আর আপনি থাকবেন৷ এ প্রশ্নে ৯৯.৯৯% মানুষের উত্তরই হবে “না”৷ হয়তো লাখে একজন পাওয়া যেতে পারে যার উত্তর হবে “হ্যাঁ”৷ যদিও আমরা সবাই জানি লাশ আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, তবুও অজানা একটা ভয় কাজ করে৷ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো শুধু দিবস বা রজনী যাপন নয় বরং মৃত মানুষের সাতে রীতিমতো জীবনযাপন করছে একটি সভ্য সমাজের সুস্থ মানুষেরা। এটাই নাকি তাঁদের সামাজিক রীতি! অবাক করা এই রীতি প্রচলিত আছে ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসির টোরাজা (Toraja) উপজাতির মাঝে৷

 

টোরাজাদের বাসগৃহ।

 

ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বেশিরভাগ মানুষই বিশ্বাস করে যে, মৃত্যুই মানুষের ইহকালীন জীবনের শেষ পরিণতি৷ কিন্তু এই চিরন্তন সত্যকে মানতে নারাজ ইন্দোনেশিয়ার এই গ্রামের মানুষেরা। তাদের ধারণা মতে; “ওরা মারা যেতে পারে, কিন্তু তবুও ওরা আমাদের জীবনেরই অঙ্গ।” আর প্রিয়জন মারা গেলে তার দেহ কবর দেওয়া বা পুড়িয়ে ফেলা এটাই সাধারণ সমাজের রীতি। কিন্তু টোরাজাদের দাবি একজন মারা গেলেন মানেই তিনি আমাদের থেকে চিরদিনের মতো চলে গেলেন তা নয় বরং মৃতরা যতোদিন তার আপন মানুষদের কাছে থাকবেন ততোই ভালো ৷ কারণ এই জগতের মায়া কাটাতে মৃতদের যেমন সময় লাগে; তেমনই এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার আপনজনদেরও সময় লাগে। পুড়িয়ে বা কবর দিয়ে দিলে সেই সময়টা পাওয়া যায় না। এই অবস্থাকে মানিয়ে নেওয়ার আজব রীতি চলে মাসের পর মাস ধরে। কিছুক্ষেত্রে এই প্রথা চলে বছরের পর বছর ধরে। নিয়ম করে প্রত্যেক দিন দু বেলা খাবার দেওয়া হয় মৃতদেহকে। টোরাজাদের দাবি, শুধু দেহ ঘরে রেখে দিলেই হয় না বরং জীবিতদের মতোই নিয়মিত খেতে পড়তে দিতে হবে। তারা মনে করেন- এই ব্যবস্থা না করলে আত্মারা রুষ্ট হতে পারে। এতে পরিবারের ক্ষতিও হতে পারে।

 

কিন্তু এর শেষ কোথায় ? জানা গেছে, যতোদিন মৃতের পরিবার তার শ্রাদ্ধ বা শান্তির জন্য বিশাল জমকালো অনুষ্ঠান করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ টাকা জোগার করতে না পারছে, ততোদিন চলবে মৃতের সঙ্গে এই অদ্ভুত জীবনযাপন। অনুষ্ঠানের পর মহাজাঁকজমকের সাথে কফিনে করে কবর দেওয়ার মাধ্যমে বিদায় দেওয়া হয় প্রিয় মানুষটিকে। আর বলি দেওয়া হয় প্রচুর মোষ। কারণ তাদের বিশ্বাস মোষ তাদের প্রিয় মানুষটিকে স্বর্গের পথে নিয়ে যাবে।

 

উৎসব উপলক্ষে মৃতদেরকে সজ্জিত করে রাখা হয়েছে।

 

টোরাজাদের এই রীতিনীতি এখানেই শেষ নয়। প্রত্যেক বছর মৃত ব্যক্তিদের নিয়ে এক অদ্ভুত উৎসব পালিত হয়। ওইদিন সমস্ত টোরাজা পরিবার তাদের পরিবারের মৃতদের দেহকে কফিন থেকে বের করে আনে। এই অদ্ভুত রীতির স্থানীয় নাম ‘মানেনে ফেস্টিভাল’ বা ‘মেনেনে ফেস্টিভাল’। যার অর্থ হলো মৃতদেহ পরিষ্কার উৎসব। এই রীতি অনুযায়ী, প্রতিবছরই ওই গ্রামের মানুষরা তাদের পরিজনদের মৃতদেহ কবর থেকে কফিনসহ তুলে এনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। শুধু তাই নয়, সেই মৃতদেহকে পরানো হয় নতুন পোশাক। দেওয়া হয় পছন্দের খাবার এবং অন্যান্য জিনিসপত্রও। আরোও জানা যায় যে, ওই মৃত ব্যাক্তিরা যেখানে মারা গিয়েছিলেন মৃতদেহকে সেই নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের বিশ্বাস এতে মৃত ব্যক্তিরা প্রশান্তি পায় ৷ তারা আরোও বিশ্বাস করে, তখন তাদের মৃত আত্মীয়স্বজনরা কিছু সময়ের জন্য ইহ জগতের আলোয় ফিরে আসে৷ তারপর কঙ্কালসার দেহ সাজিয়ে গুজিয়ে ছবি তুলে আবার কফিনে ভরে রেখে কবর দেওয়া হয়। ১০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা টোরাজাদের এই প্রথায় কোনও কমতি নেই, বরং আছে মৃত স্বজনদের প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা আর উৎসর্গ।

 

তবে কফিন থেকে বের করা মৃতদেহগুলি দেখলেই বুঝা যায় সেগুলি অনেকটাই অবিকৃত থাকে। এর কারণ হলো ওই গ্রামে কোনো ব্যাক্তি বা শিশু মারা গেলে তাদের বিশেষ উপায়ে মমি বানিয়ে কফিনে ঢুকিয়ে কবর দেওয়া হয়। ফলে সেগুলি বহুদিন পর্যন্ত অবিকৃত অবস্থায় থাকে। প্রতিবছর আগস্ট মাসে এই রীতি পালন করা হয়। টোরাজার বাসিন্দাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই রেওয়াজের ফলে সব মৃত ব্যক্তির আত্মা আবার ফিরে আসে। কিছুক্ষণের জন্য তারা তাদের পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে এবং পরে আবার ফিরে যায়। এতে মৃতদের আত্মা প্রশান্তি লাভ করে আর জীবিতদের বিপদাপদ দূর হয়৷